ইসলামি বিবাহ কেমন হওয়া চাই

মুফতি হুসাইন আহমদ: মানব জীবনের একটিগুরুত্বপূর্ণ সময় যৌবনকাল। এ সময়ের একটি স্বভাবজাত ও সাধারণ চাহিদার নামবিবাহ।

আল্লাহপাক মানুষের মধ্যে যেমনি যৌনক্ষমতা সৃষ্টি করেছেন। তেমনিনারী-পুরুষের মাঝে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সহজাত আকর্ষণও সৃষ্টি করেচেন।

এ দুশক্তিবলে প্রতিটি নারী-পুরুষ যৌবনকালে যেমনি নিজেদের মধ্যে এক তীব্রউত্তেজনা অনুভব করে, তেমনি নারী পুরুষ একে অপরের প্রতি চুম্বকের ন্যায়আকর্ষিত হতে থাকে। অন্য কথায় পুঞ্জীভূত স্বভাবজাত প্রবৃত্তি বিপরীত শ্রেণীরপ্রতি আকষর্ণ করে যায় মুহুর্মুহু।

এটাই যৌবনের ধর্ম ও বাস্তবতা। মানুষেরচাহিদার বহিঃপ্রকাশ দুভাবে ঘটতে পারে। (১) স্বাভাবিক ও বৈধ পন্থায় (২)অস্বাভাবিক ও অনৈতিক পন্থায়।

মানুষের মধ্যে যৌনবোধ ও উত্তেজনা এবংবিপরীত লিঙ্গের প্রতি দুর্বলতা থাকায় এটাই স্বাভাবিক যে, সে তার বিপরীতলিঙ্গের সাথে প্রবৃত্তি তথা জৈবিক চাহিদা মিটাতে উদগ্রীব হবে এবং মিটাবেই।

এজন্য আল্লাহপাক মানুষের মধ্যে যৌনমনোবৃত্তি সৃষ্টির পাশাপাশি তার চাহিদাপূরণের জন্য বৈধ উপায় ও ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। আর তার নামই হচ্ছে বিবাহ। এবিবাহ পদ্ধতির মাধ্যমে একজন নারী ও পুরুষ তাদের স্বাভাবিক যৌনবৃত্তি সহজেইবৈধভাবে মিটাতে পারে।

বিবাহ ছাড়া দ্বিতীয় কোন বৈধ পথ নেই জৈবিক চাহিদামিটানোর জন্য। কেউ ভিন্নপথ অবলম্বন করলে তা হবে সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম এমনকিমানবিক দৃষ্টিতে চরম অন্যায়। একজন স্বাভাবিক, ভদ্র, রুচিশীল, সম্ভ্রান্ত ওনৈতিকতাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কখনো দ্বিতীয় পন্থা অবলম্বন করতে পারে না।

আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে বিবাহ পর্বটি কেবল বৈধ উপায়ে যৌনক্ষুধা নিবারণএবং যৌন তৃপ্তিউপভোগের নামান্তর হলেও প্রকৃতপক্ষে বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্যকেবল এটাই নয়।

বিবাহের উদ্দেশ্য হলো, নারী-পুরুষের পবিত্র জীবন-যাপন, পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করণ, মানব বংশ বিস্তারেরস্বাভাবিক ধারা অব্যাহত রাখা এবং এমন পন্থায় তার ক্রমবিকাশ দান করা যাতেমানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে।

যৌনতৃপ্তি অর্জনটাকোনমৌলিক উদ্দেশ্য নয়, বরং তা মূল লক্ষ্য অর্জনের পথে এক পরিতৃপ্ত অনুভূতিলাভের উপায় মাত্র।

মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা বৈধ উপায়ে মিটানোর জন্যআল্লাহপাক যে বিবাহ বিধান প্রদান করেছেন, তা কেবল পার্থিব কোন বিষয় নয়; বরংএকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত কার্যও বটে।তবে তা অবশ্যই শরীয়তকর্তৃক বিধিবদ্ধও নির্দেশিত পন্থায় সম্পন্ন ও অনুষ্ঠিত হতে হবে।

