স্টারমার যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, ফারাজের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ ততই বাড়বে

লেবার পার্টির “নিউ লেবার” ধারার স্থপতিরা দলটিকে দুইবার ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন—প্রথমবার যখন টনি ব্লেয়ার ২০০৩ সালে ইরাকে ব্রিটেনকে জড়িয়ে দেন, এবং দ্বিতীয়বার বর্তমান নেতা কিয়ের স্টারমারের অধীনে।
লেখকের মতে, লেবারের অন্যান্য সংকট—যেমন ১৯৮১ সালে “গ্যাং অব ফোর”-এর বিদ্রোহ বা ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট ভোট—দলের জন্য এতটা ক্ষতিকর ছিল না যতটা “নিউ লেবার” ছিল।
কারণ নিউ লেবার ক্ষমতায় উঠেছিল দলীয় শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে। তারা শুধু ট্রেড ইউনিয়ন, বামপন্থী ও প্রগতিশীলদের বিরোধিতা করেনি; বরং পথে থাকা প্রায় সবাইকে সরিয়ে দিয়েছে।
একই কৌশল, যা জেরেমি করবিনের নেতৃত্বকে দুর্বল করতে ব্যবহার করা হয়েছিল, পরে অ্যান্ডি বার্ণহ্যামের সংসদে ফেরার পথ আটকে দিতেও ব্যবহার করা হয়।
স্টারমার একসময় বলেছিলেন: “আপনি যদি আমাদের আনা পরিবর্তনগুলো পছন্দ না করেন, দরজা খোলা আছে, চলে যেতে পারেন।” এরপর করবিন আমলে যোগ দেওয়া দুই লক্ষাধিক সদস্য দল ছেড়ে যান। ২০১৯ সালের শেষে লেবারের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৩২,০৪৬। ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ৩৩৩,২৩৫-এ।
ওয়াশিংটনের ছায়া:
লেখকের মতে, ব্লেয়ার আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নিউ লেবার সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অবস্থানে থেকেছে। ব্লেয়ারের জন্য এটি ছিল ইরাক যুদ্ধ।
স্টারমারের ক্ষেত্রে এটি হলো, ইসরাইলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন, যখন গাজা পশ্চিম তীর এবং লেবাননে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল।
তবে লেখক বলেন, শুধু ইরাক বা গাজা নয়, আরও অনেক নীতিগত ব্যর্থতা স্টারমারের জনপ্রিয়তা কমিয়েছে।
তার মতে, সরকার: গ্রিন নিউ ডিল পরিত্যাগ করেছে পানি খাতকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়নি শিশু দারিদ্র্য কমাতে ব্যর্থ হয়েছে অভিবাসীদের বলির পাঁঠা বানিয়েছে স্টারমারের গাজা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে অস্বীকৃতি এবং ইসরায়েলের পানি ও বিদ্যুৎ অবরোধের প্রতি তার অবস্থানকে লেখক এসব ব্যর্থ নীতির প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
ব্যক্তিগত প্রত্যাখ্যান লেখকের মতে, প্রতিবার নিউ লেবার ভেঙে পড়লে দলটি “বোমাবিধ্বস্ত খোলস”-এ পরিণত হয়। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের ঐতিহ্যগত ঘাঁটি এবং “রেড ওয়াল” আসনগুলো ভেঙে পড়েছে। তিনি দাবি করেন, এই নির্বাচন আসলে এক প্রশ্নে গণভোট ছিল: “আপনি কি স্টারমারকে আরও তিন বছর ব্রিটেনের নেতা হিসেবে দেখতে চান?” তার মতে, ভোটারদের উত্তর ছিল স্পষ্ট “না”।
ফারাজের উত্থান:
লেখক মনে করেন, নাইজেল ফারাজ এবং রিফর্ম ইউকে এখন ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে।
তিনি বলেন, ইংল্যান্ডে রিফর্মকে থামানোর একমাত্র উপায় হলো বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তির বৃহৎ জোট গঠন।
এই জোটে থাকতে পারে:
গ্রিন পার্টি স্বতন্ত্র প্রার্থী ও দল স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি সিমরু অন্যান্য প্রগতিশীল সংগঠন মুসলিম ভোটারদের প্রসঙ্গ নিবন্ধে লেখক অভিযোগ করেন যে মুসলিম ভোটারদের নিয়ে “ষড়যন্ত্র তত্ত্ব” ছড়ানো হয়েছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ম্যানচেস্টারের একটি উপনির্বাচনের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে “ফ্যামিলি ভোটিং” নিয়ে অভিযোগ ওঠে।
নাইজেল ফারাজ মন্তব্য করেছিলেন যে এটি “প্রধানত মুসলিম এলাকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সততা” নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে পুলিশ তদন্তে এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে লেখক দাবি করেন।
ইসরায়েল ও লেবারের সম্পর্ক লেখকের মতে, স্টারমারের সময় লেবার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব বিষয়ে নেতানিয়াহুর সরকারকে সহায়তা করেছে।
তিনি অভিযোগ করেন: ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিকদের ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে গাজার ওপর নজরদারি ফ্লাইট চালানো হয়েছে অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ ইহুদি সমাজে বিতর্ক:
লেখক বলেন, ব্রিটিশ ইহুদি সমাজের ভেতরেও ইসরায়েল নিয়ে মতভেদ বাড়ছে। শার্লি বেগিন্সস্কি এবং জোস লেভি সতর্ক করেছেন যে, ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা শুধু রাষ্ট্রটির জন্য নয়, ইহুদিধর্মের জন্যও অস্তিত্বগত হুমকি হতে পারে।
সামনে কী?
ডেভিড হার্স্টের উপসংহার হলো: লেবারের সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব এখন নিজেদের রক্ষা করা নয়, বরং নাইজেল ফারাজকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে আটকানো। তার মতে, এটি সম্ভব হবে শুধুমাত্র তখনই যদি লেবার নতুন নেতৃত্বের অধীনে অন্যান্য বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তির সঙ্গে কাজ করতে শেখে, তাদের শত্রু হিসেবে না দেখে।
লেখকের শেষ মন্তব্য: “স্টারমার যতদিন ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকবেন, ফারাজের মুখের হাসি ততই বড় হবে।” -ডেভিড হার্স্ট, হলেন মিডল ইস্ট আই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক, ভাষ্যকার এবং সৌদি আরব বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তিনি এর আগে দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান লেখক ছিলেন এবং রাশিয়া, ইউরোপ ও বেলফাস্টে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি দ্য স্কটসম্যান পত্রিকায় শিক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button