ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিজের মিত্রদের ভিত্তিতেই আঘাত
ওয়াশিংটনে “প্রতিরোধ পুনঃস্থাপন” কথাটি যেন এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় পররাষ্ট্রনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তিটা সহজ মনে হয়: ইরানের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত করা, তার মিত্রগোষ্ঠীকে দুর্বল করা, এবং দেখানো যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আঞ্চলিক শৃঙ্খলার অপ্রতিরোধ্য রক্ষক। শুনতে সন্তোষজনক। কিন্তু বাস্তবে এটি এক গভীর কৌশল সংক্রান্ত অন্ধত্ব। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, তা কেবল একটি সমস্যা সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নয়। বরং এটি এমন এক ধ্বংসাত্মক হাতুড়ি, যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সরাসরি আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মিত্রদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির ওপর। ইউরোপের শিল্পাঞ্চল থেকে শুরু করে এশিয়ার জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতি এবং উপসাগরীয় ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোই এই সংঘাতের মূল্য পরিশোধ করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে নিজের জ্বালানি সক্ষমতার কারণে অনেকটাই নিরাপদ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করবে যে উপসাগরে শক্তি প্রদর্শন মিত্রদের আশ্বস্ত করে এবং বাজারকে স্থিতিশীল করে। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টোটা বলছে। মিত্ররা আশ্বস্ত হচ্ছে না বরং তারা অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাচ্ছে। তারা সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন দেখছে এবং তাদের মতামত ছাড়াই নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতি নীরব অসন্তোষে ভুগছে। এটি নেতৃত্ব নয়, এটি একটি একতরফা সিদ্ধান্ত, যার বিল অন্যদের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। ইউরোপের দিকে তাকান। আগের জ্বালানি সংকটের অভিঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে জ্বালানির দামের অস্থিরতার মুখে পড়েছে তারা। ইস্পাত, রাসায়নিক ও ভারী শিল্প—যেগুলো নির্ভরশীল স্থিতিশীল সরবরাহের ওপর, সেগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমাচ্ছে, কিছু সরাসরি স্থানান্তরিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য এর প্রভাব আরও সরলভাবে দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে: বাড়তি গরমের বিল, বেশি দামের খাদ্যপণ্য, আর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হারানোর আশঙ্কা।
এশিয়ার পরিস্থিতি আরও কঠিন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। দাম বাড়লে উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের টাকা চলে যায় জ্বালানি খরচ মেটাতে। সরবরাহ ব্যবস্থা আবার অস্থির হয়ে ওঠে, প্রবৃদ্ধি কমে যায়, মন্দার ঝুঁকি বাড়ে। এগুলো কেবল তত্ত্ব নয়—এগুলো এমন এক যুদ্ধের বাস্তব ফল, যা তারা নিজেরা শুরু করেনি এবং নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না।
সবচেয়ে বড় আঘাতটা পড়ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ওপর। তারা বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু এর বিনিময়ে তাদের তেল অবকাঠামো, জলশোধন কেন্দ্র ও রপ্তানি টার্মিনাল এখন সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। সরাসরি হামলা তাৎক্ষণিক ক্ষতি করে, কিন্তু আরও বড় ক্ষতি হয় বিনিয়োগকারীদের আস্থায়, যা একবার হারালে দ্রুত ফিরে আসে না।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। সেখানে সামান্য হুমকিও বীমা খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং জাহাজ চলাচল কমিয়ে দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এটি শুধু একটি সমস্যা নয়, বরং এটি তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র নিজে একজন বড় জ্বালানি উৎপাদক হওয়ায় এই সংকটে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে উচ্চমূল্য তাদের জন্য লাভজনকও হয়েছে। এই বৈষম্য একটি কঠিন প্রশ্ন তৈরি করছে: কেন মিত্ররা এমন একটি কৌশলের মূল্য দেবে, যা তারা তৈরি করেনি এবং যার লাভও সমানভাবে পায় না?
এটি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ওপর তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে। মিত্ররা যে পরামর্শ ও সমন্বয় আশা করেছিল, তার বদলে পেয়েছে একতরফা সিদ্ধান্ত ও তার ফলাফল। সময় গেলে দেশগুলো বিকল্প খুঁজে নেয়: নতুন জ্বালানি সরবরাহকারী, ডলারের বাইরে আর্থিক ব্যবস্থা, এমনকি নিরাপত্তা জোটের নতুন পথ। এই পরিবর্তন হঠাৎ ঘটে না, কিন্তু গতিপথটা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের জন্য শুরু হয়েছিল। কিন্তু এটি উল্টোভাবে দেখিয়ে দিয়েছে তার জোটগুলোর দুর্বলতা। ইউরোপ, এশিয়া এবং বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে, বন্ধু ও প্রতিপক্ষের মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
যদি এই অবনতি থামাতে হয়, তবে একতরফা সামরিক পদক্ষেপের ভ্রান্ত ধারণা ত্যাগ করতে হবে। কারণ এটি সম্পর্ককে শক্তিশালী করে না, বরং ভেতর থেকে তাকে ফাঁপা করে দেয়। আর যে কৌশল মিত্রদের দুর্বল ও অনিরাপদ করে, তা কখনোই বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথ হতে পারে না, এটি বরং বিচ্ছিন্নতার নকশা। -গ্রেগ পেন্স, আন্তর্জাতিক স্টাডিজে ইউনিভার্সিটি অব সান ফ্রান্সিসকো থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি Geopolitical Monitor, Eurasia Review এবং Modern Diplomacyসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্ল্যাটফর্মে প্রবন্ধ লিখেছেন।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



