এপস্টেইন ফাইলস: ইসরায়েলের দু: সাহসিক গোয়েন্দা অভিযান!
কুখ্যাত এপস্টেইন ফাইলস এখনো বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই নথিগুলো এমন একটি নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে, যা কখনোই কেবল একজন ব্যক্তির বিকৃত চরিত্রের গল্প নয়, বরং এগুলো প্রকাশ করেছে প্রভাব, আপস ও ব্ল্যাকমেইলের এক বিস্তৃত জাল, যেখানে জড়িয়ে পড়েছেন রাজপরিবারের সদস্য, বিলিয়নিয়ার, কূটনীতিক, প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আরব ব্যবসায়ীরা। এসব সম্পর্ক ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির সীমা ছাড়িয়ে একপ্রকার ভূরাজনৈতিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে। একই সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে, এপস্টেইনের কার্যক্রম কি ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহৃত একটি হাতিয়ার ছিল?
অস্পৃশ্যদের একটি ব্যবস্থা:
জেফ্রি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হলে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) তাদের নমনীয়তার জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সিনেটর বেন স্যাস ২০০৮ সালের কুখ্যাত প্লি ডিলকে “ব্যবস্থার এক জঘন্য ব্যর্থতা” বলে অভিহিত করেন। পরে ডিওজে’র কর্মকর্তারাই স্বীকার করেন, এপস্টেইনের মামলাটি ছিল এমন এক ব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে সহায়তাকারীরা নিজেদের অস্পৃশ্য বলে মনে করত। আজ সেই ব্যবস্থাই লাখো নথির মাধ্যমে নগ্ন হয়ে উঠেছে, যেখানে দেখা যায় কীভাবে এপস্টেইন মহাদেশজুড়ে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশাধিকার তৈরি করেছিলেন।
প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সংশ্লিষ্টতা সবচেয়ে সংবেদনশীল ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটি হয়ে আছে। ভার্জিনিয়া জিউফ্রের সঙ্গে তার সমঝোতা আইনি দোষ স্বীকার না হলেও, ২০২২ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, জনগণ জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সুনামের ক্ষতি ছিল মারাত্মক।
মার্কিন ক্ষমতা ও সহযোগিতা:
আটলান্টিকের অপর প্রান্তে, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা জবাব চেয়েছেন। ২০১৯ সালে সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বলেন,
“এপস্টেইন মামলা দেখায়, সম্পদ ও যোগাযোগ কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে বিকৃত করতে পারে। আমরা জড়িত সবাই সম্পর্কে পূর্ণ প্রকাশ চাই।”
এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, দলমত নির্বিশেষে সবাই স্বীকার করেছে, এপস্টেইনের প্রভাব ছিল একটি সামাজিক ব্যাধির ন্যায়। বিল গেটস, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিল ক্লিনটন—সকলেই এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তদন্ত ও সমালোচনার মুখে পড়েছেন, যদিও প্রত্যেকেই কোনো অন্যায়ের কথা অস্বীকার করেছেন। তবুও, এত ক্ষমতাধর ব্যক্তির নাম নথিতে থাকা প্রমাণ করে—এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধী নন, বরং প্রভাবশালীদের দালাল।
ডিওজ’র কাছে থাকা লাখো নথির ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানেন, এই কেলেঙ্কারির ব্যাপ্তি কতোটা বড়। তারা জানেন, বিষয়টি শুধু নির্যাতন নয়, বরং লিভারেজ বা চাপ প্রয়োগের কৌশল। এপস্টেইন গোপন তথ্য সংগ্রহ করতেন—আর গোপন তথ্যই হলো ক্ষমতার মুদ্রা। সেই মুদ্রা কেবল ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বরং ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে, এমন ইঙ্গিত এখন স্পষ্ট।
ইসরায়েলি যোগসূত্র:
এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা দিন দিন জোরালো হচ্ছে। চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো অনুপস্থিত হলেও, পারিপার্শ্বিক প্রমাণগুলো চোখে পড়ার মতো। এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ছিলেন রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের কন্যা—যিনি একজন মিডিয়া সম্রাট এবং মোসাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মতে, এপস্টেইনের কার্যক্রমে ক্লাসিক ‘কমপ্রোম্যাট’ কৌশলের ছাপ স্পষ্ট: ক্ষমতাবানদের আপত্তিকর পরিস্থিতিতে ফাঁসানো, প্রমাণ রেকর্ড করা এবং পরে তা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা।