বিবাহের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত যত পর্যায়ও বিভাগ রয়েছে, সকল পর্যায়ে কুরআন ও হাদীসের আলোকেসুনির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি রয়েছে, যা অবলম্বন করলেই কেবল তা মার্জিত, সুন্দর ও ইবাদত হতে পারে।

নতুবা তা বিবাহ হবে ঠিকই কিন্তু পূর্ণ ইসলামীপদ্ধতিতে বিবাহ ও সর্বাঙ্গীন ইবাদত বলে বিবেচ্য হবে না। ইসলামী পদ্ধতিতেবিবাহের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো :

পাত্র-পাত্রী নির্বাচন
সন্তান প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর তার প্রতি নানামুখী চারিত্রিক আক্রমণ হওয়ারআশংকা থাকে, তাই এসময় অভিভাবকের কর্তব্য সন্তানের সার্বিক অবস্থার উপরতীক্ষ্ম ও সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

সন্তান যাতে যৌবনের তাড়নায় কোন প্রকার অসৎ পথতথা চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার না হয় তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

তারপরেও যদি তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হয়, তবে অভিভাবকের কর্তব্য হলোতাকে বিবাহ দেয়ার ব্যবস্থা করা। যাতে সে বৈধ উপায়ে যৌন চাহিদা মিটিয়েচরিত্রহীনতার কবল থেকে রক্ষা পায়।

যদি বিবাহের তীব্র প্রয়োজন দেখা দেয়াসত্ত্বেও অভিভাবক তাকে বিবাহ থেকেনিবৃত রাখে আর সে জৈবিক চাহিদা মিটাতেকোন অন্যায় পথ বেছে নেয়, তবে হাদীসে এসেছে এর গুনাহ অভিভাবকের উপর গিয়েবর্তাবে।

অবশ্য সন্তান যদি যৌবন হেফাজত করতে সক্ষম হয়, সে ক্ষেত্রে সন্তানঅর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতেপারে। বালেগ হওয়ার পরপরই হোক কিংবা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে হোক, বিবাহেরপ্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম আসে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন পর্ব।

বিবাহ যেহেতু একদীর্ঘ ও স্থায়ী দাম্পত্য সম্পর্ক, তাই হুট করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণকরা ঠিক নয়। খুব চিন্তা ভাবনা ও সতর্কতার সাথে কদম ফেলা চাই নতুবাপরবর্তীতে আফসোস করতে হয় বা পেরেশানী ভোগ করতে হয়। পাত্র-পাত্রী নির্বাচনেরক্ষেত্রে লক্ষণীয় অনেক দিক রয়েছে।

সামাজিক, আর্থিক, ধর্মীয়, আচার-ব্যবহার, মন-মনন, যোগ্যতা শিক্ষা, গুণ, চরিত্র, খেদমত, মিযায, মানসিকতা শারীরিকগঠন, বুদ্ধিমত্তা, ভক্তি, রুচী, পরিবার, বংশ সৌন্দর্য, প্রভৃতি মানদণ্ডেপাত্র পাত্রী নির্বাচন করা যেতে পারে। এ সবের মধ্যে দ্বীনদারীর দিকটাপ্রাধান্য দিতে হবে।

এক হাদিসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদকরেন, “পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সাধারণত সৌন্দর্য, অর্থবিত্ত, বংশ ওদ্বীনদারীর দিক লক্ষ্য করা হয়।

তবে তোমরা দ্বীনদারীকে প্রাধান্য দিবে।” এহাদিসে অন্যান্য দিক দেখা নিষিদ্ধ করা হয়নি। সর্বদিক দেখা যেতে পারে। তবেবিশেষ লক্ষ্য দিতে বলা হয়েছে দীনদারীর দিকে।

