ইসরায়েল-তুরস্কের মধ্যে বিপজ্জনক শক্তির প্রতিযোগিতা

একসময় যেটি কূটনৈতিক বিচ্ছেদ হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা এখন রূপ নিয়েছে একটি আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতায়। সরাসরি যার প্রভাব পড়ছে গাজা থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত। এটা প্রভাব ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে।
বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক মহলে ইসরায়েল-তুরস্ক বিভাজনকে কেবল কূটনৈতিক নাটক হিসেবে দেখা হতো। ধরা হতো, পর্দার আড়ালে তাদের একটি দৃঢ় কৌশলগত অংশীদারত্ব বিদ্যমান। কিন্তু সেই বিশ্লেষণ আর কার্যকর নয়। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্কে একটি সীমারেখা অতিক্রম হয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক দূরত্ব রূপ নিয়েছে সরাসরি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায়—যার ফলাফল এখন যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলের জন্য উদ্বেগজনক।
এই হঠাৎ আঞ্চলিক পরিবর্তন কোনো সাধারণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ নয়; এটি মূলত অঞ্চলের ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণের লড়াই। ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক আধিপত্য ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের প্রধান শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে, তুরস্ক তার অর্থনীতি, বিশাল জনসংখ্যা, জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগত সংযোগস্থল হিসেবে অবস্থান এবং সামরিক সক্ষমতার ওপর ভর করে নতুন আত্মবিশ্বাসে ইসরায়েলের সেই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
গাজা: যেখানে আদর্শ ও কৌশল মুখোমুখি:
গাজা উপত্যকা এখনো সবচেয়ে অস্থির ফাটলরেখা, যা পুরো অঞ্চলকে একটি বড় সংঘাতে টেনে নিতে সক্ষম। ইসরায়েলের কাছে হামাস একটি অস্তিত্বগত হুমকি, যাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা আবশ্যক। বিপরীতে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান হামাসকে একটি “মুক্তি আন্দোলন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বিশেষ করে যদি তুর্কি বাহিনী কোনো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশ হয়, তাহলে হামাস ইস্যুই আঙ্কারা ও তেল আবিবের মধ্যে বড় সংঘর্ষের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা শাসনব্যবস্থা নিয়ে তুরস্ক এমন একটি কাঠামোর পক্ষে কথা বলছে, যেখানে হামাসের রাজনৈতিক শাখাসহ ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্ব থাকবে। ইসরায়েলের জন্য এটি একটি কঠোর লাল রেখা। গাজার ভবিষ্যৎ সরকারে তুরস্কের কোনো ধরনের বেসামরিক বা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ভূমিকা তারা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে। সাম্প্রতিক বিরোধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে। ইসরায়েল যখন ইউএনআরডব্লিউএ’র দায়মুক্তি প্রত্যাহার করে নেয়, তখন তুরস্কই সবচেয়ে জোরালোভাবে সংস্থাটির পক্ষে দাঁড়ায় এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আঙ্কারায় একটি লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন করে। বিভাজনটি স্পষ্ট। ইসরায়েল যেখানে নিরাপত্তা প্রয়োগ দেখছে, তুরস্ক সেখানে আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা দেখছে।
সিরিয়া: নিয়মহীন এক ভিড়াক্রান্ত যুদ্ধক্ষেত্র:
সিরিয়া শিগগিরই ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতন স্থিতিশীলতা নয় বরং ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করেছে। তুরস্ক সিরিয়ায় এমন একটি শক্তিশালী, মুসলিম-প্রধান সরকার চায়, যা কুর্দি স্বায়ত্তশাসন ঠেকাতে সক্ষম। বিপরীতে, ইসরায়েল চায় একটি দুর্বল, বিকেন্দ্রীভূত সিরিয়া, যার সেনাবাহিনী সীমিত এবং যা দামেস্কে ইরানের প্রভাব কমাতে পারবে।
উভয় দেশই এখন সিরিয়ায় প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে বা আকাশপথে অভিযান চালাচ্ছে। এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পরিকল্পিত যুদ্ধ নয়, বরং ভুল হিসাব—একটি ড্রোন হামলা, ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত বা প্রক্সি বাহিনীর সংঘর্ষ।
গ্যাস, নৌক্ষমতা ও পূর্ব ভূমধ্যসাগর:
