বুশ ও ব্লেয়ারকে ইরাক যুদ্ধাপরাধে শাস্তি দেওয়া হলে, ইরান হয়তো রক্ষা পেত
তেইশ বছর আগে, আমি কাবুলে প্রেসিডেন্টের দপ্তরে হামিদ কারজাঈয়ের পাশে বসে আর জাজিরাতে সরাসরি দেখছিলাম, কীভাবে মার্কিন বোমারু বিমান সাদ্দাম হোসেনের ইরাকে বোমাবর্ষণ করছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, আফগান নেতা এই দৃশ্য ঘৃণা করছেন। তার মতে, আমেরিকার নেতৃত্বাধীন এই যুদ্ধ ছিল উন্মাদ এবং ভয়াবহ। আমরাও দুজনেই অস্বস্তিতে পড়েছিলাম এবং আমরা ঠিকই ছিলাম। ইরাক আক্রমণ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূচনা করেছিলেন। এর ফলে গৃহযুদ্ধ, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, আন্তর্জাতিক আইনের ধ্বংস এবং ট্রিলিয়ন ডলারের অপচয় ঘটে।
আজ বাগদাদের পতনের ২৩তম বার্ষিকী, আর বিশ্ব আবার একই উন্মাদনা, রক্তপাত ও বিভীষিকা দেখছে, এবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাধ্যমে। ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের এই অভিযানে ব্লেয়ারের সমর্থন স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের সমালোচনা করেছেন ওয়াশিংটনের মিত্রদের প্রতি আরও জোরালো সমর্থন না দেওয়ার জন্য। তবে ব্লেয়ার এখন সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। ইরান সংকটে ট্রাম্পের প্রধান মিত্র হলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তেইশ বছর আগে তিনিও (তখন বিরোধী নেতা) ইরাক আক্রমণের অন্যতম জোরালো সমর্থক ছিলেন। বুধবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ইরান যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার এক প্রচেষ্টার মতো করে, নেতানিয়াহু লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ চালান, যাতে ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়।
ফরাসি কূটনীতিক চার্লস মরিসটাল্লিরান্ড একসময় বলেছিলেন, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় ফিরে আসা ফরাসি রাজপরিবার “কিছুই শেখেনি, কিছুই ভুলেনি।” ঠিক একই কথা বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ক্ষেত্রেও, যদিও তাদের ক্ষেত্রে অজুহাত আরও কম।
অন্তহীন হস্তক্ষেপ:
ইরাক যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনা। কিন্তু এখন এটি বোঝা যায় যে, এটি ছিল এক অন্তহীন রক্তাক্ত পশ্চিমা বা পশ্চিমা-সমর্থিত হস্তক্ষেপের সূচনা। যা লেবানন, আফগানিস্তানের হেলমান্দ, লিবিয়া, ইয়েমেন ও গাজায় ছিলো এবং এখন ইরানে।
আমার মতে, সুদানের যুদ্ধও এই ধারার মধ্যে পড়ে, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের মিত্র ইউএই-কে দায়ী করতে অস্বীকার করছে।
সবগুলোই ভয়াবহ। কিছু ক্ষেত্রে গণহত্যার পর্যায়ে। আর এসবই গড়ে উঠেছে এক ধরনের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর, যেখানে অ-পশ্চিমা মানুষের জীবনকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই যুদ্ধগুলোকে একটি সমষ্টিগত যুদ্ধ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাদের আধিপত্য মানতে অস্বীকৃতদের বিরুদ্ধে লড়ছে।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন:
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ইরান আক্রমণ, বুশ-ব্লেয়ারের ইরাক আক্রমণের মতোই আগ্রাসী যুদ্ধ। কারণ এই হামলার অনুমোদন জাতিসংঘ দেয়নি, এবং ইরান কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না। তাই আন্তর্জাতিক আইনে এটি আগ্রাসনের শামিল।
ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল-এ এটিকে বলা হয়েছিল “সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ”, যার মধ্যে অন্যান্য সব যুদ্ধাপরাধের সম্মিলিত মন্দটা বিদ্যমান।
মিডিয়ার ভূমিকা:
ইরাক ও ইরান এই দুই ক্ষেত্রেই মূলধারার মিডিয়া যুদ্ধকে সমর্থন করেছে। যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র দ্য সানডে টাইমস্ সরাসরি বলেছিলো, এই বোমাবর্ষণ “সফল হওয়া উচিত”। অনেক পত্রিকা মার্কিন-ইসরায়েলি অপরাধকে উপেক্ষা করেছে।
রাজনীতিবিদরাও একই পথ অনুসরণ করেছেন। নাইজেল ফ্যারেইজ ট্রাম্পকে ঠিক সেইভাবে সমর্থন করছেন, যেভাবে একসময় ব্লেয়ার বুশকে সমর্থন করেছিলেন।
আজ হামিদ কারজাঈ তালেবানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাবুলে জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু ট্রাম্প, যিনি দণ্ডিত অপরাধী, বর্ণবাদী ও মিথ্যাবাদী তিনি এখনও মুক্ত।
নেতানিয়াহুও তাই। এই দুই নেতারই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার হওয়া উচিত। ব্লেয়ারেরও সেখানে থাকা উচিত ছিল।
যদি ২৩ বছর আগে বুশ ও ব্লেয়ারকে ইরাক যুদ্ধের জন্য শাস্তি দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। -পিটার ওবোর্নের নতুন বই Complicit: Britain’s Role in the Destruction of Gaza সম্প্রতি Or Books থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ২০২২ ও ২০১৭ সালে সেরা মন্তব্য/ব্লগিং বিভাগে পুরস্কার জিতেছেন এবং ২০১৬ সালে Middle East Eye-এর জন্য লেখা প্রবন্ধগুলোর জন্য Drum Online Media Awards-এ ‘ফ্রিল্যান্সার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। এছাড়াও ২০১৩ সালে তিনি British Press Awards-এ ‘কলামিস্ট অব দ্য ইয়ার’ হন। ২০১৫ সালে তিনি ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রধান রাজনৈতিক কলামিস্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার সর্বশেষ বই The Fate of Abraham: Why the West is Wrong about Islam, যা Simon & Schuster থেকে মে মাসে প্রকাশিত হয়েছে। তার আগের বইগুলোর মধ্যে রয়েছে The Triumph of the Political Class, The Rise of Political Lying, Why the West is Wrong about Nuclear Iran এবং The Assault on Truth: Boris Johnson, Donald Trump and the Emergence of a New Moral Barbarism।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



