জাতিসংঘকে শক্তিশালী করার নামে ভন্ডামি!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে ফ্রান্স ও ব্রাজিল ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যদিও বাহ্যত তারা একই পরিণতির দিকেই নিজেদের অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফ্রান্স আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে এই যুক্তিতে যে, এটি জাতিসংঘের কাঠামোকে দুর্বল করবে। অন্যদিকে ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছে—’বোর্ড অব পিস’কে যেনো কেবল গাজায় সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং এতে যেন ফিলিস্তিনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা—উভয়েই জাতিসংঘকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন। অথচ ফ্রান্সই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সেই স্থায়ী সদস্যদের একজন, যারা প্রস্তাব ২৮০৩-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে।
ফ্রান্সের উচিত ছিল ব্যাখ্যা দেওয়া কেনো তারা এমন একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিল, যা তারা জানা মতে জাতিসংঘকেই দুর্বল করবে। আর ব্রাজিলের উচিত মনে রাখা যে, তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ দাঁড়িয়ে আছে চলমান এক গণহত্যার দায়মুক্তির ওপর। বাস্তবতা হলো, ফ্রান্স ও ব্রাজিল উভয় দেশই ইসরায়েলের গণহত্যামূলক দায়মুক্তিকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে। রাজনীতি আজ এমন এক ধোঁয়াশায় পরিণত হয়েছে যে কার অবস্থান কোথায়, তা চিহ্নিত করা কঠিন। কিন্তু এটুকু অস্বীকার করা যায় না যে, ফ্রান্স ও ব্রাজিল এর কোনোটির অবস্থানই ফিলিস্তিনি জনগণ ও ফিলিস্তিনের প্রতি প্রকৃত উদ্বেগের প্রতিফলনকারী নয়। জাতিসংঘকে শক্তিশালী করা বা জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুসরণ করা, এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করে না। নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবটি কার্যত ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে। যদি জাতিসংঘ সত্যিই তার উদ্দেশ্য পূরণ করত, তবে এই প্রস্তাব কখনোই পাস হতো না। এমনকি ১৯৪৭ সালের বিভাজন পরিকল্পনাও পাস হতো না, যদি জাতিসংঘ সত্যিই তার সনদ রক্ষা করত। দশকের পর দশক ধরে জাতিসংঘকে ভুলভাবে আন্তর্জাতিক বৈধতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অথচ এর বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে এটা সহাবস্থান করে যাচ্ছে। এই পর্যায়ে এসে জাতিসংঘের শক্তি বাড়ানোর চেয়ে বেশি প্রয়োজন এটাকে ঔপনিবেশিক শিকড় থেকে মুক্ত করা।
জাতিসংঘকে শক্তিশালী করার এই কথাবার্তা সামনে আসছে কেবল এজন্য যে ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বস্তিকর স্থিতাবস্থা ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বোর্ড অব পিস না থাকলেও জাতিসংঘ আগের মতোই সাবেক উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর স্বার্থে কাজ করতো—যারা এখনো ঠিক করে দেয় কোথায় বিদেশি হস্তক্ষেপ হবে এবং কোন রাষ্ট্র ‘গণতন্ত্রের নাম’ নিয়ে ব্যর্থ হবে। আর ইসরায়েলের ক্ষেত্রে, এই একই শক্তিগুলো জাতীয় স্বার্থে এবং জাতিসংঘের ছত্রচ্ছায়ায় জাতিগত নিধন, উপনিবেশবাদ ও গণহত্যাকে রক্ষা করে যাবে।
তাহলে জাতিসংঘকে শক্তিশালী করার অর্থ কী? কোন ধরনের ক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে? সেই একই ক্ষমতা, যা গণহত্যার দিকে চোখ বন্ধ করে রাখে? যারা বোর্ড অব পিসে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, তারাও যদি জাতিসংঘের ইসরায়েলি উপনিবেশিক সম্প্রসারণ ও সহিংসতায় জড়িত থাকার বিষয়টি উপেক্ষা করে যান, তাহলে এতে কেবল দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন দেখা দেয়। কারণ উভয়ই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকে অগ্রাধিকার দেয় ও টিকিয়ে রাখে।
বোর্ড অব পিস আসার আগেও, দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের জাতিসংঘের দ্বারস্থ হতে বলা হয়েছে। আর দশকের পর দশক ধরেই জাতিসংঘ ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি উপনিবেশবাদের খাদ্যে পরিণত করেছে। বোর্ড অব পিস আসলে জাতিসংঘের সেই উত্তরাধিকারকেই এগিয়ে নিচ্ছে। যদি ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতাকারী বিশ্বনেতারা কেবল উপনিবেশিক সহিংসতা পরিচালনা ও টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘকে শক্তিশালী করতে চান, তাহলে ফিলিস্তিনিদের সামনে কোনো বাস্তব বিকল্প থাকে না।
শেষ পর্যন্ত এটাই সত্য হয়ে ওঠে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের গুরুত্ব ও টিকে থাকার স্বার্থেই শক্তিশালী হয়। আর যদি বোর্ড অব পিস একটি হুমকি হয়ে ওঠে, তাহলে সহজেই অনুমান করা যায় তাহলে ক্ষমতার এই টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি ভুগবে ফিলিস্তিনিরাই। -রামোনা ওয়াদি, একজন স্বতন্ত্র গবেষক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বই সমালোচক এবং ব্লগার। তাঁর লেখালেখি ফিলিস্তিন, চিলি এবং লাতিন আমেরিকা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়কে ঘিরে।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button