জ্বালানি সম্পদের প্রতিযোগিতা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করেছে, বিশেষ করে সমুদ্রভিত্তিক মাত্রা যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে। ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাস এখনো ‘ইস্টমেড পাইপলাইন’ প্রকল্পে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যার লক্ষ্য তুরস্ককে পাশ কাটিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে গ্যাস পরিবহন। আঙ্কারা এটিকে তুরস্ককে অর্থনৈতিকভাবে “ঘিরে ফেলার” আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখে।
সাইপ্রাসে ইসরায়েলের অস্ত্র বিক্রি, বিশেষ করে বারাক এমএক্স প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এটি তুরস্কের কাছে নব্বইয়ের দশকের শেষের এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এবং এই ধারণাকে জোরদার করে যে ইসরায়েল গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে মিলে তুরস্কের শক্তি সীমিত করতে চাইছে।
লফেয়ার ও অর্থনৈতিক প্রতিশোধ:
পূর্ববর্তী দ্বন্দ্বগুলোর তুলনায়, এবার বিরোধটি বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপে রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে তুরস্ক যে বাণিজ্যিক বয়কট আরোপ করে, সরকারি পর্যায়ে সীমিত লেনদেন ছাড়া তা এখনো কার্যকর রয়েছে। এক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৫ সালের শেষ দিকে তুরস্ক ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এগুলো বাস্তবায়িত হোক বা না হোক, এই পদক্ষেপগুলো পারস্পরিক সম্পর্ককে এমনভাবে রাজনৈতিক করে তুলেছে যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা আর সম্ভব নয়।
সোমালিল্যান্ড
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ইসরায়েল প্রথম এই স্বীকৃতি দেয়। এটি তুরস্কের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ, কারণ সোমালিয়ায় তুরস্কের গভীর কৌশলগত জোট এবং মোগাদিশুতে তাদের সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই স্বীকৃতিকে সোমালির সার্বভৌমত্বের “অবৈধ” লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেন এবং এটিকে হর্ন অব আফ্রিকায় তুরস্কের প্রভাব খর্ব করার সচেতন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন।
২০২৬ সালে সোমালি জলসীমায় তুরস্কের অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধান শুরুর প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে লোহিত সাগর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল হুথি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য অ্যাডেন উপসাগরে অবস্থান চায়, আর তুরস্ক চায় নিজের সামুদ্রিক আধিপত্য ও সোমালি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষা করতে। সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতির মাধ্যমে একটি স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যু এখন আঙ্কারা ও তেল আবিবের মধ্যে উচ্চঝুঁকির ভূরাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
কেন ওয়াশিংটনের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত:
যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্রের মধ্যে এই সংঘাত কাঠামোগত—যা প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শ দ্বারা গঠিত এবং সামরিক শক্তির দ্বারা টিকে আছে। ইসরায়েল চায় হুমকি থেকে সুরক্ষা এবং একতরফাভাবে কাজ করার স্বাধীনতা। তুরস্ক চায় তার বাড়তে থাকা আঞ্চলিক প্রভাবকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ওয়াশিংটনের জন্য আসল হুমকি সরাসরি ইসরায়েল-তুরস্ক যুদ্ধ নয়, বরং ধারাবাহিক উত্তেজনা, যা মার্কিন মিত্রদের জড়িয়ে ফেলবে, ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল করবে এবং গাজা থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে জটিল করে তুলবে। ইসরায়েল-তুরস্ক উত্তেজনা নিজে থেকেই প্রশমিত হবে, এই ধারণার যুগ শেষ। নতুন বাস্তবতায় আঙ্কারা ও তেল আবিবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি মনোযোগ ও চাপ প্রয়োগ করতে হবে। -জাসিম আল-আজ্জাওয়ি এমবিসি, আবুধাবি টিভি ও আল জাজিরা ইংলিশসহ একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক ও নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের খবর কভার করেছেন, বিশ্বনেতাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং গণমাধ্যম বিষয়ক কোর্সও পড়িয়েছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button