তুরস্কের নীল মসজিদ বিশ্বসেরা নান্দনিক নিদর্শন

Turkyহাজার দ্বীপ দিয়ে ঘেরা সুসজ্জিত তুরস্ক ভূখণ্ড। এর কিছু অংশ ইউরোপের অন্তর্গত হলেও অধিকাংশ এলাকা পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত। একে তাই দ্বি-মহাদেশিক দেশ বললেও অত্যুক্তি হবে কি? দেশটি পশ্চিমে ইজিয়ান সাগর ও গ্রিস, উত্তরে বুলগেরিযা ও কৃষ্ণ সাগর, পূর্বে সাবেক সোভিয়েত রাশিযা ও ইরান এবং দক্ষিণে ইরাক, সিরিয়া ও ভূ-মধ্যসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত।
সাগরবেষ্টিত উপকূল জুড়ে ব্লু-ওয়াটার বা নীল জলরাশি, গ্রিস বোট, সার্ফিং-রাইডস, আছে সী-বোট, ডাইভিং সরঞ্জামাদি, কেনাকাটার মনোরম ও বিলাসবহুল শপিং প্লেসেস, সী-সাইড রিসোর্ট, হলিডে আর ফেস্টিভাল উদযাপনের যাবতীয় ব্যবস্থা-আয়োজন দিয়েই সুসজ্জিত করে রাখা হয়েছে এখানকার সবকিছু।
দেশটির মোট আয়তন ৭, ৭৯, ৪৫২ বর্গকিলোমিটার। মোট আয়তনের ২৩,৭৬৪ বর্গ কি.মি. ইউরোপে এবং বাকি ৭,৫৫,৬৮৮ বর্গ কি.মি. এশিয়ায়। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী লোকসংখ্যা ৭ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার। জনসংখ্যার ৯৮.২% ভাগ মুসলমান। ভাষা : তুর্কী। মুদ্রা : লিরা।
প্রেসিডেনট : রজব তৈয়ব এরদোগান। প্রশাসনিক সুবিধার্থে তুরস্ককে ৬৭টি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছে।
তুরস্কের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ভূমধ্যসাগরের জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। শীতকালে জলবায়ু শুষ্ক থাকে, গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম। অভ্যন্তরীণ মালভূমিগুলোর প্রভাবে জলবাযু চরমভাবাপন্ন। শীতকালে ঠাণ্ডা ও বরফ পড়ে এবং গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে।
কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক উসমানীয় সাম্রাজ্য বিলোপ করে স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১৯২১ সালে দেশটির এসেম্বলি নতুন সংবিধানের পক্ষে ভোট দেয়।
নতুন সংবিধান অনুযায়ী জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলির প্রশাসনিক এবং আইনসভার ওপর সকল ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়। ১৯২৪ সালে ধর্মীয় আদালতের বিলুপ্তি ঘটে। ১৯২৮ সালে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবসান হয়। ১৯৩৪ সালে মহিলাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং পশ্চিমা চালচলনের অনুমতি দেয়া হয়। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ’৯০ এর দশকে ইসলামপন্থী দল ক্ষমতায় এলেও সেনাবাহিনী তাদের হটিয়ে দেয়। পুনরায় অন্য নামে দল গঠন করে ইসলামপন্থীরা রিসেপ তায়েপ এরদোগানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে।
তুরস্কের এশিয়া মহাদেশের অন্তর্গত প্রদেশগুলো খনিজ সমৃদ্ধ। বিশ্বের প্রধান ৪টি ক্রোমিয়াম ধাতু উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে তুরস্ক অন্যতম। এছাড়া অন্যান্য খনিজ দ্রব্যের মধ্যে কয়লা, তামা, পরিশোধিত সালফার ও লোহা অন্যতম।
তুরস্কের মাটি কৃষির জন্যে খুবই উর্বর। প্রধান কৃষিপণ্যের মধ্যে তুলা, তামাক, গম, ডুমুর, রেশম, জলপাই ও জলপাই তেল, শুষ্ক ফল, বাদাম, ধান, ভুট্টা, রাই, বার্লি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বিশ্বের দু’টি মহাদেশের অংশবিশেষ নিয়ে বিস্তৃত ভৌগোলিক ও আর্থ-রাজনৈতিক নানা বিচিত্রতা ছাড়াও তুরস্কের নানান ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য নিদর্শন ও প্রাকৃতিক স্থাপনা। এসব ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্ভাবনার চমৎকার প্রযুক্তিক কৌশল কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয় সরকার তুরস্ককে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়রূপে উপস্থান করেছে। অত্যন্ত নান্দনিক এবং শিল্পীত উন্নয়ন ও উপস্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে এর প্রতিটি ভ্রমণস্থলকে সাজানো হয়েছে মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য ঢেলে দিয়ে।
এখানকার ঐতিহাসিক, পুরাতাত্ত্বিক স্থাপনাসমূহের পাশাপাশি ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে সর্বশেষ প্রযুক্তি দিয়ে গড়ে তুলেছেন দারুণ সৌন্দর্য আর স্থাপত্যকৃর্তিতে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর সুবিধা সংবলিত মসজিদগুলো বর্তমান বিশ্বের সর্বাধুনিক, আকর্ষণীয় এবং দৃষ্টিনন্দন দর্শনীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। তুরস্কের সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ স্থাপত্য-নিদর্শন সংবলিত অন্যতম স্থাপনা হচ্ছে রাজধানী ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ ব্লু মসজিদ। এটিই আমাদের আলোচ্য বিষয়।
১৬০৯ থেকে ১৬১৬ সালের মধ্যে উসমানীয় সাম্রারাজ্যের সুলতান আহমেদ বখতি ঐতিহাসিক ব্লু মসজিদটি নির্মাণ করেন। সুবিস্তৃত মসজিদ কমপ্লেক্সে আছে একটি মাদরাসা, একটি পান্থনিবাস এবং প্রতিষ্ঠাতার মাজার। মসজিদের ভেতরের দিকের ছাদ এবং দেয়াল জুড়ে ২০ হাজার অত্যন্ত উঁচু মানের নীল রঙের আকর্ষণীয় টাইলস বসিয়ে বিশেষ দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে।
আর এখান থেকেই মসজিদটির নামকরণের সূত্রপাত।
রাজধানী ইস্তাম্বুল প্রদেশের মারমারা অঞ্চলের সুলতানাহমেত জেলায় মসজিদটির অবস্থান। ধারণক্ষমতা প্রায় দশ হাজার।
মসজিদের আয়তন : দৈর্ঘে ৭২ মিটার প্রস্থে ৬৪ মিটার, গম্বুজের উচ্চতা ৪৩ মিটার। এর স্থপতি ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত প্রযুক্তি ও স্থাপত্যবিদ সেদেফহার মেহেম্মেদ আয়া।
মূল মসজিদ ভবনের চারদিকে চারটি সুবৃহৎ এবং পেছনে আরও দু’টিসহ মোট ৬টি আকাশছোঁয়া সুদৃশ্য মিনার দূর থেকেই ভ্রমণ পিপাসুদের আকৃষ্ট করে।
এসবের আর্কিটেকচারাল বা প্রযুক্তিগত সৌন্দর্য সত্যিই দারুণ এবং চিত্তাকর্ষক। এটি মুসলমানদের জন্য নিছক একটি উপাসনা গৃহ নয় এটি ঐ অঞ্চলের সর্বাধিক জনপ্রিয় একটি পর্যটক আকর্ষণকারী স্থাপত্য-নিদর্শন।
ভাবানুবাদ ও সম্পাদনা : সোহরাব আসাদ

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button