এসমায়েল বাঘায়ী, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র
‘ইরানের বিরুদ্ধে অন্যায় ও নিষ্ঠুর যুদ্ধের বিরোধিতা করুন’
আজ ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরায়েল অক্ষের আগ্রাসনের অষ্টম দিন। ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে তারা ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার থেকে আমার দেশের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে ও অযৌক্তিক আগ্রাসন শুরু করে। এই নির্মম আক্রমণ শুরু হয় তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে হামলার মাধ্যমে। এই নেতা, যিনি সমগ্র অঞ্চলে এবং তার বাইরেও অত্যন্ত সম্মানিত শিয়া ধর্মীয় আইনজ্ঞ হিসেবে পরিচিত, তিনি তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ শহীদ হন। তাদের মধ্যে ছিল তাঁর ১৪ মাস বয়সী নাতনিও, যা ঘটেছিল পবিত্র রমজান মাসের দশম দিনে।
একই সময়ে তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একটি ঘটনায় দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা করা হয়, যেখানে ১৬৫ জন নিরপরাধ স্কুলছাত্রী ও ২৬ জন শিক্ষক নির্মমভাবে নিহত হন।
এখন পরিষ্কার হয়েছে যে এই বিদ্যালয়টি লক্ষ্য করে হামলাটি ইচ্ছাকৃত ও পূর্বপরিকল্পিত ছিল। স্যাটেলাইট ছবি, হামলার ধরন এবং অবস্থান বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে হামলাটি ক্লাস চলাকালীন সময়ে সরাসরি স্কুল ভবনে আঘাত হানে। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও জরুরি সেবা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত করে রাখা, যাতে পরে অন্য কৌশলগত স্থাপনায় হামলা করা যায়।
সামরিক আগ্রাসন এখনো চলছে এবং বহু বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে, যার ফলে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ধ্বংস হয়েছে।
এই নতুন আগ্রাসন শুরু হয় এমন সময়ে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিলেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনার সর্বশেষ দফার পর বলেছিলেন যে “গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি” হয়েছে।
এই হামলা কূটনীতির প্রতি আরেকটি বিশ্বাসঘাতকতা এবং এটি দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি কোনো সম্মান দেখায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শত্রুতামূলক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সত্য প্রমাণ করার জন্য এবং ইরানি জনগণের দাবির বৈধতা দেখানোর জন্য ইরান আবারও আলোচনায় অংশ নিয়েছিল।
ইরানি জাতি গর্বিত ও দৃঢ়চেতা। ইতিহাস প্রমাণ করে যে তারা কখনো হুমকি বা বিদেশি হস্তক্ষেপের কাছে মাথা নত করেনি। হাজার বছরের ইরানি সভ্যতার ইতিহাসে এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
প্রায় ৯০০ বছর আগে ইরানের মহান কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার তাঁর “তাজকিরাত আল-আউলিয়া” গ্রন্থে একটি গল্প বর্ণনা করেন। সেখানে বলা হয়েছে, যখন বায়াজিদ বস্তামী বলেছিলেন “সুবহানি, মা আ’জামা শা’নি” (গৌরব আমার, কত মহান আমার মর্যাদা), তখন কিছু মানুষ তাকে ধর্মদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। কিন্তু গল্প অনুযায়ী, প্রতিবার ছুরি মারার পর বায়াজিদের শরীর থেকে নয়, বরং আক্রমণকারীদের শরীর থেকেই রক্ত বের হয়।
এই গল্পের মতোই ইরান। ইতিহাস দেখায়, যত আঘাতই করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আক্রমণকারীরাই হারিয়ে যায়, আর ইরান টিকে থাকে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন এবং এটি ইরানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সশস্ত্র আগ্রাসন। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও ৪ মার্চের এক বিবৃতিতে এই আগ্রাসনকে “অবৈধ” বলে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও অন্যান্য কর্মকর্তাকে হত্যাও আন্তর্জাতিক আইনের, বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক কনভেনশনের লংঘন।
জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই আগ্রাসনের জবাব দেওয়া ইরানের বৈধ অধিকার। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই অপরাধমূলক আগ্রাসন প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা ব্যবহার করবে। আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এবং বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সঠিকভাবে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই অধিকার বহাল থাকবে।