অর্থাৎ যদি পাত্র-পাত্রীদ্বীনদার হয়, আর বাকী দিকগুলো অপূর্ণ থেকে যায়, তবে হাদীসের ভাষ্যমতেঅন্যদিকের অপূর্ণতা বিবেচনায় না আনা।কেননা দীনদারী এমন এক সম্পদ যার কোনবিকল্প নেই।

যদি সব সাইড পাওয়া যায়, শুধু দীনদারী নেই, তবে সে নির্বাচনযথার্থ নয়। পক্ষান্তরে দীনদারী থাকলে তা যেমন আপনার দুনিয়ার জীবনে সুখ এনেদেবে, তেমনি আখেরাতের সুখ থাকবে অপেক্ষমান। সন্তানের অভিভাবক থাকলেপাত্র-পাত্রী নির্বাচনে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।

এ পর্যায়ে প্রথমেসন্তানের পদক্ষেপ না নেয়া চাই। সন্তানের সেন্টিমেন্ট তথা মন-মানসিকতা জেনেতদানুযায়ী অভিভাবক পাত্র-পাত্রীর সন্ধান করবেন। বাইরের দিক পুরুষেরা আরঅভ্যন্তরীণ দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন মহিলারা।

পুরুষেরা পাত্র-পাত্রীর গঠন, চুল, চেহারা গুণাগুণ ইত্যাদি দিকগুলো পাত্র পক্ষের নারী অভিভাকগণ দেখবেন।গাইরে মাহরাম কোন পুরুষের জন্য মেয়ে দেখা জায়েয নেই।

চাই তিনি ছেলের যতনিকটবর্তী আত্মীয়ই হোন না কেন। পুরুষেরা বাইরে থেকে যতটুকু সম্ভব খোঁজনিবেন, আর ছেলের মা, বোন, ভাবী প্রমুখ অভ্যন্তরীন মেয়েলী বিষয় সম্পর্কেখোঁজ নিতে পারেন।

অনুরূপভাবে পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেয়েপক্ষ ছেলেরএবং ছেলের পারিবারিক সকল দিকের খোঁজ খরব নিবে। তবে যে সমস্ত বিষয় খোঁজনেয়া দরকার কিন্তু পর্দা রক্ষার সাথে তার খোঁঝ নেয়া সম্ভব নয়, সেখানেপুরুষেরা নয় বরং ছেলে পক্ষের মেয়ে আত্মীয়রা গিয়ে তার খোঁজ খবর নিবেন।

এভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষে উভয় পক্ষ যদি বিবাহের ব্যাপারে একমত হয়, তাহলে এ পর্যায়ে সর্বশেষ কাজ হলো পাত্র ও পাত্রী পরষ্পরকে দেখা। অভিভাবকদেরউপর যতই আস্থা রাখুক না কেন, এক নজর কিংবা একবারের জন্যপাত্র ও পাত্রীরপরস্পরকে বিবাহের পূর্বে দেখে নেয়া উচিত।

এতে একদিকে যেমন অভিভাবক পক্ষভবিষ্যতে দায় এড়াতে পারে, তেমনি পাত্র-পাত্রী পরষ্পরকে চিনতে ও জানতে পারে।তদুপরি এতে পরস্পরের প্রতি পূর্ব হতেই এক প্রগাঢ় ভালোবাসার জন্ম হয়।পাত্র-পাত্রী উভয়েই একজন অন্য জনের ব্যাপারে মনোপুত হওয়া না হওয়া বিষয়ে আপনমত প্রকাশ করতে পারে।

ছেলের পছন্দের যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়, তেমনি মেয়েরপছন্দেরও সমান গুরুত্ব রয়েছে। তাই ছেলে মেয়ে অমত প্রকাশ করলে বিবাহেরব্যাপারে আর সামনে অগ্রসর না হওয়া উচিত। কেউ অমত করলে জোর করে চাপ প্রয়োগকরে যেমন তাকে সম্মত করা ঠিক নয়, তেমনি অমতে বিবাহ দেয়াও অন্যায় তবে বুঝানোযেতে পারে।

