ইসরায়েলের স্বার্থে মার্কিন অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার

সাম্রাজ্যগুলো সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়ে পড়ে না, এগুলো ভেঙে পড়ে নিজেদের অহংকার ও দুর্নীতির ভারে। হোয়াইট হাউস থেকে যে ঔদ্ধত্য ছড়িয়ে পড়ছে, তা এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, এই পুরোনো সাম্রাজ্যিক সত্য আবারও নিজেকে প্রমাণিত হতে চলেছে।
যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব একসময় ওয়াশিংটন দিয়েছিল, আজ সেই ব্যবস্থাতেই সে প্রতিযোগিতা করতে অক্ষম। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন তার অর্থনীতিকেই অস্ত্রে পরিণত করেছে। বাণিজ্য, অর্থনীতি, মুদ্রা ও ঋণকে বানিয়েছে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার। ‘রুলস্-বেজড্ ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’ এখন রূপ নিয়েছে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ, সেকেন্ডারি শাস্তি ও আর্থিক ভীতির কাঠামোতে। অর্থনৈতিক শক্তি আর প্রতিযোগিতা বা বিনিময়ের মাধ্যম নেই; তা হয়ে উঠেছে প্রতিশোধের অস্ত্র। আর এই অস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্র সরকার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে—ইসরায়েলের স্বার্থে।
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার বহু আগেই, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলীয় মার্কিন প্রশাসনই উগ্র ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাষ্ট্রটিকে নিয়ন্ত্রণ করার ভান ছেড়ে দেয়। আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করার বদলে, ওয়াশিংটন একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তির কাঠামো গড়ে তোলে—যার উদ্দেশ্য ইসরায়েলকে জবাবদিহি থেকে রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির দাবি বা গাজায় ২৩ লাখ মানুষের অনাহার বন্ধের আহ্বানসংবলিত প্রস্তাবগুলোতে ভেটো দিয়েছে; আন্তর্জাতিক আদালতকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে; জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের শাস্তি দিয়েছে; মানবিক সংস্থা ও রাষ্ট্রনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে—যারা ইসরায়েলের অপরাধকে অন্য সব দেশের মতো একই মানদণ্ডে বিচার করতে চেয়েছে।
এই অর্থনৈতিক যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হলো অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার ও আর্থিক লেনদেন এখনো মূলত ডলারনির্ভর এবং মার্কিন নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হওয়ায়, ওয়াশিংটনের হাতে এমন ক্ষমতা এসেছে—যে কোনো দেশ, ব্যাংক বা ব্যক্তিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির শিরা-উপশিরা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। যে বিশেষাধিকার একসময় স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা ছিল, আজ তা ইসরায়েলের পক্ষে একটি মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েল-প্রথম নীতির নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ইরান, সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, ভেনেজুয়েলা—এমনকি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও অসংখ্য ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যাদের অনেকেরই কোনো সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তাদের ‘অপরাধ’ কী? ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ প্রকাশ করা, কিংবা মার্কিন সহযোগিতাকে প্রশ্ন করা। বার্তাটি স্পষ্ট: তেলআবিব-নিয়ন্ত্রিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে অমান্য করলে—আপনার অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান, এমনকি জীবনযাপনের সম্ভাবনাও গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু ইসরায়েল-প্রথম মতবাদের কাছে বন্দি থাকার মূল্য দ্রুত বাড়ছে। গ্লোবাল সাউথ ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শুরু করেছে। ব্রিকস জোট—যা বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ—স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি, বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডলারনির্ভর অবকাঠামো এড়িয়ে চলার পথে এগোচ্ছে। ব্রিকসের বাইরেও এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য—এমনকি ইউরোপে নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে উঠছে, যার লক্ষ্য ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ থেকে মুক্ত থাকা।
