ইসলামোফ্যাসিজম: একটি শব্দ যা যুদ্ধাপরাধকে আড়াল করে

সতর্কভাবে তৈরি করা “ইসলামোফ্যাসিজম” শব্দটি এখন আবার আলোচনায় এসেছে। আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পশ্চিমা মূলধারার মিডিয়া ও ব্লগে—যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইসরায়েল ও ইউরোপ জুড়ে—২০২৫ সালে এর ব্যবহার আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেড়েছে।
এই শব্দটি জেরুজালেম পোস্ট, নব্য-রক্ষণশীল সাময়িকী এবং পশ্চিমা ট্যাবলয়েডগুলোতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধকে একটি প্রয়োজনীয় ও মহৎ অভিযান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
শব্দটি নতুন নয়। কিন্তু এর পুনরুজ্জীবন এবং এখন এটি যে উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। এই শব্দটির উৎপত্তি ৯/১১-পরবর্তী নব্য-রক্ষণশীল চিন্তাধারার উত্তপ্ত পরিবেশে। এর অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন লেখক নরম্যান পোডহোরেটজ, যিনি গত বছরের শেষ দিকে মারা যান। তিনি মারা যান তার বহুদিনের ইরানে বোমা হামলার ধারণা বাস্তবায়নের কয়েক মাস আগে।
২০০৭ সালে কমেন্টারি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তার প্রবন্ধ “দ্য কেস ফর বম্বিং ইরান”-এ তিনি ইরানকে একটি ইতিহাস, জনসংখ্যা বা বহুমাত্রিক সমাজ হিসেবে দেখেননি। তার কাছে ইরান ছিল একটি বৈশ্বিক যুদ্ধের একটি ফ্রন্ট, যার একমাত্র সমাধান ছিল বিমান হামলা।
সাম্প্রতিক সংখ্যায় তার ছেলে জন পোডহোরেটজ একই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে নাৎসি জার্মানি থেকে ইরান পর্যন্ত একটি সরল রেখা টানেন, এবং আক্ষেপ করেন যে যুক্তরাষ্ট্র যদি দুই দশক আগে বোমা ফেলত, তাহলে এসব এড়ানো যেত। এর মধ্যে “ইসলামোফ্যাসিজম” শব্দটি প্রথমে সীমিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল—আইএস, আত্মঘাতী বোমারু বা যারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করে তাদের ক্ষেত্রে। কিন্তু একবার যদি একটি বিশ্বাসের গোষ্ঠীকে নাগরিক সুরক্ষার বাইরে রাখা হয়, তখন কে সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হবে, তা পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে যায়। বাস্তবে, এই সংজ্ঞা
ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে আইএস থেকে হামাস, হিজবুল্লাহ, ইরানি রাষ্ট্র, প্যালেস্টাইনি নাগরিক সমাজ, এমনকি যারা এদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তাদের পর্যন্ত। এ কারণেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলতে পেরেছেন, “হামাস হলো আইএসআইএস এবং আইএসআইএস হলো হামাস।”
রাষ্ট্রনীতি নয়, যুদ্ধনীতি:
নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে ইসলাম ও ফ্যাসিজমকে একত্রে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি দাবি করেন যে, জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি হিটলারকে হলোকাস্টের ধারণা দিয়েছিলেন। এই দাবি শুধু ভুল নয়, বরং এতটাই ভিত্তিহীন ছিলো যে বহু গবেষক, এমনকি ইসরায়েলি গবেষকরাও এর সমালোচনা করেন।
এটি রাষ্ট্রনীতি নয়, বরং যুদ্ধনীতি— যার উদ্দেশ্য প্যালেস্টাইনি জাতীয়তাবাদকে হলোকাস্টের সাথে যুক্ত করে ইসরায়েলের পদক্ষেপকে “আত্মরক্ষা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এই ভাষাগত কাঠামো বহু বছর ধরে গড়ে তোলা হয়েছে।
এখন এই কাঠামো সরাসরি ইরানের দিকে লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত আগস্টে জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত একটি লেখায় পশ্চিমা দেশগুলোর প্যালেস্টাইনপন্থী আন্দোলনকে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সাথে তুলনা করা হয়। এটি বিশ্লেষণের ছদ্মবেশে প্রচারণা। এটি সামরিক হামলাকে বৈধতা দেয়, ভিন্নমতকে অবৈধ করে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করে দেয়, কারণ আগে থেকেই তাদের “ফ্যাসিস্ট” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্য ফোরামের মতো সংগঠনগুলো পাকিস্তান ও তুরস্ককে প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলছে কেনো ইসলামোফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কেউ লড়াই করছে না। এটি প্রকৃত প্রশ্ন নয়, বরং একটি ফ্রেম চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা, যেখানে মুসলিম রাজনৈতিক আন্দোলনকে স্বভাবতই ফ্যাসিস্ট হিসেবে দেখানো হয় এবং এর বিরোধিতা করা মানেই অ্যান্টি-ফ্যাসিজমের অংশ।