হাদিসে এক পলকের জন্য হলেও ছেলে-মেয়ের পরস্পরের দেখারপ্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে এ দেখার প্রক্রিয়াটিও শালীনতার মধ্যেথেকে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে দেখতে পারে, তবে তা অবশ্যইনির্জনে নয়, বরং সেখানে মাহরাম কেউ উপস্থিত থাকতে হবে, তিনি যে পক্ষেরই হোননা কেন। আর পাত্র কেবল পাত্রীর চেহারা দেখতে পারবে। অন্যান্য অঙ্গ নয়।প্রয়োজনে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারবে।

অনুরূপভাবে মেয়ে ছেলের চেহারাসহশারীরিক গঠন দেখতে পারবে এবং প্রয়োজনে কোন কথাও জিজ্ঞাসা করতে পারবে। তবে এদর্শনপর্ব একবারই হওয়া চাই।

পাত্রী দেখার সময় উপঢৌকন ইত্যাদি দেয়ার নিয়মপ্রচলিত থাকলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে তার আদৌ প্রয়োজনাদি কিংবা বাধ্যবাধকতানেই। অবশ্য কেউ দিলে হাদিয়াস্বরূপ পাত্রী গ্রহণ করতে পারবে।

পাত্রীনির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক সময় অভিভাবকরা পাত্রীকে চেইন, আংটি ইত্যাদি গিফটকরে যায়। এটাও দেয়া জরুরী নয়।

মূল বিবাহ
পাত্র-পাত্রী নির্বাচনপ্রক্রিয়া সুসম্পন্ন হওয়ার পর এবার মূল বিবাহের পালা। দেখা সাক্ষাত শেষেউভয় পক্ষ মিলে যদি বিবাহের তারিখ নির্ধারণ করে, তবে বিবাহের পূর্বে আর কোনঅনুষ্ঠান শরীয়তে নেই। অবশ্যই সমাজে ‘গায়ে হলুদ’ নামে একটি অনুষ্ঠান পালনকরা হয়।

শরিয়ত বিবাহে আনন্দ-ফূর্তির অনুমতি প্রদান করেছে। তাই এই আনন্দেরঅংশ হিসেবে মেয়ে পক্ষ নিজ বাড়ীতে ছেলে পক্ষও নিজ বাড়ীতে পরিমিত আনন্দ করতেপারে। তবে তাকে বিবাহের অংশ কিংবা শরিয়তের অংশ মনে করা আদৌ ঠিক হবে না।

সাথে সাথে উক্ত অনুষ্ঠান অবশ্যই অশালীন ও পর্দাহীনতা এবং নারী পুরুষের অবাধসমাগম থেকে মুক্ত হওয়া চাই। নতুবা তা গুনাহের কারণ হবে।

‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে পাত্রপক্ষের গৃহে পাত্রীপক্ষ বিবাহ সংক্রান্তজিনিসপত্র অনুরূপ পাত্রীর গৃহে পাত্রপক্ষ এ ধরনের জিনিসপত্র সরবরাহ করেথাকে; এটা সম্পূর্ণ অনুচিত এবং পরিহারযোগ্য।

এটা সম্পূর্ণ নিজ নিজ পরিবারেরব্যাপার। কেউ করতে চাইলে ব্যক্তিগত বা নিজ পরিবারগতভাবে করবে। এটা একটিঅনুচিত রেওয়াজ। এতে অনেক সময় দরিদ্র পরিবার অসহায়ত্বের শিকার হয়। বিশেষতঅপর পক্ষকে একাজেবাধ্য করা হলে তা হবে আরো জঘন্য ও নীচুমানের কাজ।