যদি এপস্টেইন সত্যিই ইসরায়েলের একটি অ্যাসেট অর্থাৎ সম্পদ হিসেবে কাজ করে থাকেন, তাহলে এর তাৎপর্য হবে ভয়াবহ। রাজপরিবারের সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও আরব ব্যবসায়ীদের আপস করিয়ে ইসরায়েল কূটনৈতিক আলোচনা, বাণিজ্য চুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিপুল প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্যে এমন লিভারেজ ক্ষমতার ভারসাম্য সূক্ষ্ম, কিন্তু নির্ণায়কভাবে বদলে দিতে পারে।
নীরবতায় কার লাভ:
মূল প্রশ্ন শুধু কে জড়িত ছিল তা নয়, বরং কারা লাভবান হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, যা গোপন রয়ে গেছে তার মাধ্যমে। এপস্টেইন ফাইলস অ্যাক্টের সহ-প্রণেতা কংগ্রেসম্যান রো খানা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এখনো ২৫ লাখ পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হয়নি। ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা ফেডারেল বিচারকদের কাছে ডিওজে’র ওয়েবসাইট বন্ধের আবেদন জানিয়েছেন, কারণ অসম ও অসংলগ্ন সম্পাদনার মাধ্যমে নথি প্রকাশ আবারও ভুক্তভোগীদের ক্ষত খুলে দিচ্ছে।
নথিগুলো একটি স্পষ্ট ধারা দেখায়: বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি এপস্টেইনের অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার পরও তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তবে এসব নথি এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েল ছাড়া অন্যদের বিরুদ্ধে সরাসরি বৃহৎ অপরাধচক্রের প্রমাণ দিতে থেমে যায়। ডিওজে দাবি করেছে, ব্ল্যাকমেইলের প্রমাণ নেই। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এপস্টেইনের কার্যক্রমের কাঠামোই (নির্ভুল নথি সংরক্ষণ, ক্ষমতাবান অতিথি, ব্যক্তিগত দ্বীপ) প্রমাণ করে যে, চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল চাপ সৃষ্টি ও ব্ল্যাকমেইল।
চাঁদাবাজির এক জাল ধারা স্পষ্ট:
এপস্টেইন ক্ষমতাবানদের কাছে পৌঁছান, তাদের আপত্তিকর পরিস্থিতিতে জড়ান এবং সবকিছুর নিখুঁত রেকর্ড রাখেন। এটি ছিল পরিকল্পিত চাঁদাবাজি, কোনো এলোমেলো বিকৃতি নয়। তার দ্বীপ বিনোদনকেন্দ্র ছিলোনা, বরং ছিলো একটি ফাঁদ। প্রত্যেক অতিথিই ছিল সম্ভাব্য সম্পদ। নথিগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, এই পুরো কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল লিভারেজ তৈরি করা।
এমন লিভারেজের ভূরাজনৈতিক ব্যবহার অত্যন্ত স্পষ্ট। অস্ত্র বিক্রি, বাণিজ্য চুক্তি বা কূটনৈতিক স্বীকৃতির আলোচনায় সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের প্রভাবিত বা নীরব করতে পারা অমূল্য। যদি ইসরায়েল এপস্টেইনের কমপ্রোম্যাট থেকে লাভবান হয়ে থাকে, তবে তা হবে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক গোয়েন্দা অভিযানের একটি।
পরিণতি ও জবাবদিহি:
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। সুনাম ধ্বংস হয়েছে, প্রতিষ্ঠান উন্মোচিত হয়েছে, জোটগুলো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিন্তু জবাবদিহিতা এখনো অধরা। প্রিন্স অ্যান্ড্রু জনজীবন থেকে সরে গেছেন, কিন্তু কোনো ফৌজদারি অভিযোগ নেই। মার্কিন অভিজাতরা দায় অস্বীকার করে চলেছেন। বহু আন্তর্জাতিক নেতার নাম অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। আর ইসরায়েল যদি সত্যিই এই কার্যক্রম থেকে লাভবান হয়ে থাকে, তবু তারা কোনো তদন্ত বা জবাবদিহির মুখোমুখি হয়নি।
চাক শুমারের “সম্পূর্ণ প্রকাশে”র” আহ্বান এখনো পূরণ হয়নি। কিয়ার স্টারমারের “জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা”র দাবি নীরবতায় চাপা পড়েছে। ডিওজে স্বীকার করেছে এপস্টেইন গোপন তথ্য সংগ্রহ করতেন, কিন্তু তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো বিচার হয়নি। বিশ্ব পেয়েছে সত্যের খণ্ডাংশ—কিন্তু বিচার নয়।
উপসংহার: যে ছায়া কাটে না
এপস্টেইন ফাইলস কেবল একটি কেলেঙ্কারি নয়, এটি ক্ষমতা, গোপনীয়তা ও শোষণের সংযোগস্থলের একটি পাঠ। এটি দেখায় যে, কীভাবে অভিজাতরা আপসকামী হয়, বিচার বিকৃত হয় এবং ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়। এপস্টেইন ইসরায়েলের সম্পদ ছিলেন—এটি হয়তো কখনো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে না। কিন্তু পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, কৌশলগত যুক্তি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এসব কিছু সেদিকেই ইঙ্গিত করে। -জাসিম আল-আজ্জাওয়ি, একাধিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে এমবিসি, আবু ধাবি টিভি এবং আল জাজিরা ইংলিশ। সেখানে তিনি সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের সংবাদ কভার করেছেন, বিশ্বনেতাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং গণমাধ্যম বিষয়ক কোর্সও পড়িয়েছেন।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



