পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে একটি ভয়ানক যুগ তৈরি করছে

সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতির উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কাল্লাসকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে সবচেয়ে দুর্বল জ্ঞানসম্পন্ন পশ্চিমা কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তিনি গত বছর সাহসিকতার সঙ্গে, বা বলা ভালো, মারাত্মক অজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে, দাবি করেছিলেন যে, রাশিয়া ও চীন এই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, এটা তার কাছে নতুন তথ্য। কিন্তু সেই মন্তব্যও ছাপিয়ে যায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ফেব্রুয়ারির ভাষণ।
তিনি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বলেন: “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পাঁচ শতাব্দী ধরে পশ্চিমা বিশ্ব বিস্তৃত হয়েছে—তাদের মিশনারি, তীর্থযাত্রী, সৈনিক ও অনুসন্ধানীরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নতুন মহাদেশে বসতি স্থাপন করেছে এবং বিশ্বজুড়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।”
কিন্তু তিনি এই উপনিবেশ বিস্তারের ফলে মানবজাতির ওপর যে ভয়াবহ মূল্য চুকাতে হয়েছে, তার কোনো উল্লেখ বা অনুশোচনা প্রকাশ করেননি।
এই ভাষণে প্রচলিত আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, যা এবার কৌশলে আটলান্টিক সম্পর্কের গুরুত্বের প্রশংসার আড়ালে লুকানো ছিলধ এবং তা ইউরোপীয় শ্রোতাদের উচ্ছ্বসিত করতালিতে ভাসিয়ে দেয়। পরবর্তীতে রুবিও বলেন, জাতিসংঘ নাকি “তেহরানের শিয়া ধর্মীয় নেতাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ”বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কখনোই তার মহাসচিবদের এমন কোনো ম্যান্ডেট দেয়নি, যাতে তারা ইরানের পারমাণবিক সমস্যা সমাধান করবেন।
তবে ‘ইন্টারন্যাশনাল এটোমিক এনার্জি’ বহু বছর ধরে কঠোর পরিদর্শন চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা যাচাই করেছে। ২০১৫ সালের চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছিলো, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তিন বছর পর সেটি বাতিল করেন, যা রুবিও জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটই ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো অবৈধ ও উসকানিহীন হামলার পটভূমি তৈরি করে। রুবিওর ভাষণের আগে মার্ক কার্নি দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন।
তিনি “নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা”র ভণ্ডামি উন্মোচন করেন এবং বলেন, এখন বিশ্ব প্রবেশ করছে এমন এক যুগে, যেখানে “শক্তিশালী যা পারে তা করে, এবং দুর্বলদের তা মেনে নিতে হয়।” তিনি দেখান যে, পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো নিজেদের সুবিধামতো আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করে—কখনো কঠোরভাবে, কখনো উপেক্ষা করে অর্থাৎ এটি এক ধরনের দ্বৈত মানদণ্ডে ভরা ব্যবস্থা, যেখানে অর্থনীতি, বাণিজ্য, শুল্ক, আর্থিক অবকাঠামো—সবই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
দাভোসে কার্নির ভাষণের মতোই, মিউনিখে রুবিওর ভাষণও দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। এই ঘটনাটি এক ধরনের রাজনৈতিক ধাঁধা, যেখানে একই শ্রোতা দুই বিপরীত বক্তব্যে সমানভাবে উচ্ছ্বসিত হয়। কার্নি ও রুবিও দুজনই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পতনের কথা বলেছেন, কিন্তু কারণ নির্ধারণে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। কার্নি দায় দিয়েছেন পশ্চিমা গণতন্ত্রের দ্বৈত মানদণ্ডকে, আর রুবিও দায় দিয়েছেন বিভিন্ন তথাকথিত “শত্রু” শক্তিকে।
১১ মার্চ, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বাহরাইনের উত্থাপিত একটি প্রস্তাব পাস করে, যেখানে ইরানের আঞ্চলিক হামলার নিন্দা করা হয়—কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকে। ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, আর চীন ও রাশিয়া বিরত থাকে।
এক মাস পর ৭ এপ্রিল, আরব দেশগুলোর একটি প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া ভেটো দেয়, যে প্রস্তাবে ইরানের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার দাবি ছিলো। এতে সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালের লিবিয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতেই চীন -রাশিয়াএই সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ তখন “নো-ফ্লাই জোন”-এর আড়ালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চালানো হয়েছিল। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পশ্চিমা বিশ্বের দ্বৈত নীতি ও বাস্তবতার বিকৃতি।
যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতা নয়, বরং শক্তির রাজনীতিই শেষ কথা বলছে এবং বিশ্ব ধীরে ধীরে এক অস্থির ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। -মার্কো কার্নেলোস, একজন সাবেক ইতালীয় কূটনীতিক। তিনি সোমালিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে তিনি তিনজন ইতালীয় প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক নীতি দলে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি ইতালীয় সরকারের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ক ও সিরিয়ার জন্য বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ইরাকে ইতালির রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button