এই দেশগুলোর অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শিক প্রতিপক্ষ নয়; বরং তারা দীর্ঘদিনের বাণিজ্য অংশীদার। তারা ডলার ছাড়ছে বিদ্রোহ থেকে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত আর্থিক দাদাগিরির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে। একসময় যে ডলার ছিল বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদ, আজ তা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ডলারে সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রা—যা বাণিজ্য ও মুনাফা থেকে অর্জিত—একটি প্রেসিডেনশিয়াল আদেশেই জব্দ বা ফ্রিজ করা যেতে পারে। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বৈশ্বিক ব্যবস্থার নিয়মই বদলে দেওয়া হয়েছে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সার্বভৌম সম্পদ কার্যত জিম্মি।
এই বাস্তবতায় ডলারের ওপর নির্ভরতা আর সুরক্ষা নয়; তা এক ধরনের শিকল। যে ডলার রিজার্ভ একসময় অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে দেশগুলোকে রক্ষা করত, আজ তা রাজনৈতিক চাপ, সম্পদ জব্দ ও আর্থিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জাতীয় সঞ্চয় রক্ষায় ডলার ধরে রাখা আর বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনা নয়; এটি ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যিক এজেন্ডার সামনে এক মারাত্মক দুর্বলতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদাররাও বিকল্প খুঁজছে। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন—বিশ্ব “একটি ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে” এবং “রুলস্- বেজড্ অর্ডার” ক্ষয়ে যাচ্ছে। তিনি যখন বলেন, “হেজেমনরা সম্পর্ককে অনন্তকাল অর্থে রূপান্তর করতে পারে না”—তখন তার ইঙ্গিত ছিল না চীন বা রাশিয়ার দিকে; ছিল ওয়াশিংটনের দিকে, যারা সহযোগিতার বদলে বাণিজ্য ও মুদ্রাকে অস্ত্র বানাচ্ছে।
বাইডেনের মতো ট্রাম্পও আমেরিকার আর্থিক নেতৃত্ব রক্ষা করছেন না। অর্থনৈতিক শক্তিকে অস্ত্র বানিয়ে তিনি সেই ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করছেন, যা আমেরিকার সমৃদ্ধি টিকিয়ে রেখেছে। পরিহাস হলো—একটি বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে মার্কিন ডলার ও অর্থনীতিকে অধীন করে দিয়ে ওয়াশিংটন নিজেই ডি-ডলারাইজেশন ত্বরান্বিত করছে, সমান্তরাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, প্রতিদ্বন্দ্বী বাণিজ্য জোট শক্তিশালী করছে—এবং কার্যত ইসরায়েলকে দিয়ে আমেরিকার সোনার হাঁসটিকে হত্যা করতে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ কেবল শুরু। ডলারই একমাত্র অস্ত্র নয় যা যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে ব্যবহার করে। নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হলে বের হয় তলোয়ার। আর্থিক চাপ কাজ না করলে, ইসরায়েলের স্বার্থ পূরণে পাঠানো হয় মার্কিন সামরিক শক্তি। এই যুদ্ধগুলো বিক্রি করা হয় নিরেট মিথ্যার ওপর ভর করে। অর্থায়ন হয় ঋণে। মূল্য দিতে হয় মার্কিন সৈন্যদের রক্তে ও করদাতাদের ভবিষ্যৎ চুরি করে।
ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত মার্কিন মিডিয়ার মাধ্যমে তৈরি ভুয়া হুমকি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ইসরায়েল-প্রথম মতবাদীদের প্রচারণায় জায়োনিস্ট যুদ্ধযন্ত্র আবারও সচল হচ্ছে। যে ইসরায়েলি নেতা ২০০২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসে মিথ্যা বলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাকের কাদায় টেনেছিল, সে আবার ফিরে এসেছে।এবার ফিরে এসেছে আরও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে, আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি ‘ইসরায়েল-সৃষ্ট’ যুদ্ধে জড়াতে। -জামাল কানজ, (jamalkanj.com) Children of Catastrophe: Journey from a Palestinian Refugee Camp to Americaসহ একাধিক বইয়ের লেখক। তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় আরব বিশ্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত লিখে থাকেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button