এই প্রবণতা এখন ব্রিটিশ মূলধারাতেও দেখা যাচ্ছে। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে মুসলমানদের প্রতিবাদকে “ইসলামোফ্যাসিস্ট” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একইভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে “বাস্তব অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট নায়ক” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
একটি সম্প্রচারে গ্রিন পার্টিকেও ইসলামোফ্যাসিজমের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে মুসলিম রাজনীতি, প্যালেস্টাইন সমর্থন এবং একটি রাজনৈতিক দলকে একসাথে একটি হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
একটি অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি:
বিশ্লেষকরা দেখিয়েছেন, এই শব্দটি মূলত ভয়ভিত্তিক রাজনীতির হাতিয়ার। এটি একটি জনগোষ্ঠীকে আলোচনার বিষয় না বানিয়ে আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে।
অনেক গবেষকই এই শব্দটির সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ফ্যাসিজম একটি পশ্চিমা ধারণা, মুসলিম রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা বিশ্লেষণ নয় বরং প্রক্ষেপণ। কেউ কেউ এটিকে একটি অপমানজনক শব্দ হিসেবে দেখেছেন, যা ইসলামকে মানবতার বাইরে ঠেলে দেয়।
কোনো স্বীকৃত ইতিহাসবিদ এই শব্দকে সমর্থন করেননি। বরং বলা হয়েছে, এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয় নিজেদের স্বৈরাচারী কর্মকান্ড ঢাকতে।
তারপরও এর ব্যবহার বাড়ছে। কারণ এটি বিশ্লেষণের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, মুসলিম রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলা এবং যেকোনো প্রতিরোধকে সভ্যতার বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দেখানো।
২০২৫ সালে এই শব্দের ব্যবহার বিশেষ করে তিনটি ক্ষেত্রে বেড়েছে: ইরানের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রম এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিম রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।
এই শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে সহজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। ইরানে হিজাব পোড়ানোকে সরকারবিরোধী প্রমাণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখিয়ে সরকারকে “ইসলামোফ্যাসিস্ট” বলা হচ্ছে। এই বৃদ্ধির সময়কাল ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে কার্যক্রম বৃদ্ধির সাথে মিলে যায়।
এই শব্দটি একটী রাজনৈতিক কাজ করছে, এটি হামলাকে বৈধতা দেয়, ভিন্নমতকে অস্বীকার করে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করে। যদি ইরান, লেবানন বা গাজায় যা হচ্ছে তার জন্য কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, “ইসলামোফ্যাসিজম” সেই অনুমোদন সরবরাহ করে।
দশক খানেক আগে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে বৈধতা দিতে। এখন আবার এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, কারণ সামনে যা আসছে, তার জন্য এটি প্রয়োজন হবে। -ফয়সাল হানিফ, সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং-এর একজন মিডিয়া বিশ্লেষক এবং তিনি পূর্বে দ্য টাইমস ও বিবিসিতে সংবাদ প্রতিবেদক ও গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর সর্বশেষ প্রতিবেদনটি ব্রিটিশ গণমাধ্যম কীভাবে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রতিবেদন করে তা বিশ্লেষণ করেছে।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button