বিবাহের মোহর
বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মোহর নির্ধারণ। বিবাহের মোহর নির্ধারণওয়াজিব। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে স্বামীকর্তৃক স্ত্রীকে মোহর প্রদানেরনির্দেশ দিয়েছেন। মোহর হচ্ছে স্ত্রীর একটি একক হক্ব। এটা সম্পূর্ণ স্ত্রীরঅধিকার। তার নারীত্বের সম্মান।

মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ ১০ দেরহাম তথাবর্তমান দেশীয় মূল্যমানে প্রায় ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা। সর্বোচ্চ কোন পরিমাণনির্দিষ্ট নেই। তবে এক্ষেত্রে স্বামীর আর্থিক অবস্থা বিচেনায় রেখে মোহরনির্ধারণ করা কর্তব্য। এমন পরিমাণ সে নির্ধারণ করবে, যা সে নগদে বাপরবর্তীতে আদায়ে সক্ষম।

হবু স্ত্রীর বংশীয়া মহিলার মোহর এবং স্বামীর আর্থিকঅবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটা পরিমাণ বিবেচনা করে অংক নির্ধারণ করা যেতেপারে। প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে এমন পরিমাণ নির্ধারণ করা ঠিক নয় যাস্বামীর পক্ষে আদায় করা আদৌ সম্ভব নয়।

এমনটি করলে সে অবশ্যই গুনাহগার হবে।কেননা মোহর একটি অবশ্যই আদায়যোগ্য ঋণ, অন্যান্য ঋণ অনাদায়ী থাকলে তার জন্যযেমন জবাবদিহি করতে হবে, তেমনি এর জন্য আখেরাতে জবাবাদিহি করতে হবে।মৃত্যুকালে মোহর মাফ করিয়ে নেয়া যেমন কাপুরুষতা তেমনি তাতে অনেক ক্ষেত্রেবাস্তবেমাফ হয় না।

তাই স্বামী যে পরিমাণ আদায় করার ক্ষমতা রাখে, সেইপরিমাণ মোহরই নির্ধারণ করবে। অবশ্যই স্বামীর উচিত স্ত্রীর মর্যদার দিকেওলক্ষ্য রেখে সঙ্গতিপূর্ণ পরিমাণ নির্ধারণ করা। সমাজে মোহরে ফাতেমীর প্রচলনরয়েছে। তবে শরীয়তে এর কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

কেউ চাইলে তা নির্ধারণ করতেপারে। মোহরে ফাতেমীর পরিমাণ ৫০০ দেরহাম তথা ১৩১ তোলা রূপা। বর্তমানেসমমূল্য নির্ধারিত হবে তোলার বাজার রেট হিসেবে। আগেই বলেছি মোহরের প্রাপকএকমাত্র স্ত্রী। তাই নির্ধারিত মহরে বিবাহ করতে রাজি কি না তার স্বীকৃতিদেয়ার কর্তৃত্ব একমাত্র কনের।

বিবাহ অনুষ্ঠান
বিবাহ অনুষ্ঠানসাদাসিধে হওয়া বাঞ্ছনীয়। বেশি ধুমধাম ও আড়ম্বর না করা উচিত। মেয়ে পক্ষেরউপর চাপ হয় এমন কোন প্রোগ্রাম মেয়ে পক্ষের নেয়া যেমন ঠিক নয় তেমনি ছেলেপক্ষের থেকেও এমন চাপ দেয়া অমানবিক।

কেননা, বিবাহের সময় ইসলামে মেয়ে পক্ষেরকোন খরচ নেই। খরচ করতে চাইলে ছেলে-পক্ষ করতে পারে। বর্তমানে বিবাহেছেলে-পক্ষ বরযাত্রীর বিশাল বহর নিয়ে মেয়ে পক্ষের বাড়ী গিয়ে ওঠে এবং মেয়েপক্ষকে তাদের দাবী অনুযায়ী খানা খাওয়াতে হয়; এটা সম্পূর্ণ অন্যায় এবং শরীয়তঅসমর্থিত।

