কেনো ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা উচিত স্টার্মারের

২০২৬ সাল শুরু হলেও ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে। গাজায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি বাহিনী অক্টোবরের তথাকথিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। বোমাবর্ষণ, গুলিবর্ষণ এবং মানবিক সহায়তা আটকে রাখার মধ্যে দিয়ে। এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি মূলত হত্যাযজ্ঞের গতি কিছুটা কমিয়েছে এমন এক মাত্রায়, যা আন্তর্জাতিক নেতারা মেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
এর পরের তিন মাসে ইসরায়েল ৪৪২ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। যুদ্ধবিরতির আগের তুলনায় হত্যার হার কম হলেও নৃশংসতা থেমে নেই।
ভোগান্তি ও মানবিক বিপর্যয় প্রতিদিন আরও গভীর হচ্ছে। সমাধান তো দূরের কথা, তা মোকাবিলাও করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে গাজাকে ভাগ করার ইসরায়েলি পরিকল্পনা আরও পোক্ত হচ্ছে, যেখানে তথাকথিত “হলুদ রেখা” ক্রমেই পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে। এটি ব্রিটেনসহ দাতা দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন তারা এখনও আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের দাবি করে, অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে সেই ব্যবস্থার শেষ অবশিষ্টাংশও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এরপর থেকেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখে এক চওড়া হাসি লেগে আছে।
ব্রিটেনের করণীয় কী?
তাহলে ব্রিটিশ সরকার কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে? ডাউনিং স্ট্রিট সবসময় আতঙ্কে থাকে। এমনকি প্রতিটি সিদ্ধান্ত মাপা হয় অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য রোষের সঙ্গে, যেন অতিরিক্ত সেদ্ধ স্প্যাগেটির মতো কোনো মেরুদণ্ড তাদের কোন নেই। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সব ক্ষেত্রে আরও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়ার ইচ্ছা ব্রিটেনকে দেখাতে হবে। অতীত নজির আশাব্যঞ্জক নয়। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি উল্লেখ করতেও ব্রিটেনের সাম্প্রতিক অস্বীকৃতি, তা স্পষ্ট করে।
ন্যূনতম করণীয়
গাজার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো, আর কতদিন ব্রিটেন ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা মেনে নেবে, যা-না ইসরায়েলি গণহত্যা থামাচ্ছে, না দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর সমাধানের পথে এগোচ্ছে, এমনকি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দিকেও যাচ্ছে না।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই পরিকল্পনার বৈধতা দেওয়ার সময় ব্রিটিশ সরকারের আরও সক্রিয়ভাবে আপত্তি জানানো উচিত ছিল এবং প্রতিদিন এই পরিকল্পনা লঙ্ঘিত হওয়ার পর তা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এখন ট্রাম্পের প্রস্তাবিত তথাকথিত “বোর্ড অব পিস”-এ যুক্তরাজ্যকে একটি আসন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মারের উচিত এটি প্রত্যাখ্যান করা, যতক্ষণ না এর ম্যান্ডেট পুরোপুরি পুনর্লিখন করে এটিকে তত্ত্বাবধায়ক নয়, কেবল পরামর্শমূলক কাঠামোয় রূপান্তর করা হয়।
এই নব্য-উপনিবেশবাদী কাঠামোর অংশ হলে তা কেবল গাজা ধ্বংসে মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশলের জানালার সাজসজ্জা হবে এবং যারা এতে থাকবে তারা কার্যত অপরাধের সহযোগী হয়ে উঠবে। আরও বিপজ্জনক হলো, এই বোর্ডকে অন্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও মডেল হিসেবে গ্রহণ করা হতে পারে, যা জাতিসংঘের বৈধ কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে যাবে।
কথার বাইরে গিয়ে ব্যবস্থা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্টার্মার সরকারকে “উদ্বেগ প্রকাশ” থেকে সরে এসে ইসরায়েলের আচরণ পরিবর্তনে বাধ্য করতে বাস্তব চাপ সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে গাজায় স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। কারণ সম্ভাব্য সেনা-প্রদানকারী দেশগুলো শান্তিরক্ষী নয়, বরং শান্তি চাপিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক, বিশেষ করে হামাসকে বলপ্রয়োগে নিরস্ত্র করার প্রশ্নে।
ব্রিটেনকে এই শর্তাবলি আমূল সংশোধনের জন্য চাপ দিতে হবে। এই অঞ্চলসহ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
