ব্রিটেন কি সত্যিই ওয়াশিংটনের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসছে?

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পাঠানো দুটি বার্তা ওয়েস্টমিনস্টারের কিছু মহলে নতুন এক ব্রিটিশ অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে, যাতে বৃটেনকে আরও দৃঢ়, কম অনুগত, এমনকি কৌশলগত স্বাধীনতার দিকেও ঝুঁকছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে এসব ইঙ্গিত ভিন্ন এক বাস্তবতাই তুলে ধরে: ব্রিটেন অবস্থান না বদলে কেবল সুর বদলাতে চাইছে, কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে শব্দচয়ন সামান্য পাল্টাচ্ছে। ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে যে প্রশ্নটি ব্রিটেনকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তা আবারও সামনে এসেছে : যুক্তরাজ্য কি ইউরোপীয় বলয় ছাড়তে পেরে কেবল আরও বেশি আমেরিকান নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
নাকি দেশটি দুই জগতের মাঝখানে ঝুলে থাকবে—ইউরোপ থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে যৌথভাবে কাজ করতে পারবে না, আবার ওয়াশিংটনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে একা সিদ্ধান্তও নিতে পারবে না?
প্রথম বার্তাটি ছিল ক্ষোভে ভরা। আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সেনাদের ভূমিকা খাটো করে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছিলেন, তার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেন স্টারমার এবং মন্তব্যগুলোকে “অপমানজনক ও জঘন্য” বলে আখ্যা দেন। এ বিষয়ে নীরব থাকা কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেই সম্ভব ছিল না—করণ এতে দেশে কড়া রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতো। সমালোচনাটি ছিল তীক্ষ্ণ, প্রায় নাটকীয়।
কিন্তু পরবর্তী ঘটনা প্রবাহই ছিল বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্প দ্রুত তার বক্তব্য ‘ব্যাখ্যা’ করে ব্রিটিশ সেনাদের “সাহসী যোদ্ধা” বলে প্রশংসা করেন, আর পুরো বিষয়টি একদিনের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। কোনো কাঠামোগত প্রশ্ন ওঠেনি, কোনো লাল রেখা টানা হয়নি। পরিচিত চিত্রই দেখা গেল—জোরালো আপত্তি, বাহ্যিক সংশোধন, এবং ‘বিশেষ সম্পর্কে’র পবিত্রতায় দ্রুত প্রত্যাবর্তন।
ট্রাম্প, তেহরান ও বিচার: অজানার দিকে যাত্রা শুরু-
দ্বিতীয় বার্তাটি আসে স্টারমারের ঐতিহাসিক চীন সফরের আগে, এবং এর সুর ছিল আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্রিটেনকে “যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা যাবে না” এবং চীনা বাজারে ব্রিটিশ ব্যবসার জন্য “গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ” রয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো এক নতুন নীতির রূপরেখা দিচ্ছেন—যা বহুমুখী বিশ্ব বাস্তবতাকে স্বীকার করে এবং কৌশলগত অবকাশ খোঁজে।
কিন্তু খুব দ্রুতই স্টারমার ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করেন যে যুক্তরাষ্ট্রই ব্রিটেনের “সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র”। একই সময়ে তার সরকার লন্ডনে একটি বিশাল নতুন চীনা দূতাবাস নির্মাণের বিতর্কিত পরিকল্পনার অনুমোদন দেয়, যা গুপ্তচরবৃত্তি ও বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। আবারও দেখা গেলো, ভাষায় স্বাধীনতার ইঙ্গিত, কিন্তু বাস্তবে আটলান্টিক কাঠামোর মধ্যেই অবস্থান।
এই সংকেতগুলোর তাৎপর্য বুঝতে হলে ব্রিটেনের সেই রাজনৈতিক স্মৃতির দিকে ফিরতে হবে, যার মুখোমুখি দেশটি কখনো পুরোপুরি হয়নি। ইরাক যুদ্ধের সময় টনি ব্লেয়ারকে যখন ‘বুশের পোষা কুকুর’ বলা হয়েছিল, সেটি কেবল অপমান ছিল না, ছিল একটি কঠিন মূল্যায়ন। এটি এমন এক গভীর কাঠামোগত নির্ভরশীলতার প্রতিচ্ছবি, যা ব্লেয়ারের সঙ্গেই শেষ হয়নি। যুদ্ধটি ছিল সেই ধারার সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশ, নৈতিক ভাষা ব্যবহার করে কৌশলগত আনুগত্য ঢেকে রাখা।
