আমাদের নারী সমাজ ও সম-অধিকার

সোলায়মান হাজারী ডালিম :
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল মধ্য সারির দেশ, সুদূর অতীত থেকেই এ অঞ্চলের নারীরা সামাজিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে, তবে সাম্প্রতিক কালে নারী জাগরণ বেশ সন্তোষজনক। কালের বিবর্তনে আমরা সামগ্রীকভাবে পিছিয়ে গেছি নাকি অগ্রগামী, তা বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ! তবে অচলায়তনের অচলারা আজ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে, যা ছিল সময়ের দাবি। নারী স্বাধীনতার জন্য কাজ করে গেছেন শুধু শরৎচন্দ্র, বেগম রোকেয়াই নন এমন আরো অনেক মনীষী। কিন্তু সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মকর্ম নারীদের যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে; আজকে সে সম্মান বা উচ্চতা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। নারী ও নারীসত্তার যে আত্মসম্মান তা যেন বিলীন হয়ে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সামাজিক সু-শিক্ষার অভাব এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি, সেই সাথে পুরুষশাসিত মনোভাবকে দায়ী করা হতো, বলা হতোÑ চার দেয়ালে বন্দী নারীরা। তাদের ওপর চলছে অমানুষিক নির্যাতন। আরো কত কী। একবিংশ শতাব্দীতে এসে তা আরো জোরালো হয়ে ওঠে। নারী স্বাধীনতা নিয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকাও, বেশ লক্ষণীয়। এ ছাড়াও আকাশ সংস্কৃতি আজকের বাংলাদেশের নারীসমাজকে কোথায় নিয়ে গেছে তা বলার অবকাশ রাখে না।
যদিও দেশের জাতীয় স্বার্থে নারীদের অবদানকে অস্বীকার করা বোকামি। যেমন দেশের প্রথম মহিলা ট্রেন চালক সালমা ২০০৩ সালে সহকারী থেকে পরিপূর্ণ চালক বনে যান, যা দেশের গর্বই বলা যায়। শুধু সালমা নন; এভাবে প্রশাসন, গণমাধ্যম, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনীতি, এভারেস্ট জয়সহ বিভিন্ন পেশায় নারীরা সফলতার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। পিছিয়ে নেই মাফিয়া বা ইয়াবা ব্যবসায়সহ অসামাজিক কার্যকলাপেও। মোট কথা চার দেয়ালে বন্দী নয়; থেমে নেই আজকের নারীরা। সর্বশেষ জাতীয় সংসদে দেশের প্রথম মহিলা স্পিকার নারীর ক্ষমতায়নে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
দেশ মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদে ভরে গেছে। তুলনা করা হচ্ছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবানদের সাথে। এমন দোহাই দিয়ে যাচ্ছেন গণমাধ্যমসহ  সুশীলসমাজের কর্তাব্যক্তিরা। দেশের নোংরা রাজনীতির উত্থান এভাবেই। এ সুযোগে উদারপন্থী নারীসমাজ আর বসে নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই তারা সোচ্চার, যার ফলে দেশের কৃষ্টিকালচার ভুলে নিজেদের বহু যতনে গড়া রূপ- সৌন্দর্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছেন খোদ নারীরাই। তাই আশঙ্কা ও ভয় হচ্ছে, নারী স্বাধীনতা বিলুপ্তির পথে মিডিয়ার এ প্রপাগান্ডাই কি দায়ী যা সাম্প্রতিককালে আমাদের মহান জাতীয় সংসদে ফুটে উঠেছে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের বক্তব্যই তার বড় উদাহরণ।
