বিদেশিরা চলে যাওয়ায় ধাক্কা লেগেছে দুবাইয়ের পর্যটন শিল্পে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে পর্যটক দর্শনার্থীর সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়ায় দুবাই এখন এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ব্যাপক হারে হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং চাকরি হারানোর ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম বড় পর্যটন কেন্দ্রটির আতিথেয়তা খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সোমবার দুবাই এয়ার পোর্ট জানায়, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রথম প্রান্তিকে যাত্রী সংখ্যা কমেছে অন্তত ২৫ লাখ। মার্চ মাসে যাত্রী সংখ্যা ৬৬ শতাংশ কমে যায়, কারণ ভ্রমণকারীরা উপসাগরীয় অঞ্চল এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের পূর্বাভাস দেয়নি। তবে শনিবার পর্যটন খাতকে আবার সচল করতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয় যে, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালানোর পর যে সব বিমান ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তা তুলে নেওয়া হয়েছে। এসব দেশ হয় মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দেয় অথবা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করে।
তাদের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথোরিটি লিখেছে: “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালনাগত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পূর্ণ মূল্যায়নের পর আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
এই বার্তাটি মূলত আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের আশ্বস্ত করার জন্য দেওয়া হয়, বিশেষ করে কয়েকটি ইউরোপীয় এয়ারলাইনের মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পর।
দুবাইয়ের কর্মী ও ব্যবসায়ীরা বলেন, এই ঘোষণার ফলে ভ্রমণকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে কিনা তা বুঝতে এখনও সময় লাগবে।
কেনিয়ার এক হোটেল কর্মী চ্যারিটি বলেন যে, মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত দিয়ে যাওয়া ১৪ লাখ মানুষের প্রভাব তাদের মাঝারি মানের হোটেলেও পড়েছে।
তিনি বলেন: “সংঘাতমুক্ত একটি জায়গা হিসেবে দুবাইয়ের পুরো ধারণাটাই নড়ে গেছে।”
রমজান মাসে, যখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সবচেয়ে তীব্র ছিল, তখন তার হোটেল,যা একটি মার্কিনভিত্তিক চেইনের অংশ, আটকে পড়া যাত্রীতে পূর্ণ ছিল। তারা হোটেলের লবিতে এমিরেটস এয়ার লাইন্সের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতেন।
সে সময় হোটেলের সুইমিং পুল বন্ধ রাখা হয় এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ২০ তলা ভবনের উপরের ফ্লোরের অতিথিদের নিচের ফ্লোরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু এরপর, তার ভাষায়, “কয়েক সপ্তাহের জন্য সবকিছু সত্যিই ধীর হয়ে যায়।” তিনি আশা করছেন নতুন ঘোষণা ভ্রমণকারীদের কিছুটা আশ্বস্ত করবে। তিনি আরও বলেন, “আগামী সপ্তাহে বোঝা যাবে মানুষ সত্যিই ফিরে আসে কিনা। আমাদের আপনার মানুষদের [বিদেশি পর্যটক] আবার ফিরে আসতে হবে।”
এখন পর্যন্ত দীর্ঘদিনের যাত্রীরাও বলছেন না, দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ার পোর্টের পরিবেশে স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। এটি টানা ১২ বছর আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলে বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দর ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার এক এনজিও কর্মী সামিনা, যিনি দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে নিয়মিত ভ্রমণ করেন, বলেন, সাম্প্রতিক সফরগুলোতে পরিবর্তনটা খুব স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন:
“ভিতরে ঢুকলেই দেখা যায় একদম ফাঁকা। টারমিনাল -৩ সম্পর্কে তিনি বলেন এটি এমিরেটস এয়ার লাইন্সের কেন্দ্র। আর টারমিনাল -১ ও ২কে তিনি “ভূতুড়ে শহর” বলে বর্ণনা করেন। এখানে অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন ও ফ্লাই দুবাই পরিচালিত হয়।
তার মতে, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলোর ফ্লাইট স্থগিতকরণ যাত্রী চলাচলে বড় প্রভাব ফেলেছে। দুবাই এয়ার পোর্টস জানায়, ৯০টি এয়ারলাইনের মধ্যে মাত্র ৫১টি তাদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে। ইউরোপীয় ও মার্কিন এয়ারলাইনগুলো সরকারি ভ্রমণ সতর্কতার কারণে বীমা সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়ছে।
‘দুবাইয়ের মূল দর্শন কেঁপে উঠেছে’:
নিজেদের নাগরিকদের আশ্বস্ত করতে দুবাই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। শহরজুড়ে বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ডে ইউএই’র-এর পতাকা দেখা যাচ্ছে। সিটি ওয়াক শপিং সেন্টারে বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে আরবি ও ইংরেজিতে ইউএই’র বাসিন্দাদের ধন্যবাদ জানানো হচ্ছে। মোহাম্মদ বিন জায়েদ আর নাহিয়ানের ছবিও প্রধান সড়কগুলোতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা: “আমাদের জাতি যেন আল্লাহর সুরক্ষায় থাকে।”
তবে দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রভাব খুব দ্রুত অনুভূত হয়েছে। রাশিয়ান ব্যবসায়ী তাতিয়ানা, যিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবসা স্থাপনে সহায়তা করেন, বলেন:
“যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যেই মানুষ বলতে শুরু করে, এখানে থাকা আর সার্থক নয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হঠাৎ করেই তাদের সম্পদ বিক্রি করতে শুরু করে।” তিনি বলেন, তার পরিবার এখন দুবাইয়ের বিকল্প হিসেবে ইউরোপের কথা ভাবছে।
একজন সম্পাদক অ্যান্টোইন বলেন, তার এক ক্লায়েন্ট, যিনি একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করেন, ১,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের দায়িত্ব পান। তিনি বলেন: “আপনি ভাববেন বিজ্ঞাপন শিল্প যুদ্ধের প্রভাবমুক্ত থাকবে। কিন্তু সেটাও হয়নি। তাতিয়ানা বলেন, তার ব্যবসাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“আমাদের পুরো ব্যবসাই নির্ভর করে মানুষকে বোঝানোর ওপর যে, ইউএই ব্যবসার জন্য নিরাপদ ও সুবিধাজনক জায়গা।”
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৩৫ লাখ থেকে ৪৩ লাখ ভারতীয় বাসিন্দার একজন অর্জুনও একই ধরনের কথা বলেন। মাইকেল জ্যাকসন বায়োপিক-এর একটি রাতের শো দেখে বের হওয়ার সময় তিনি বলেন, হল প্রায় পূর্ণ দেখে তিনি স্বস্তি পেয়েছেন—হয়তো এটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার ইঙ্গিত। তিনি বলেন: “সংঘাতমুক্ত শহর হিসেবে দুবাইয়ের পুরো পরিচয়টাই কেঁপে উঠেছে।”

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button