বিবাহের দিন মেয়ের পক্ষ থেকে কোন উকিল ছেলের বাড়ী গিয়ে বিবাহঘটিয়ে দিয়ে আসাই ছিল ইসলামের মূল বিবাহ নিয়ম। কিন্তু এখন উল্টো হয়ে গেছে।এখন ছেলেরা মেয়ের বাড়ী গিয়ে বিবাহ করে।

এটা যতটা না আপত্তিকর, তার চেয়েওবেশি আপত্তিকর একাধিক গাড়ী বোঝাই করে শত শত মানুষ বরের সাথে যাওয়া। কেননাএটা এক প্রকার চাপ, যা মেয়ে পক্ষকে বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হয়।

অথচ ইসলাম তাকেএব্যাপারে মোটেও বাধ্য করেনি। বিশেষত মেয়ে পক্ষ যদি গরীব হয়, তবে তা হবেআরো জুলুম ও অবিচার। বিবাহের মত এমন আনন্দ অনুষ্ঠানে এভাবে জুলুম করা কতটাঅমানবিক তা অবশ্যই চিন্তার ব্যাপার।

এভাবে অনুষ্ঠিত বিবাহকে কি সঠিক অর্থেআনন্দানুষ্ঠান বলা যেতে পারে? বিশেষত যে পরিবারের সাথে আপনার এক নতুনসম্পর্ক হতে যাচ্ছে, যাদের সাথে আপনি আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছেন, যাদের সাথে আপনার গড়তে যাচ্ছে এক চমৎকার সম্পর্ক, তাদের প্রতি এই অবিচারকরা কি বিবেক বিরুদ্ধ নয়?

অন্যকে বিপদে নিক্ষেপ করে এভাবে আনন্দের কোনোঅর্থ হতে পারে কি? শত শত ঘটনা আজ সাক্ষী, মেয়ে বিয়ে দিতে গিয়ে কত মানুষকেনিঃস্ব হতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

ঋণের শিকার হতে হয়েছে অনেক বাপ-ভাইকে।মেয়ে বিবাহ দিতে ভিক্ষা পর্যন্ত করতে হয়েছে। ঋণ করে ছেলের দাবী পূরণ করতেহয়েছে মেয়ের অভিবাবকদের। কি জঘন্য! কি নিষ্ঠুরতা! কি অমানবিকতা!

আগেইবলেছি ইসলাম মেয়ের বিবাহে পিতাকে কোন খরচের জন্য বাধ্য করেনি। তবে পিতাচাইলে এবং স্বাভাবিক সঙ্গতি রখলে, নিজ আত্মীয় স্বজন এবং ছেলে পক্ষের কিছুলোককে দাওয়াত করে খাওয়াতে পারে।

মেয়ের অভিভাবকদের অনুমতি ব্যতিরেকে আত্মীয়স্বজন কিংবা ছেলের সাথে অধিক বর যাত্রী যাওয়া জায়েয নেই। যেতে হলে অবশ্যইঅনুমতি নিতে হবে।

অনুমতি চাওয়ার পূর্বে তার আর্থিক অবস্থা অবশ্যই সামনেরাখতে হবে। আর্থিক সঙ্গতি না থাকলে তার কাছে অনুমতি চাওয়াও ঠিক হবে না।অনুমতি দিলেও তা যথার্থ হবে না।

মোটকথা, বরযাত্রী নেয়ার ব্যাপারেছেলেপক্ষের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, এত লোকের পূর্ব অনমুতি নেয়া হয়েছেকি না, নেয়া হলেও মেয়ে পক্ষ আদৌ স্বাভাভিকভাবে তাদের আপ্যায়নের যোগ্যতারাখে কি না।

অন্যথায় বর শুধু তিন জনপ্রয়োজনীয় লোক নিয়ে বিবাহ করে আসবে।মেয়ে পক্ষের উপর চাপ হয় এমন কিছুই করা যাবে না। অনমুতি সাপেক্ষে হোক বাঅনুমতি ব্যতিরেকে হোক।