স্টারমার ব্লেয়ার নন, আর সময়টাও ২০০৩ নয়। কিন্তু ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির স্থাপত্য বদলায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব খোঁজার যে দেশটি বেরিয়েছিল, সে এখন বুঝছে, আসলে সে নিজের দরকষাকষির শক্তির বড় অংশই হারিয়েছে। ইইউর বাইরে ব্রিটেন দুর্বল, বেশি বিচ্ছিন্ন এবং এমন এক পরাশক্তির সদিচ্ছার ওপর আরও নির্ভরশীল, যার অগ্রাধিকার প্রতিটি নির্বাচনের সঙ্গে বদলে যায়।
এ কারণেই ট্রাম্প ও বেইজিংকে দেওয়া স্টারমারের দ্বৈত বার্তাগুলো কৌশলগত চালের চেয়ে ভাষাগত পরীক্ষা বলেই বেশি মনে হয়। ব্রিটেন স্বাধীন দেখাতে চায়, কিন্তু স্বাধীনতার মূল্য দিতে চায় না। ওয়াশিংটনকে সমালোচনা করতে চায়, কিন্তু উসকাতে চায় না। আবার বেইজিংকে কাছে টানতে চায়, কিন্তু ভয় দেখাতেও চায় না। সংক্ষেপে বললে, ক্ষমতা ছাড়া একটি পররাষ্ট্রনীতি চায়।
গত এক দশকে ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর পাতায় বারবার একটি যুক্তি উঠে এসেছে: ইউরোপকে এমন এক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর নিরাপত্তা বা প্রযুক্তিগত স্থিতিশীলতার নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা নয়। ট্রাম্প এই বাস্তবতা তৈরি করেননি। তিনি শুধু এর কূটনৈতিক মুখোশ খুলে দিয়েছেন। ন্যাটোর প্রতি তার অবজ্ঞা, শুল্ক হুমকি ও লেনদেনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপীয় রাজধানীগুলোকে সেই সত্যের মুখোমুখি করেছে, যা তারা দীর্ঘদিন এড়িয়ে গেছে।
গাজা ধ্বংসে ব্রিটেনের ভূমিকা: এক ধরনের সহ-অপরাধ-
যদি সব অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওয়াশিংটন-নির্ভরতা কমানো ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে হিমশিম খায়, তাহলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী ছোট, বিচ্ছিন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ব্রিটেন কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝখানে নিজের পথ তৈরি করবে?
এটাই মূল প্রশ্ন। স্বাধীনতা কোনো ঘোষণা নয়—এটি একটি সক্ষমতা। এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতি, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং একটি পরাশক্তিকে ‘না’ বলার পরিণতি সহ্য করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আজকের ব্রিটেনের কাছে এসবের কোনোটিই পর্যাপ্ত মাত্রায় নেই। ফলে তার পররাষ্ট্রনীতি হয়ে উঠছে ক্ষমতার প্রকাশ নয়, বরং এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার কসরত।
স্টারমারের সাম্প্রতিক বার্তাগুলো কি ব্রিটেনের ওয়াশিংটনের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ?
হয়তো এগুলো সেই আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা আর কার্যকর পদক্ষেপ এক নয়।
বাস্তবে আমরা দেখছি, একটি দেশ সুর বদলাচ্ছে, কিন্তু কাঠামোগত নির্ভরশীলতা বজায় রাখছে। সে একটি সরকার নতুন ভাষা নিয়ে পরীক্ষা করছে, কিন্তু নতুন অঙ্গীকার এড়িয়ে যাচ্ছে। আর তার একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি নিজেকে বাস্তববাদী দেখাতে চান, কিন্তু ব্রিটিশ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে চান না। -কারাম নামা, একজন ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক। তিনি বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে An Unlicensed Weapon: Donald Trump, a Media Power Without Responsibility এবং Sick Market: Journalism in the Digital Age।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button