অবরোধ কি ইরানকে নতজানু করতে পারবে?
২৮ ফেব্রুয়ারি, চলমান পারমাণবিক আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে একটি হামলা চালায়, যার লক্ষ্য ছিল সরকার পরিবর্তন। তারা কিছু কৌশলগত সাফল্য অর্জন করলেও, ১৩ হাজারেরও বেশি বেসামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক আঘাত হানে—যা প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে (১৯৯০–৯১) ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার তুলনায় প্রায় ১৮ গুণ বেশি। তবে এই বিমান হামলা তাদের মূল কৌশলগত লক্ষ্য—সরকার পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে “পাথর যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার” হুমকি দিতে শুরু করে, গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং তেলের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। কিন্তু এই লক্ষ্যগুলোও এখনো পূরণ হয়নি। উভয় পক্ষ ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং পাকিস্তানে নতুন দফা আলোচনায় বসেছে, যদিও দুই পক্ষই নিজেদের বিজয়ের দাবি ধরে রেখেছে।
কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হওয়ায় এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাকে বিশ্লেষকরা “পারস্পরিক ক্ষতিসাধক অচলাবস্থা” বলেন, যেখানে দুই পক্ষই বুঝতে পারে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি। সেই পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়কারী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এই ক্ষয়কারী যুদ্ধের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো অবরোধ আরোপ। সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে যাওয়া-আসা করা সব ধরনের নৌযান অবরোধ করবে। অবরোধ হলো যুদ্ধকালীন একটি নৌ-ব্যবস্থা, যাতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে একটি দেশের বাণিজ্য ও পণ্য প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়।এটি আন্তর্জাতিক আইনে সরাসরি যুদ্ধের সমতুল্য। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা হলো অ-সামরিক অর্থনৈতিক চাপ। তবে ইরাক, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার উদাহরণ দেখায়, নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় অবরোধের পথ তৈরি করে।
এখানে প্রশ্ন ওঠে: যদি হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়ে বিমান হামলায় সরকারে পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে অবরোধ কি তা করতে পারবে?
ট্রাম্প প্রশাসন অবরোধকে চাপ হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়, যা ফেব্রুয়ারির হামলার আগে স্বাভাবিকভাবেই খোলা ছিল। কিন্তু এই কৌশলের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সময় যত দীর্ঘ হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব ততোই গভীর হবে। যুদ্ধ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, এই পরিস্থিতি ইরানের পক্ষেই কাজ করতে পারে, কারণ বিশ্বব্যাপী ক্ষতির বোঝা ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইরানের জন্য টিকে থাকার কৌশল হয়ে ওঠবে। ইরানের পুরো উপকূলজুড়ে অবরোধ বাস্তবায়ন করা, যার্ মধ্যে চীনের মতো বড় ক্রেতার জাহাজও পড়বে, বড় ধরনের কূটনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। তবুও, অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে—যা প্রতিদিন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তবে ইতিহাস থেকে দেখা যায়, এ ধরনের কৌশল সবসময় সফল হয় না। কিউবা দশকের পর দশক অবরোধের মুখেও টিকে আছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরান, যার আঞ্চলিক প্রভাব বেশি, জ্বালানি খাতে গুরুত্ব বেশি এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বেশি, তাকে অবরোধের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করানো আরও কঠিন।
সবশেষে বলা যায়, অবরোধ সরকার পরিবর্তন তো দূরের কথা, হয়তো হরমুজ প্রণালী খুলতেও বাধ্য করতে পারবে না। বরং এটাকে একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের চেয়ে বেশি মনে হয়: একটি তাড়াহুড়া করে নেওয়া পদক্ষেপ, যেখানে সংঘাত বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, আবার বের হওয়ার পথও খোঁজা হচ্ছে। -আলি এ. ঘারেহ দাগি, আয়ারল্যান্ডের মেনুথ ইউনিভার্সিটি থেকে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যেখানে তিনি নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধ মডেল নিয়ে গবেষণায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন, বিশেষ করে ইরান ও ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



