মধ্যপ্রাচ্য কেন এমন এক পরাশক্তিকে বিশ্বাস করবে, যে নিজেই নিজের নিয়ম ভাঙে?
মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রস্থের একটি সরু জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’, যা আবারও বিশ্ব ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে সামনে এনে দিয়েছে। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে এটি আর কেবল বাণিজ্যপথ নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে কৌশলগত দ্বন্দ্বের মঞ্চ।
এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সামুদ্রিক উত্তেজনা নয়। এর চেয়েও গভীর একটি সংকট এখানে কাজ করছে, সেটা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতির বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট, যা এখন বৈশ্বিক জোটগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে।
বাস্তব সংকটটি সামুদ্রিক নয়, এটি জ্ঞানের সংকট : বিশ্ব আর নিশ্চিত নয়, আমেরিকার প্রতিশ্রুতি সত্যিই কতটা নির্ভরযোগ্য।
মার্কিন নীতির দ্বৈততা:
ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নৌ অবরোধ, যেখানে পতাকা বা পণ্য নির্বিশেষে সব জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে—যা তার দীর্ঘদিনের “মুক্ত নৌ চলাচলের রক্ষক” পরিচয় থেকে একটি বড় বিচ্যুতি। একদিকে ‘ফ্রিডম অফ নেভিগেশনে’র কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে জোরপূর্বক বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই দ্বৈততা শুধু বিদ্রূপাত্মক নয়, এটি ক্ষয়িষ্ণু। এটি দেখায়, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক নিয়মগুলোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে আমেরিকা প্রস্তুত, ফলে সেই “রুলস বেইজড্ অর্ডার”-ই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ইরানের পাল্টা কৌশল:
ইরান “কঠোর নিয়ন্ত্রণ” আরোপ করে কার্যত হরমুজ প্রণালী পুনরায় বন্ধ করে দেয়, যা অনুমানযোগ্য হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে তেহরান দেখিয়েছে, কীভাবে অসম শক্তি দিয়েও শক্তিশালী নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করা যায়। জাহাজগুলো মাঝপথ থেকে ফিরে যাচ্ছে, অনেক জাহাজ অনিশ্চয়তায় থেমে আছে, এবং বীমার খরচ বেড়ে গেছে—সবই সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে।
অন্তত এক ডজন তেলবাহী জাহাজ ফিরে গেছে, এবং তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ৯৫–১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। আইএমএফ ইতিমধ্যেই এই বলে সতর্ক করেছে যে, এ অবস্থা চলতে থাকলে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিতে পারে।
আস্থার ক্ষয়:
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব অর্থনৈতিক নয়—বরং আস্থার ক্ষয়। ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা—সবকিছুই একটি বার্তা দিয়েছে। তা হচ্ছে, আমেরিকার প্রতিশ্রুতি স্থায়ী নয়, বরং রাজনৈতিক সুবিধার উপর নির্ভরশীল। বর্তমান সংকট এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।নতুন শক্তির উত্থান:
এই আস্থার শূন্যতায় নতুন শক্তিগুলো নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। চীন কৌশলীভাবে এগিয়ে এসেছে। যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে এবং জ্বালানি চুক্তি বাড়িয়েছে। একইসাথে তুর্কেমেনিস্তানের সঙ্গে পাইপলাইন চুক্তি বাড়িয়ে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে রাশিয়াও লাভবান হচ্ছে।তেলের দাম বাড়ায় দেশটির আয় বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পরিবর্তনশীল বিশ্ব:
ভারত, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা—এরা কেউই সরাসরি কোনো পক্ষ নিচ্ছে না, বরং তারা নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে। পুরনো জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন আবার নতুন প্রাসঙ্গিকতা পাচ্ছে। মানবিক দিক এই সংকট শুধু কৌশল বা রাজনীতির নয়, মানুষের জীবনও এর শিকার।
ইরানে ১৯শ’য়ের বেশি মানুষ নিহত এবং ২০ হাজার আহত হয়েছে। একটি স্কুলে হামলায় ১৭৫ জনেরও বেশি শিশু মারা গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে সন্তান খুঁজতে থাকা বাবা-মা কোনো কৌশলগত তত্ত্ব বোঝে না।
হরমুজ সংকট শুধু একটি জলপথের লড়াই নয়, এটি ২১শ শতাব্দীর ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতা শুধু সামরিক শক্তি নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও নির্ভর করে। হরমুজ প্রণালী হয়তো আবার খুলবে, তেল প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, কূটনৈতিক আলোচনা চলবে। কিন্তু বিশ্বাসের ক্ষয় সংক্রান্ত যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবে না।
শেষ পর্যন্ত, এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব হবে না তেলের দামে, বরং বিশ্ব ধীরে ধীরে নতুনভাবে নিজেদের এই অবস্থান নির্ধারণ করবে—কার ওপর ভরসা করা যায়, আর কার ওপর নয়। -কুর্নিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল, একজন গবেষক ও আন্তঃবিষয়ক লেখক, যিনি ইসলামিক কূটনীতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করেন।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