ন্যূনতম পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিটেনকে গাজায় সহায়তা প্রবাহে ইসরায়েলের বাধা বন্ধ করতে উদ্যোগ নিতে হবে এবং সব জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাকে ফিলিস্তিনজুড়ে অবাধে কাজ করার অনুমতি নিশ্চিত করতে হবে। এসব সংস্থার ওপর ইসরায়েলের কঠোর বিধিনিষেধ তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠবে।
পশ্চিম তীর: পরবর্তী কেন্দ্রবিন্দু
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ২০২৬ সালে ইসরায়েলি আগ্রাসন চরমে পৌঁছাতে পারে, এ জন্য ব্রিটেনকে প্রস্তুত থাকতে হবে। নেতানিয়াহু এটি করবেন তার জোট ধরে রাখতে, কারণ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া বাধ্যতামূলক। তিনি ডানপন্থি ভোট যতটা সম্ভব কুড়িয়ে নিতে চাইবেন, আর তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা আরও বেশি কট্টর অবস্থান দেখাতে চেষ্টা করবে।
স্বীকৃতির ভিত্তিতে এগোনো
পশ্চিম তীর ইস্যুতে ব্রিটেন তুলনামূলকভাবে শক্ত আইনি অবস্থান নিয়েছে, বিশেষ করে বসতি স্থাপন প্রসঙ্গে। এখন এটিকে আরও জোরদার করতে হবে বাড়তি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে।
যদি ব্রিটেন সত্যিই দুই-রাষ্ট্র সমাধান ও দখলদারিত্বের অবসান চায়, তবে শুধু বসতি নয়, বরং সমগ্র ইসরায়েলি দখল কাঠামোর সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করতে হবে। ৩,৪০০ নতুন বসতি নির্মাণের জন্য ই১ এলাকায় সাম্প্রতিক দরপত্র এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের সর্বশেষ উপলক্ষ।
স্টার্মারের উচিত গত সেপ্টেম্বরে প্রদত্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের কৌশল গড়ে তোলা। ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে একসঙ্গে কাজ করে তা বাস্তবায়নের নীতি কঠোরভাবে আরোপ করতে হবে। মন্ত্রীদের নিয়মিতভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, গাজা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, অবৈধ ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে হবে। যুক্তরাজ্য-ফিলিস্তিন চুক্তি, এমনকি একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও আলোচনায় আনা উচিত।
একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থা উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে যুক্তরাজ্য, কারণ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। মাহমুদ আব্বাস নব্বই বছর বয়সের কোঠায় পিএ-এর বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা ক্ষয়প্রাপ্ত। শুধু তা-ই নয়, ইসরায়েলি পদক্ষেপগুলো তাদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করে রেখেছে। চরম ডানপন্থি মন্ত্রীরা প্রকাশ্যেই এই বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা শেষ করে দিতে চান।
ব্রিটেনকে এর বিরোধিতা করতে হবে এবং এমন একটি সত্যিকারের বিশ্বাসযোগ্য ফিলিস্তিনি কাঠামোর দিকে কাজ করতে হবে, যার লক্ষ্য হবে প্রতিনিধিত্ব ও শাসন, দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখা নয়।
একটি গ্রহণযোগ্য ফিলিস্তিনি সরকারকে গাজার দায়িত্ব নিতে দিতে হবে। ফিলিস্তিনি জনগণের ভূমিকা আর উপেক্ষা করা যাবে না, কিংবা সংস্কারের নামে ইসরায়েলের শর্তে জিম্মি রাখা যাবে না। এই পথে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত ব্রিটেনের।
সবশেষে, স্টার্মার সরকারকে উদ্বেগ প্রকাশের ভাষা ছেড়ে বাস্তব চাপ প্রয়োগে যেতে হবে। ইসরায়েলকে আর আইনের শাসন মানা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং এমন এক বেপরোয়া শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যা শুধু ফিলিস্তিন নয়—সমগ্র অঞ্চলে শান্তির সম্ভাবনা ধ্বংস করছে।
এতে স্টার্মার সরকার আন্তর্জাতিক আইন ও ব্রিটিশ জনমতের সঙ্গেও সঙ্গতি রক্ষা করবে—যা ভবিষ্যতমুখী যে কোনো কৌশলের জন্য হবে একটি শক্ত ভিত্তি। -ক্রিস ডয়েল, সিএএবিইউ (কাউন্সিল ফর আরব–ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিং)–এর পরিচালক। সিএএবিইউর প্রধান মুখপাত্র এবং অঞ্চলটি নিয়ে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি টেলিভিশন ও রেডিওতে নিয়মিত মন্তব্য করেন এবং আরব বসন্ত, লিবিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইসলামোফোবিয়া ও ব্রিটেনে আরবদের মতো বিষয় নিয়ে সারা দেশে অসংখ্য বক্তৃতা দেন। তার বহু প্রবন্ধ ব্রিটিশ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একাধিক ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধিদল আরব দেশগুলোতে সংগঠিত ও সফরসঙ্গী হিসেবেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button