অ্যাপল কি ডিজিটাল হরমুজ প্রণালী?
আমি আবারও আমার প্রিয় লেখক জন থর্নহিলের কাছে ফিরে যাই এবং তার কাছ থেকে সেই বিরল অন্তর্দৃষ্টির ঝলক ধার নেই। যখন তিনি স্ট্রেইট অব হরমুজ-এর জায়গায় অ্যাপল -কে বসালেন, প্রথমে তুলনাটি কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল—বলা যায় অনেক বেশি সাহসী। কিন্তু যত বেশি এটি নিয়ে ভাবা যায়, ততই এর নির্ভুলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয় এটি ক্ষমতার একটি সংকীর্ণ প্রবেশপথ, এমন একটি বটলনেক যার মধ্য দিয়ে জ্বালানি প্রবাহিত হয় এবং যেখান থেকে বিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। থর্নহিলের রূপকে অ্যাপলও একই কাজ করে, তবে ডিজিটাল ভূগোলে ভোক্তাভিত্তিক সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সে ক্ষেত্রে অ্যাপল প্রযুক্তিগতভাবে হরমুজ প্রণালীর সমতুল্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। কারণ এটি সবসময় সবচেয়ে উদ্ভাবনী নয়, কিংবা এআই প্রতিযোগিতায় শীর্ষে নেই, বরং এটি “পথ” নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানোর পথ। অ্যাপল একই সঙ্গে অংশীদার এবং টোল আদায়কারী হতে পারে, ঠিক হরমুজ প্রণালীর মতো। এটি তৃতীয় পক্ষের কোনো মডেল লাইসেন্স করতে পারে, সেটিকে নিজের ক্লাউড-ভিত্তিক সেবার মধ্যে যুক্ত করতে পারে এবং অ্যাপ স্টোর-এর মাধ্যমে বিক্রি হওয়া প্রতিটি সাবস্ক্রিপশন থেকে অংশ নিতে পারে।
যেমন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ দিয়ে যায়, তেমনি অ্যাপলের প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপ স্টোরের নিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ লেনদেন তাকে পুরো বাজারকে প্রভাবিত করার, কর আরোপ করার কিংবা সম্পূর্ণভাবে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
এই বিশ্লেষণটি এসেছে অ্যাপলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনার এক সূক্ষ্ম সময়ে। টিম কুক, যিনি প্রয়াত দূরদর্শী স্টিভ জবস-এর উত্তরাধিকার শান্ত, শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়েছেন, তিনি এই মিথের স্রষ্টা ছিলেন না, বরং এর রক্ষক ছিলেন। তিনি অ্যাপলকে একজন ব্যক্তির প্রতিভা থেকে একটি সিস্টেমের যন্ত্রে রূপান্তর করেছেন—অনুপ্রেরণা থেকে অবকাঠামোতে।
২০১১ সালে সিইও হওয়ার পর থেকে কুক এমন একটি কোম্পানিকে পরিচালনা করেছেন যার মূল্য ছিল প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার, যা এখন ৪ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আয় প্রায় চারগুণ বেড়েছে এবং অ্যাপল এখন ২.৫ বিলিয়নেরও বেশি সক্রিয় ডিভাইসের বৈশ্বিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে।
আজ কোম্পানিটি তার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় নেতৃত্ব দেওয়ার পর কুক এক্সিকিউটিভ চেয়ারের ভূমিকায় যাবেন, আর অ্যাপলের দীর্ঘদিনের হার্ডওয়্যার প্রধান জন টার্নাস ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সিইও পদ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টার্নাস ধারাবাহিকতার প্রতীক, তবে একই সঙ্গে গুরুত্বের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেন। প্রশিক্ষণে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, তিনি তার পেশাগত জীবনের বেশিরভাগ সময় অ্যাপলে কাটিয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রধান পণ্যগুলোর হার্ডওয়্যার উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ম্যাক এবং আই ফোন-এর উন্নয়ন, নিজস্ব চিপ তৈরির রূপান্তর এবং এয়ারপডস চালুর ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা ছিল।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তিগত বিস্ফোরণের যুগে শুধু রক্ষণাবেক্ষণ কি যথেষ্ট? থর্নহিল একটি বড় বৈপরীত্যের ইঙ্গিত দেন: ক্ষমতা এখন আর শুধু আবিষ্কারে নেই, বরং প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে। এআই কোম্পানি বাড়ছে, ধারণা প্রবাহিত হচ্ছে, মডেলগুলো প্রতিযোগিতা করছে—কিন্তু ব্যবহারকারী এখনও একটি স্ক্রিনের ভেতর বন্দী। আর সেই স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাপল, প্রহরী হিসেবে।