আমাদের স্বনামধন্য নারী নেত্রীরা কী বলেছেন, তা সবারই জানা। জাতীয় সংসদে উচ্চারিত নোংরা এসব কথা সরাসরি জাতির সামনে সম্প্রচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই আক্রমণে সরকার কিংবা বিরোধী দলের কেউ রেহাই পাননি অসংসদীয় ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য থেকে। এসব বক্তব্য প্রদান করে সুপার হিট সংসদ সদস্যে পরিণত হচ্ছেন কোনো কোনো নারী নেত্রী। যা পুরো জাতির কাছে এখন হট কেক তথা রাজনীতির ভাষায় ‘টক অব দ্য পয়েন্ট’। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে যাত্রাপথে বাস কিংবা ট্রেন, অফিস-আদালতসহ টেলিভিশন টকশো। এ ছাড়াও সোস্যাল মিডিয়ায় বেশ গুরুত্বের সাথে উঠে আসছে আমাদের দেশের স্বাধীনচেতা নারীদের এসব কল্পকাহিনী। নারী মায়ের জাত। আর এই জাতিকে তথাকথিত স্বাধীনতা কোথায় নিয়ে গেছে তা বলার ভাষা নেই। একজন নারী হয়ে তারা যেভাবে নারীর সম্মানকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন, তা সত্যিই দুঃখজনক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ দেশ ও জনগণের ভাগ্য নির্ধারণকারী জাতীয় সংসদে অশ্লীল গালগল্পের কর্মশালা। এটাই কি জনগণের প্রত্যাশা ছিল এভাবে কি নারীর স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাবে খোদ সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীকেও নারী স্বাধীনতার পক্ষে বড় বড় ‘ডায়ালগ’ দিতে দেখা গেছে। বিরোধী দলের নেতাকে নিয়েও মন্তব্য করেছেন তিনি। সংসদে দেয়া তার এসব বক্তব্য শালীন নাকি অশালীন! অসংসদীয় ও কুরুচিপূর্ণ ভাষার প্রয়োগ মানেই কি বাকস্বাধীনতা এর নাম কি নারী স্বাধীনতা পরিতাপের বিষয়, জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমাদের নারী নেত্রীরা অনবরত কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে ‘রুলিং’ কিংবা ‘এক্সপাঞ্জ’ অন্যথায় মাইক বন্ধ করা ছাড়া স্পিকার কার্যত কোনো প্রদক্ষেপ নিতে পারেননি। এসব অসংসদীয় আচরণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আদৌ কোনো আইন আছে কি না। সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নোংরামি করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই দিন দিন অশোভনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘স্ত্রীলোকের বিদ্যা শিক্ষা নারিকেলের মালার মতো; কখনো আদখানা বৈ পুরো দেখিলাম না।’ কবি এখানে বোঝাতে চেয়েছেন, নারীরা যতই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেন; তাদের মেধার সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যবস্থাপনা অর্ধেকের বেশি নয়। ইসলাম ধর্ম নারীদের সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দিলেও তাদের চলাফেরা ও কথাবার্তায় একটা ‘ছক’ বেঁধে দিয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা নিসায় নারী অধিকার সূরা এবং নারীদের কর্মপরিধি তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজব্যবস্থার জন্য বড় প্রয়োজন।
অতি স্বাধীনতায় নারীরা কতটা বখে যান, তার জ্বলন্ত প্রমাণ আমাদের নারীদের সাম্প্রতিক অবস্থান। স্কুল-কলেজ ক্যাম্পাস, রাস্তাঘাট তথা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিনোদন স্পট বা উদ্যানে অধিক স্বাধীনতা ও বেলেল্লাপনার চিত্র দেখা যায়। দিনের পর দিন এসবের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সংসারে অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ, পরকিয়া, খুন, মাদকসহ সব কিছুতেই জড়িয়ে পড়ছেন নারীরা; যা সামাজিক ব্যাধিতে রূপান্তরিত। এসবের জন্য আমাদের মায়েদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে শৈশব থেকেই কন্যাসন্তানদের টাইট ফিটিংসসহ নানা ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদ সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করছে না। দেশের নারীরা তথাকথিত স্বাধীনতার নামে এভাবে ধ্বংসের দিকে চলে যাবেন, তা মানা কঠিন। তাদের সম্মান করা সবার দায়িত্ব।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button