নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি যুক্তরাজ্যের আইনজীবীদের

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ওপর আর্থিক ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন দাখিল করেছেন ব্রিটিশ আইনজীবীরা। যুক্তরাজ্যের আইন সংস্থা ‘ডেইটন পিয়ার্স গ্লিন’ এ সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত আরব মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষে এই আবেদনটি করে।
সংগঠনটি জানায়, গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনে নেতানিয়াহুর সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে তারা যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়ভেট কুপারের কাছে বিস্তৃত প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। দাখিল করা নথিতে বলা হয়, নেতানিয়াহুর বক্তব্যগুলো নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে উসকানির পর্যায়ে পড়ে, যেখানে গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায় প্রতীয়মান হয়। নথিতে বলা হয়, এ ধরনের অভিপ্রায় গণহত্যায় উসকানির শামিল। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জামিল বলেন, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ম্যাগনিটস্কি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা আর রাজনৈতিক বিকল্প নয়, এটি একটি আইনগত ও নৈতিক প্রয়োজন। ম্যাগনিটস্কি নিষেধাজ্ঞা মানবাধিকার লঙ্ঘন বা দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে আরোপ করা হয়। এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বন্ধ করা হয় এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোতে তাদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়।
জামিল বলেন, মিত্র বা প্রতিপক্ষের মধ্যে কোনো পার্থক্য না করে বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থাগুলো ব্যবহার না করলে যুক্তরাজ্য তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার বা আইনি ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে না। তিনি বলেন, কাউকেই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, গণহত্যার মুখে নীরবতা এবং ইসরায়েলকে সামরিক, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার কারণে যুক্তরাজ্যের সুনাম ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দাখিল করা নথিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধান ও রায় থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডগুলো অধস্তন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নয়, বরং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অনুমোদনের ফল।
উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে নেতানিয়াহু বাইবেলের আমালেক নামে পরিচিত প্রাচীন শত্রুর প্রসঙ্গ টেনে সেনাদের উদ্দেশে বলেন, তারা যেন স্মরণ করে আমালেক তাদের সঙ্গে কী করেছিল।
এই বক্তব্যটি দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দায়ের করা মামলায় উসকানির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে।
এছাড়া পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে নেতানিয়াহুর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যেই এক বসতি প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি রয়েছে, যেটি সম্পর্কে এক ইসরায়েলি মন্ত্রী বলেছেন, এটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে মুছে দেয়।
নথিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে এসব সিদ্ধান্ত কার্যত দখলদারিত্ব এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শামিল, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় এবং যুক্তরাজ্য সরকারের নিজস্ব নীতির বিরোধী।
গত বছরের জুনে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এই সপ্তাহে দাখিল করা নথিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক মানবাধিকার নিষেধাজ্ঞা বিধিমালা ২০২০ সালের আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার মানদণ্ড পূরণ করেন।
এই বিধিমালার আওতায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ জব্দ এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সংগঠনটি জানায়, এই আবেদনটি ২০২০ সালের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার আওতায় কোনো বর্তমান ইসরায়েলি নেতাকে লক্ষ্য করে করা প্রথম উদ্যোগ। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর থেকেই নেতানিয়াহুর যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ সীমিত রয়েছে।
এই পরোয়ানার ফলে রোম সংবিধির একশ পঁচিশটি সদস্য রাষ্ট্র নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হস্তান্তর করতে বাধ্য।
যুক্তরাজ্য ইঙ্গিত দিয়েছে, নেতানিয়াহু যদি ব্রিটিশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন, তাহলে তারা তাদের আইনি দায়িত্ব অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করবে।
ফ্রান্স দাবি করেছে, বর্তমান সরকার প্রধান হওয়ায় নেতানিয়াহু গ্রেপ্তার থেকে রেহাই পান। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই দাবি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে জামিল বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নজির যুক্তরাজ্যের রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ একটি প্রতিরোধমূলক আইনগত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যেখানে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তির পদ বা মর্যাদা বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ভ্লাদিমির পুতিন, আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো এবং বাশার আল আসাদের নাম উল্লেখ করেন, যাদের ওপর যুক্তরাজ্য সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
তিনি আরো বলেন, নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে ম্যাগনিটস্কি আইন প্রয়োগে অস্বীকৃতি কোনো আইনগত বাধা নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা দ্বিচারিতার মানদণ্ডকে শক্তিশালী করে এবং আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর এই নিষেধাজ্ঞা আবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ডেইটন পিয়ার্স গ্লিন জানিয়েছে, সরকার যদি এই আবেদনের জবাব না দেয়, তাহলে তারা বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করবে।
আইন সংস্থাটির এক প্রতিনিধি বলেন, সরকার যদি কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আনা হতে পারে। -রায়হান উদ্দিন, লন্ডনভিত্তিক মিডল ইস্ট আই-এর একজন সাংবাদিক, যার আগ্রহ ভূরাজনীতি, সংঘাত এবং মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনে। তিনি এর আগে দ্য গার্ডিয়ান, দ্য স্পেকটেটর এবং নিউ স্টেটসম্যান-এও লিখেছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button