বিবাহ শুক্রবারে এবং মসজিদে হওয়া মুস্তাহাব।বিবাহ মজলিসে উপস্থিত লোকদের খেজুর খোরমা দ্বারা মিষ্টিমুখ করানোমুস্তাহাব। বর্তমানে বিবাহ বাড়ীতে প্রবেশের মুখে গেট ইত্যাদি করা হয় এবং ঐগেট পার হতে ছেলে পক্ষের থেকে কিছু অর্থ খসানো হয়।

এটা পরিহার করা উচিত।কিছু অর্থের জন্য মেহমানকে এভাবে আটকেদেয়া, খুবই ছোট মানুষী কাজ। বাড়তিআনন্দের জন্য এটা করাহয় বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে অঘটন ঘটে; দুপক্ষের মাঝেউত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। তাই তা পরিহার করা দরকার।

মূল বিবাহঅনুষ্ঠানে যেহেতু গায়রে মাহরাম পুরুষ থাকবে, তাই কনেকে সেখানে উপস্থিত করাযাবে না। কনের পক্ষ থেকে অনুমতি নিয়ে উকিল আসবে। সেই উকিল দুজন সাক্ষীরসামনে ছেলের কাছে প্রস্তাব পেশ করবে, ছেলে সে প্রস্তাব গ্রহণ করবে। ব্যসবিবাহ হয়ে গেল।

বিবাহের প্রস্তাব ও সমর্থনের সময় সাধারণত উকিল/অভিবাক ওছেলেকে মুসাফা করতে দেখা যায়। এটা জরুরী নয়। স্বাভাবিক প্রস্তাব ও গ্রহণইযথেষ্ট। অনেক সময় ইজাব-কবূল তিনবার করা হয়, এটাও নি®প্রয়োজন। প্রথমবারেইবিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায়।

বিবাহ অনুষ্ঠানে খুতবা পাঠ করা সুন্নাত। এ সুন্নাতআদায় করা ভাল। তবে কোন কারণে ছুটে গেলে বা খুতবা পাঠে সক্ষম এমন কাউকে নাপাওয়া গেলে মূল বিবাহে কোন ক্ষতি হয় না। খুতবা বিবাহের পরে বা পূর্বে উভয়সময় পড়া যায়।

রেজিষ্ট্রি বিবাহ কোন জরুরী বিষয় নয়। তবে করলে কোন ক্ষতিনেই। বিশেষত যেহেতু সরকারী আইন, তাই করে নেয়াই ভাল। রেজিষ্ট্রির খরচেরদায়িত্ব বর্তায় ছেলে পক্ষের উপর। তবে ছেলে অসচ্ছল হলে মেয়ে পক্ষও তা বহনকরতে পারে।

বিবাহের পর নতুন আত্মীয়দের সাথে কোলাকুলি করা জরুরী নয়, নাকরাই ভাল। বিবাহ করতে বর বিশেষ পোশাক ও টুপি পরে মুখে রুমাল দিয়ে থাকে; এসব আদৌ কোন জরুরী বিষয় নয়। বিবাহ অনুষ্ঠানে বর কথা বলতে পারবে না’- এমনধারণা ঠিক নয়। সেও প্রয়োজনে কথা বলতে পারবে।

বরের সাথে যাওয়া মেয়ে কিংবাবিবাহ বাড়ীর মেয়েদের সাথে অবাধ কথোপকোথন ও চলাফেরা করা যাবে না। মেয়েদেরআলাদা স্থান ও ছেলেদের আলাদা স্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্তত তাদের মাঝেপর্দা থাকা চাইই। বিবাহে আনন্দ-ফূর্তি পরিমিত আকারে করা দোষণীয় নয়। আনন্দফূর্তি করতে যেয়ে রঙবাজি, গান-বাজনা, ছবি তোলা, অশ্লীলতা ইত্যাদি পরিহারকরতে হবে।