ফোন আর শুধু একটি ডিভাইস নয়, এটি সিদ্ধান্তের একটি বন্ধ সিস্টেম। কী ইনস্টল করা যাবে, কী জন্য অর্থ দিতে হবে, একটি সেবা কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সবকিছুই একটি মাত্র ফিল্টারের মধ্য দিয়ে যায়। এটি কেবল প্রযুক্তিগত ফিল্টার নয়, অর্থনৈতিক ফিল্টারও। আর এখানেই রয়েছে অ্যাপলের নিজস্ব “হরমুজ কর”।
যে কোনো অ্যাপ, সেবা বা সাবস্ক্রিপশন ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছালে, অ্যাপল সেখানে একটি অংশ নেয়, একটি সিদ্ধান্ত দেয়। ভূরাজনীতিতে এমন চৌকপয়েন্ট বা প্রণালির ঝুঁকি সুপরিচিত: যেকোনো উত্তেজনা তেলের দাম বাড়ায়, যেকোনো হুমকি বাজার কাঁপিয়ে দেয়। প্রযুক্তিতে এই হুমকি আরও নীরব, কিন্তু গভীর। যখন একটি কোম্পানি নিজেই “পথ” হয়ে ওঠে, তখন উদ্ভাবনও তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করে। ডেভেলপাররা কী সম্ভব তা ভাবার বদলে কী অনুমোদিত তা ভাবতে শুরু করে, এভাবে সৃজনশীলতা হয়ে যায় এক ধরনের দরকষাকষি। এআই এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে। বিপ্লব ঘটে গবেষণাগারে, কিন্তু ব্যবহার ঘটে মানুষের পকেটে, আর সেই পকেটের বড় অংশই অ্যাপল নিয়ন্ত্রণ করে। একটি ছোট কোম্পানি যুগান্তকারী মডেল তৈরি করতে পারে, কিন্তু ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাতে তার একটি “জানালা” দরকার। আর সেই জানালা না বিনামূল্যের, না নিরপেক্ষ।
এআই গবেষণায় আধিপত্য না করেও অ্যাপল এর বিতরণে আধিপত্য করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয় কেন্দ্র এবং উন্নত চিপ উৎপাদন লাইন নিয়ন্ত্রণ করে এটি সবাইকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে পারে। অতীতে জ্ঞান ছিল শক্তি। আজ প্রবেশাধিকারই শক্তি।
অ্যাপলের এআই-তে প্রথম হওয়ার দরকার নেই; কেবল সেই দরজা হওয়াই যথেষ্ট যার মধ্য দিয়ে সবাইকে যেতে হবে। এটি একটি নীরব পরিবর্তন, কিন্তু গভীর।
প্রশ্ন হলো, এই “প্রণালী” কি ভাঙা সম্ভব? ইতিহাস বলে, হ্যাঁ, তবে কঠিন শর্তে: হয় এমন প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটতে হবে যা ডিভাইসের কাঠামোই বদলে দেবে, অথবা নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ আসতে হবে যা ক্ষমতার পুনর্বণ্টন করবে।
এখন পর্যন্ত, কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
এই অর্থে অ্যাপল শুধু একটি কোম্পানি নয়। এটি এক ধরনের অদৃশ্য অবকাঠামো, যা ব্যবহারকারীর চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে কী তার কাছে পৌঁছাবে।
শেষ পর্যন্ত, থর্নহিল অ্যাপলকে প্রশংসা করছেন না, বরং সতর্ক করছেন। সতর্ক করছেন সেই মুহূর্ত সম্পর্কে, যখন প্রযুক্তি নিজেই একটি প্রণালীতে পরিণত হয় এবং উদ্ভাবন হয়ে ওঠে বাধ্যতামূলক পারাপার।
তখন প্রশ্ন আর থাকে না: “কে ভালো?” বরং প্রশ্ন হয়: “কাকে পার হতে দেওয়া হবে?” যা একটি ভৌগোলিক রূপক হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক সত্যে গিয়ে দাঁড়ায়: অ্যাপল একটি কোম্পানি নয়, এটি একটি প্রণালী। আর যে এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই পথ নিয়ন্ত্রণ করে। -কারাম নামা, একজন ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক। তিনি বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে অ্যান আনলাইসেন্সড উইপন: ডোনাল্ড ট্রাম্প, আ মিডিয়া পাওয়ার উইদাউট রেসপনসিবিলিটি এবং সিক মার্কেট: জার্নালিজম ইন দ্য ডিজিটাল এজ।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



