মিডিয়ায় ট্রাম্পের ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ

পুরোনো ধরণের ফ্যাসিবাদ সংবাদমাধ্যমকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করত, নতুন সংস্করণটি চুক্তির মাধ্যমে ডেটা নিয়ন্ত্রণ করে। যখন রাষ্ট্র এবং করপোরেশন একসঙ্গে ঠিক করে দেয় কোন শব্দ এবং কোন ছবি ‘বিপজ্জনক’, তখন সত্য শুধু দমন করা হয় না, সেটিকে এমনভাবে আড়াল করা হয় যাতে তা খুঁজেই পাওয়া না যায়। ৩ এপ্রিল ২০২৬ সালে জাগরোস পর্বতমালায় তথাকথিত ‘অলৌকিক’ উদ্ধার অভিযানের আমেরিকান সরকারি বর্ণনা, এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
আমেরিকার ডিজিটাল লৌহপর্দা থাকা সত্ত্বেও সত্য বারবার সামনে আসছে। উদ্ধার হওয়া পাইলটকে ঘিরে যে গল্প প্রচার করা হয়েছিল, তা ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন এখন গল্প রক্ষা করার বদলে তার ধ্বংসস্তূপ সামলাতে ব্যস্ত। প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় টেলিগ্রামে। ঝাপসা মোবাইল ছবি, ধ্বংসাবশেষ, খালি ইজেকশন সিট, আর দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের পাহাড়ে নিচু দিয়ে উড়তে থাকা হেলিকপ্টারের ভিডিও। কোনো সরকারি বিবৃতি আসার আগেই বিশ্ব বুঝে যায়, কিছু একটা ভয়াবহ ঘটেছে।
গত দুই সপ্তাহে আমরা যা দেখেছি, তা ছিল বর্ণনা নিয়ন্ত্রণের এক ‘মাস্টারক্লাস’। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিতে চেয়েছে যাতে পুরো যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে থাকে পূর্ণ তথ্য অন্ধকার। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি, যা সাংবাদিক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের জন্য বহুদিন ধরে স্বাধীন যাচাইয়ের মাধ্যম ছিল, তা সরকারি অনুরোধে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সাংবাদিকদের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হয়েছে, তথ্য ফাঁসকারীদের দেশদ্রোহী হিসেবে খোঁজা হচ্ছে, এমনকি পেন্টাগন কনট্রাকটর ও মিডিয়াগুলোকে কোন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না সেটিও বলে দিয়েছে।
ফাঁস হওয়া নির্দেশনায় দেখা গেছে, পেন্টাগন ধ্বংসের ভাষাও নির্ধারণ করছে। ‘ধ্বংস’, ‘নিষ্পত্তি’, বা ‘বিপর্যয়কর ব্যর্থতা’, এই শব্দগুলো ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর বদলে অনুমোদিত শব্দ—‘ক্ষতিগ্রস্ত’, ‘অচল’, বা ‘সাময়িকভাবে অকার্যকর’। এটি শুধু প্রচারণা নয়। এটি ভাষাকে পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা, যা স্বৈরাচারী তথ্য নিয়ন্ত্রণের একটি লক্ষণ। আপনি যদি ‘ধ্বংস’ শব্দটি বলতে না পারেন, তাহলে আপনি বিপর্যয়ের প্রকৃত মাত্রা বুঝতেই পারবেন না। তবুও, সব বাধা সত্ত্বেও সত্য ফাঁস হচ্ছে। এখন আসুন দুইটি বর্ণনা পাশাপাশি দেখি।
সরকারি গল্প: হলিউডি স্ক্রিপ্ট, ঐশ্বরিক আশীর্বাদ
মার্কিন প্রশাসনের মতে, একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়, দুইজন পাইলট বের হয়ে আসেন, একজন দ্রুত উদ্ধার হন, অন্যজন পাহাড়ে লুকিয়ে থাকেন। এরপর বিশেষ বাহিনী গোপনে প্রবেশ করে, ৭,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে উঠে তাকে উদ্ধার করে। ট্রাম্প একে ‘ইস্টারের অলৌকিক ঘটনা’ বলেন, অন্য কর্মকর্তারা এটিকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা উদ্ধার অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন।
বাস্তবতার ইঙ্গিত: যা আমরা জানি
সমস্যা হলো, এই গল্পটি তখনই টিকে থাকে যদি প্রশ্ন না করা হয়। প্রথমত: স্যাটেলাইট ব্ল্যাকআউট আরোপ করা হয়েছিল কারণ ছবিগুলো অস্বস্তিকর সত্য দেখাচ্ছিল। দ্বিতীয়ত: ‘নায়কোচিত উদ্ধার’ গল্পটি মৌলিক প্রশ্নের মুখে টেকে না। তৃতীয়ত: ইরান সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণনা দিচ্ছে, যা আংশিকভাবে যাচাইযোগ্য। আমরা স্বাধীনভাবে এসব যাচাই করতে পারছি না, কারণ তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। কিন্তু এই ভিন্ন বর্ণনার প্রচারই প্রমাণ করে যে, সত্য থামানো যাচ্ছে না।
ধর্মীয় ভাষার ব্যবহার:
এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ধর্মীয় ভাষার ব্যবহার। যুদ্ধকে ‘পবিত্র’ আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ধর্মীয় প্রতীকের সাথে মিশে যায়, তখন বাস্তবতা ও বিশ্বাসের সীমারেখা মুছে যায়।
ডিজিটাল যুদ্ধের কুয়াশা:
আগেও সরকার যুদ্ধের সময় তথ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে, কিন্তু এখনকার নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন। এটি সরাসরি সেন্সরশিপ নয়, বরং বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ। একটি ফোনকল, একটি চুক্তি, এতেই কাজ হয়ে যায়। ছবি নেই, ভাষা নিয়ন্ত্রিত, সাংবাদিকদের ভয় দেখানো, এটি আধুনিক ডিজিটাল যুগের এক নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
তবুও যা থামানো যায় না
সবকিছুর পরও ভিডিও বের হচ্ছে, বিকল্প বর্ণনা ছড়াচ্ছে। প্রশাসন ছবি নিষিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু কৌতূহল থামাতে পারে না। শব্দ নিষিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা মুছে ফেলতে পারে না।
সম্ভবত ভবিষ্যতে আমরা জানতে পারবো ৩ এপ্রিল ইরানের পাহাড়ে যা ঘটেছিল। তা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সেটি গোপন রাখতে এইসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এটিও বোঝা যাবে কেন ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে আলোচনায় রাজি হয়েছেন। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, ডিজিটাল যুগে সত্যকে দমন করার পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু সত্য নিজে হারিয়ে যায় না। -সাহার হুনেইদি একজন ইতিহাসবিদ এবং লেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে A Broken Trust: Herbert Samuel, Zionism and the Palestinians 1920–1925 (২০০১) এবং The Hidden History of the Balfour Declaration (২০১৯)।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button