যুক্তরাজ্যে হুমকির মুখে বাকস্বাধীনতা

আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার এখন ক্রমাগত আক্রমণের মুখে পড়ছে। একত্রিত হয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাটুকুও ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তা হচ্ছে এই সরকার এবং আগের সরকারের ধারাবাহিক নতুন আইন ও বিধিনিষেধের মাধ্যমে। এখন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে বিশাল ক্ষমতা রয়েছে। তারা চাইলেই প্রতিবাদ সীমিত করতে পারে, এমনকি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও করতে পারে।
একজন লিবারেল ডেমোক্র্যাট হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, প্রতিবাদের অধিকার একটি সুস্থ গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি। এটি সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার এবং দেশে-বিদেশে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ক্রাইম অ্যান্ড পুলিশিং বিল, যা প্রায় সংসদে পাস হয়ে গেছে, তা পুলিশকে আরও ব্যাপক ক্ষমতা দিচ্ছে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ ও নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে। এটি এমন এক ধারাবাহিক আইনের অংশ, যা নির্ধারণ করে দিচ্ছে—কখন, কোথায়, এমনকি আদৌ নাগরিকরা প্রতিবাদ করতে পারবে কি না। এতেই শেষ নয়, গত বছর লেবার সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন অপব্যবহার করে গাজাবাসীর দুর্দশা নিয়ে প্রতিবাদ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে।
২০২৫ সালের জুনে সরাসরি-অ্যাকশন গ্রুপ ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের ফলে, এর প্রতি সমর্থন দেখালেই তা সন্ত্রাসী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যার ফলে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবুও হাজার হাজার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারী এই রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। ফলস্বরূপ, গড়ে ৫৭ বছর বয়সী প্রায় ২,৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পুরোহিত, সরকারি কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য এবং পেনশনভোগী, যারা শুধু একটি প্ল্যাকার্ড ধরেছিলেন বা সমর্থনের প্রতীকী পোশাক পরেছিলেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭শ’ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সরকার সংসদীয় কৌশল ব্যবহার করে এই নিষিদ্ধকরণ আদেশ পাশ করায়। পরে উচ্চ আদালত রায় দেয়, এটি হুমকির তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অবৈধ। ফলে অভিযুক্তদের বিচার আপাতত স্থগিত রয়েছে।
সরকার আপিল করেছে, কিন্তু হাজার হাজার সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বোকামি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই সতর্ক করেছিল, এ ধরনের নিষিদ্ধকরণের যৌক্তিকতা নেই, কারণ বিদ্যমান আইনের মাধ্যমেই এসব অপরাধ মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল।
শুধুমাত্র সম্পত্তির ক্ষতির ভিত্তিতে কোনো সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করার এটি প্রথম ঘটনা, যা ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির গুরুত্বকে হালকা করে দেয় এবং ভবিষ্যতে যেকোনো অস্বস্তিকর রাজনৈতিক প্রতিবাদকেও সন্ত্রাসবাদ হিসেবে দেখানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভী সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করা ভয়াবহভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি বাকস্বাধীনতার ওপর ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলতে পারে। একবার এই নজির তৈরি হলে, তা আর একটি আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই প্রবণতা নতুন নয়, এর শিকড় আগের কনজারভেটিভ সরকারের আরোপিত কঠোর প্রতিবাদবিরোধী নীতিতে নিহিত।
ক্রাইম অ্যান্ড পুলিশিং বিলে এমন কিছু অস্পষ্ট বিধান রয়েছে, যেমন ধর্মীয় স্থানের আশেপাশে প্রতিবাদের সীমাবদ্ধতা এবং মুখ ঢেকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো “কিউমিলেটিভ ইমপ্যাক্ট” ধারা, যার মাধ্যমে একই স্থানে বারবার প্রতিবাদ হলে তা নিষিদ্ধ করা যাবে। ইতিহাস বলে, নারী ভোটাধিকার আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন বা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, সব বড় পরিবর্তনই এসেছে ধারাবাহিক প্রতিবাদের মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকতাকে বন্ধ করা মানে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই আঘাত করা।
আজ যুক্তরাজ্যে প্রতিবাদ আর একটি নিশ্চিত অধিকার নয়, বরং তা ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এখন আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন, আমরা কি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে রক্ষা করব, নাকি সেই প্রজন্ম হিসেবে পরিচিত হবো যারা নীরবে এই অধিকার হারিয়ে যেতে দিয়েছে? -লর্ড স্ট্রাসবার্গার, হাউস অব লর্ডসের একজন লিবারেল ডেমোক্র্যাট সদস্য। তিনি নাগরিক স্বাধীনতা ও প্রযুক্তি বিষয়ক ব্যাপারে গভীর আগ্রহী এবং Big Brother Watch-এর চেয়ারম্যান। এর আগে তিনি একজন উদ্যোক্তা ছিলেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button