বিবাহের পূর্বে যেমন গায়রে মাহরাম হারাম ছিল, অর্থাৎ তাদের সাথেদেখা দেয়া নাজায়েয, তেমনি বিবাহের পরেও যারা গায়রে মাহরাম থাকে তাদের সাথেদেখা দেয়া জায়েয নয়। ছেলে, মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই এ হুকুম প্রযোজ্য। বিবাহেরপর বাসর রাত শ্বশুর বাড়ীতে হতে পারে, আবার নিজ বাড়ীতেও হতে পারে।

ওলীমা
বিবাহের পর এখন শুধু বাকী ওলীমা বা বৌভাত অনুষ্ঠান। এটাও সম্পূর্ণ ছেলেপক্ষের দায়িত্ব। এ অনুষ্ঠান করা সুন্নাত। তবে তাও সঙ্গতি অনুযায়ী।প্রত্যেকে নিজ নিজ সঙ্গতি অনুযায়ী এ অনুষ্ঠান করবে। এ অনুষ্ঠান ছেলেরবাড়ীতে হয়।

ছেলেরা সামর্থানুযায়ী নিজ আত্মীয় ও মেয়ে পক্ষের লোকদের দাওয়াতকরবে। এ অনুষ্ঠানের মৌলিক উদ্দেশ্য অবশ্যই হতে হবে সুন্নাত আদায়। লোকদেখানো কিংবা চাপে পড়ে তা না করা চাই। এ অনুষ্ঠান করে মেহমানদের থেকেহাদিয়া গ্রহণ না করা চাই। কারণ এতে বিশেষত গরীবদের উপর চাপ হয়ে যায়।

অনেকেউপস্থিত হতে পারে না অনেকে ঋণ করে হাজির হয়। এ প্রথা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ‘উপঢৌকন না আনার জন্য ধন্যবাদ’ আগাম বলে দেয়া যেতে পারে। বিয়ের পর যে কোনসময় ওলীমা করা যেতে পারে। উত্তম খানাও জরুরী নয়। মিষ্টি ইত্যাদি দ্বারাওকরা যেতে পারে।

বৌভাত অনুষ্ঠানে নববধুর চেহারা প্রদর্শনী হয়। এটা সম্পূর্ণহারাম। এটা কিছুতেই করা যাবে না। মহিলারাই কেবল তাকে দেখতে পারবে। গায়রেমাহরাম কোন পুরুষ পারবে না। যারা দেখবে ও দেখাবে সবাই গুনাহগার হবে।স্বামীর বাড়ী থেকে প্রথমবার তিন দিন পর পিত্রালয়ে যাওয়ার কোন বাধ্যবাধকতানেই। সুবিধামতে যে কোন সময় যাওয়া যেতে পারে।

যৌতুক
যৌতুক হলো দাবীকরে পাত্রীপক্ষ হতে কোন কিছু গ্রহণ করা। এটা সম্পূর্ণ অবৈধ। মেয়ের পিতামেয়ে বিবাহ দেয়ার কারণে জামাইকে অর্থ-সম্পদও দিতে বাধ্য হবেন, এরকম ধারণামোটেও ঠিক নয়। এর জন্য তিনি দায়বদ্ধও নন। পিতা চাইলে তার মেয়েকে যা ইচ্ছাদিতে পারেন।

ছেলের জন্য কোন কিছু দাবী করে নেয়া হবে জুলুম। আর যদি মেয়েপক্ষ গরীব হয় তবে তা হবে আরো জঘন্য অন্যায়। সার্বিকভাবে ইসলামের এই সুন্দরনিয়ম ও অনুশাসন মতে বিবাহ সম্পন্ন হলে যেমন দাম্পত্য জীবনে শান্তি আসবে, তেমনি বিবাহ সংক্রান্ত মানবসৃষ্ট বহু জটিলতা অপসারিত হবে ইনশাআল্লাহ।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...

Close
Close