চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো

অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বতন্ত্রভাবে এগিয়ে যাওয়ার উচ্চাশা নিয়ে ঠিক চার বছর আগে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ব্রিটিশরা। কিন্তু সেই ব্রেক্সিটই এখন তাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়ে সুরাহা হয়নি চার বছরেও। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যতই বলুন না কেন যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ একটি চূড়ান্ত ব্রেক্সিট চুক্তির ব্যবস্থা করতে পারবেন তিনি, ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো তাতে খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছে না। এরই মধ্যে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে তারা।

কাগজে-কলমে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলেও ব্রেক্সিট কাহিনী এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কারণ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রূপান্তরকালীন সময় পাবে যুক্তরাজ্য। এর মধ্যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে পারলে নতুন এক সম্পর্ক স্থাপন হবে ব্রিটেন ও ইইউ দেশগুলোর মধ্যে। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি না হলে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের পথেই পা বাড়াতে হবে যুক্তরাজ্যকে।
এ পর্যন্ত মাসের পর মাস ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। জুলাই ও আগস্টে আরো কয়েক দফায় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এসব আলোচনা সফল হবে কিনা, তা ভবিষ্যতের ব্যাপার। কিন্তু কোম্পানিগুলোকে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে এখনই পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে।
ম্যানচেস্টারভিত্তিক রেনল্ড সেসব কোম্পানির একটি। গাড়ির চেইন ও গিয়ারবক্স তৈরি করে তারা। জানুয়ারিতে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট কার্যকর হলে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তারা গ্রাহকদের কার্যাদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রবার্ট পুরসেল বলেছেন, ‘আমরা ধারণা করছি সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।’
চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট হলে কাঁচামাল আমদানিতে সংকট দেখা দিতে পারে, এমন আশঙ্কায় মজুদ বাড়াচ্ছে উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলো। বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা বেন্টলি ও জার্মানির ভক্সওয়াগনের যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইউনিট তাদের মজুদ সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বেন্টলির গাড়িতে ব্যবহূত ৪৫ শতাংশ যন্ত্রাংশই বাইরে থেকে আমদানি করা, যার ৯০ শতাংশই আসে কন্টিনেন্টাল ইউরোপ থেকে। বেন্টলির প্রধান নির্বাহী আদ্রিয়ান হলমার্ক বলেছেন, ‘যন্ত্রাংশ মজুদ করলে আমাদের বছরে লাখ লাখ পাউন্ড লোকসান গুনতে হয়। ফলে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট হলে আমরা বেশ সংকটে পড়ে যাব।’
ব্রিটিশ অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার ভক্সহল তাদের লুটন ও এলসমেয়ার পোর্ট কারখানায় চুক্তি ও চুক্তিবিহীন—দুই ধরনের পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোম্পানিটির হেড অব গভর্নমেন্ট রিলেশনস হেলেন ফুর্ড বলেছেন, যুক্তরাজ্য ইইউর কাস্টমস ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য নতুন কাস্টমস নথিপত্র তৈরি করছেন তারা। এছাড়া তথাকথিত রুলস অব অরিজিনের প্রমাণ হিসেবে অতিরিক্ত নথিপত্রও তৈরি করছেন তারা, যেন সম্ভাব্য যেকোনো বাণিজ্যিক চুক্তির অধীনেই তাদের গাড়িগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়।
যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি হলেও তা অক্টোবরের মধ্যেই চূড়ান্ত হতে হবে। কারণ চুক্তির শর্তগুলোর বিষয়ে ইইউর সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন নিতে সময় লাগবে। এজন্য অক্টোবরের মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি না হলে ১ জানুয়ারির মধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।
ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, আলোচনায় যত বিলম্ব হবে, ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে তাদের তত বেশিদিন অনিশ্চয়তায় থাকতে হবে।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button