ইউরোপে ইসরায়েলের সুরক্ষা বলয়ে ফাটল ধরেছে

স্পেন সম্প্রতি ইসরায়েলের “ইহুদিবিদ্বেষ” বয়ানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যখন দেশটির এল বুর্গো শহরে ‘বার্নিং অব জুডাস’ উৎসবে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কুশপুতুল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পোড়ানো হয়। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “এখানে যে ভয়াবহ ইহুদিবিদ্বেষী ঘৃণা দেখা গেছে, তা সাঞ্চেজ কাস্টেজন সরকারের পরিকল্পিত উসকানির সরাসরি ফল।” একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তিরস্কার জানায়।
তবে এই প্রতিক্রিয়া থেকে পরিষ্কার—সমস্যা কুশপুতুল পোড়ানো নয়, বরং গাজায় চলমান গণহত্যা এবং লেবানন ও ইরানে যুদ্ধের বিরুদ্ধে স্পেন সরকারের অবস্থান।
দশকের পর দশক ধরে ইউরোপ ইসরায়েলের জাতিগত নির্মূল ও ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করে এসেছে। কিন্তু স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সাঞ্চেজ দেখিয়েছেন যে, এই কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ থেকে সরে আসা সম্ভব। অন্তত আপাতত, ইউরোপে ইসরায়েলের সুরক্ষা বলয়ে ফাটল ধরেছে।
নেতানিয়াহুর সাত মিটার উঁচু কুশপুতুলটিতে ১৪ কেজি গানপাউডার ভরা ছিল। এটি পোড়ানো ছিল যুদ্ধ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক, এমনটাই জানিয়েছেন এল বুর্গোর মেয়র মারিয়া দোলোরেস নারভায়েজ। যুদ্ধ ও গণহত্যার বিরোধিতা কখনোই ইহুদিবিদ্বেষ হতে পারে না। বাস্তবতা হলো—ইসরায়েল হলোকাস্টের বয়ানকে ব্যবহার করে জায়নবাদী ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ ও গণহত্যাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু এখন তা আর নিঃশর্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। নেতানিয়াহু গণহত্যার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এবং তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল খুঁজছে। এটি কোনো ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য নয়, বরং বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। রাজনৈতিকভাবে, স্পেনের এই অবস্থান ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক সহিংসতার প্রতি পূর্ববর্তী ঐক্যকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এমনকি নেতানিয়াহু স্পেনকে কিরিয়াত গাতে অবস্থিত সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন সেন্টারে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখেন, যা যুদ্ধবিরতি তদারকি করে। তার অভিযোগ, স্পেন ইসরায়েল ও আইডিএফকে অপমান করেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সাআর স্পেনকে “সানচেজের নেতৃত্বে ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাতদুষ্ট” বলে অভিহিত করেন।
কিন্তু ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান কোনো আবেগপ্রসূত আসক্তি নয়, এটি ঔপনিবেশিকতা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে বাস্তব প্রতিরোধ। অন্তত এটি সামরিক দখলদারিত্ব ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরোধিতা করে। স্পেন যা করেছে, তা ইউরোপের অন্যান্য দেশের জন্য একটি উদাহরণ। এটা দেখিয়েছে যে, ইসরায়েলের ঔপনিবেশিকতা, দখলদারিত্ব ও সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিকভাবে সম্ভব।
অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও জার্মানিও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রস্তাবিত মৃত্যুদণ্ড আইনের সমালোচনা করে। জার্মান সরকারের মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস বলেন, “এই আইন সম্ভবত শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, এ নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। তাই আমরা নেসেটের এই সিদ্ধান্তে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং এটি সমর্থন করতে পারি না।”
এদিকে জার্মান চ্যান্সেলরের সমালোচনার জবাবে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ হলোকাস্টের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, জার্মানি ইহুদিদের কোথায় বসবাস করবে তা নির্ধারণ করতে পারে না। এই মন্তব্যের বিরোধিতা করেন জার্মানিতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রন প্রসর। তিনি বলেন, জার্মানি ইউরোপে “আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু”।
স্পেন একটি বিকল্প পথ দেখিয়েছে, যা শুধু ইউরোপেই নয়, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিভাজন সৃষ্টি করছে। কুশপুত্তলিকা পোড়ানোকে কেন্দ্র করে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ সাময়িকভাবে জোরালো হতে পারে, কিন্তু স্পেনের অবস্থান কোনো প্রতীকী ঘটনার ওপর নির্ভরশীল নয়। গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিরোধিতাই ইসরায়েলের রাজনৈতিক যুক্তির দুর্বলতা এবং ভিন্নমত দমন করার প্রবণতাকে উন্মোচিত করেছে। -রামোনা ওয়াদি, একজন স্বতন্ত্র গবেষক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বই সমালোচক ও ব্লগার। তাঁর লেখালেখিতে ফিলিস্তিন, চিলি এবং লাতিন আমেরিকা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button