ইরানের ওপর হামলা কোনোভাবেই “সভ্যতার বিজয়” নয়

ইরানের স্বৈরশাসক নিহত, তার দমনমূলক শাসনব্যবস্থা বোমাবর্ষণে ভেঙে পড়ছে, আর এখন বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার দিকে এগোতে পারবে। নেটফ্লিক্সের কোনো অ্যাকশন নাটকের স্ক্রিপ্টে এ দৃশ্য হয়তো খুব সরল মনে হতে পারে। আর তথাকথিত ড্রয়িংরুম পররাষ্ট্রনীতি-বিশেষজ্ঞদের মতে, শনিবার সকালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আকস্মিক হত্যাকাণ্ড এখনই উদযাপনের সময়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন সপ্তাহান্তের মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের পরিণতি সবসময়ই থাকে এবং একটি সার্বভৌম দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি হামলার প্রকৃত মূল্য এখনো অজানা। এ শতাব্দীতে সদৃশ ঘটনাগুলোর পরিণতি—যেমন ২০০৬ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেন বা ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে অপসারণ—প্রমাণ করে যে পশ্চিমা বিশ্বের অপছন্দের নেতাকে সরানো কোনো দ্রুত সমাধান নয়। বরং তা আরও অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা ডেকে আনে।
“সাহসী ইরানি জনগণের” পক্ষ হয়ে যুদ্ধ—ইসরায়েলের ভাষায়—এই প্রচারণা এক ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছেছে। যেন ইরানি বেসামরিক নাগরিকরা, এমনকি স্কুলছাত্রীরাও, নিজেদের হত্যাকাণ্ড ও ঘরবাড়ি ধ্বংসকে সমর্থন করছে—যেমনটি ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেও বলা হয়।
সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাকে যুদ্ধ, দখল ও গৃহসংঘাতে মৃতের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। লিবিয়ায় অবৈধ শাসন পরিবর্তনের মূল্যও বিপুল। দেশটি আজও মিলিশিয়াদের দখলে, যারা আমেরিকা ও ইসরায়েলের মতোই বিনা বিচারে প্রাণনাশে দ্বিধা করে না। সর্বাধুনিক অস্ত্রই ক্ষমতার চাবিকাঠি—এটাই যুদ্ধবাজদের যুক্তি।
তবে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে: ইরাক বা লিবিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সরাসরি আইনবহির্ভূত শক্তি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে এবং বিপুল প্রচারণা চালিয়ে নিজেদের “সভ্যতার রক্ষক” হিসেবে উপস্থাপন করে।
চিরস্থায়ী যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি:
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি “চিরস্থায়ী যুদ্ধ” থেকে দূরে থাকবেন। অথচ এখন তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক সংঘাতের সূচনা করেছেন।
“প্রি-এম্পটিভ অ্যাকশন” বা আগাম প্রতিরোধের মতো শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হচ্ছে—ইরান নাকি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল। অথচ পেন্টাগন নিজেই বলেছে, তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি নেই। তবুও আলোচনার পথ পরিত্যাগ করা হয়েছে।
ইসরায়েল অঞ্চলের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি, আর যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ যারা পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেছে—তবুও এই বাস্তবতা উপেক্ষিত। ওমানের মধ্যস্থতায় এগিয়ে চলা সম্ভাব্য চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে।
গ্রীষ্মে হামলা, শান্তি আলোচনা বাতিল, শীতে আবার আক্রমণ, এ চক্রের নামই “চিরস্থায়ী যুদ্ধ”। খামেনির মৃত্যু কোনো কিছুর সমাপ্তি নয়। ইরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিঘাত করছে, এভাবে সহিংসতার চক্র অব্যাহত।
নীরবতা, প্রচারণা ও দায়মুক্তি:
ফিলিস্তিনে গণহত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহ ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানের অন্যতম প্ররোচক। তার নীতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করছে। আর তার প্রচারযন্ত্র রাতকে দিন বানিয়ে ভয়াবহতাকে ঢাকার চেষ্টা করছে।
গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতাকে যেমন ঢাকার চেষ্টা হয়েছে, তেমনি ইরান প্রসঙ্গেও একই কৌশল। নিহত শিশুদের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ভিন্নমত পোষণ করলেই কাউকে “সন্ত্রাসবাদ-সমর্থক” আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
নেতানিয়াহু নিজেই সামাজিক মাধ্যমে ইরানি জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।” কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিওতে তিনি বলেন, “এটাই সময়, সন্ত্রাসী শাসন উৎখাত করুন।”
বিকৃত “সভ্যতা”:
নেতানিয়াহুর যুক্তি—ধ্বংস ও মৃত্যু আসলে ভালো, কারণ তা তার ও তার সমর্থকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। হাজার হাজার শিশু, নারী, সাহায্যকর্মী নিহত হলেও তার কাছে সেটি গৌণ। তার কাছে “সভ্যতা” মানে অবিরাম সংঘাত।
এদিকে যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু ভাষায় বলছে, তারা কেবল “প্রতিরক্ষামূলক হামলা” সমর্থন করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পও গত সেপ্টেম্বরে নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, “এটি এক বড় দিন, হয়তো সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম বড় দিন।” তার কাছে মধ্যপ্রাচ্যের “শান্তি” মানে নেতানিয়াহুর অনুমোদিত সমাধান।
পরিণতি:
বিদেশি শক্তির দ্বারা শাসন উৎখাতের প্রচেষ্টা সফল হয় না। ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান তার প্রমাণ। ইরানে হামলা করে একই ফলাফল আশা করা অবাস্তব। ইরানে কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শক্তি নেই, আইআরজিসি ভেঙে পড়বে না, আর খামেনির ৩৭ বছরের শাসন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র বৈরিতার জন্ম দিয়েছে, তা রাতারাতি বিলীন হবে না।
ফলে সামনে রয়েছে আরেকটি বিপর্যয়ের সম্ভাবনা, যেমনটি ঘটেছে অন্যান্য মুসলিম-প্রধান দেশে, যেখানে “সভ্যতার নামে” ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও তাদের সমর্থকেরা অন্য কথা বলবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ হামলা কোনোভাবেই “সভ্যতার বিজয়” নয় বরং এটি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার সূচনা। -নাবিলা রামদানি, একজন ফরাসি সাংবাদিক ও একাডেমিক, যিনি আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। তিনি Fixing France: How to Repair a Broken Republic বইটির লেখক, যা পাবলিকঅ্যাফেয়ার্স এবং হার্স্ট পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটির পেপারব্যাক সংস্করণ ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত হবে।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button