ইরান যুদ্ধের পর কেনো তুরস্ক হবে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি
ইরান যদি দুর্বল অথবা আরও খারাপভাবে, একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয় তবে —মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীল থাকবে না, বরং আরও বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হবে। এমন পরিস্থিতি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে, ইসরায়েলের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে, ইরাক ও সিরিয়ায় অস্থিরতা বাড়াবে এবং নতুন করে সীমান্ত-পারাপার সংঘাত ও শরণার্থী সংকট সৃষ্টি করবে।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে তুরস্ক, এবং নতুন পরিস্থিতি সামাল দিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও তারই থাকবে। তুরস্ক ও ইরান শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বড় দেশই নয়, তারা অঞ্চলের প্রাচীনতম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দুটি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও রাজনৈতিক পথ একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
১৭শ শতাব্দী থেকে তাদের সীমান্ত অপরিবর্তিত রয়েছে, যা এই অঞ্চলে বিরল ঘটনা। ২০শ শতাব্দীর শুরুতে দুই দেশই বিদেশি দখলদারিত্বের শিকার হয়েছিল। একই সময়ে তারা সাংবিধানিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যায়, যদিও কোনোটিই দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনতে পারেনি।
দুই দেশেই ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত একক নেতা বা দলের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। তারা পশ্চিমায়ন ও ধর্মনিরপেক্ষতার পথে এগোয়, যেখানে ইসলামকে জনজীবন থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করা হয়। শতাব্দীর মাঝামাঝি উভয় দেশে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এলেও, ইরানে মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে মার্কিন সমর্থিত অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তুরস্কে আদনান মেনদেরেস সামরিক অভ্যুত্থানে অপসারিত হয়ে মৃত্যুদণ্ড দন্ডিত হন।
ভিন্ন পথ, ভিন্ন বাস্তবতায় ইরানে রেজা শাহ পশ্চিমাপন্থী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেন, আর তুরস্কে দীর্ঘদিন সামরিক প্রভাব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৭০-এর দশকে ইরানে বিপ্লব ঘটে, আর তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। ১৯৮০ সালে ইরাক ইরানের ওপর আক্রমণ করলে দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হয়। অন্যদিকে তুরস্কে কুর্দি গোষ্ঠীর কুর্দিস্থান ওয়ার্কার্স পার্টির উত্থান ঘটে, যা দীর্ঘ সংঘাতের জন্ম দেয়।
২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তুরস্কে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির উত্থান ঘটে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতির সূচনা করে।
অন্যদিকে, ইরাকের ক্ষমতার শূন্যতা ইরানকে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ দেয়।আরব বসন্তের সময় তুরস্ক পরিবর্তনের পক্ষে ছিল, কিন্তু ইরান বিদ্যমান শাসন বজায় রাখতে চেয়েছিল—বিশেষ করে সিরিয়ায়। সিরিয়া হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। তুরস্ক বিরোধীদের সমর্থন দেয়, আর ইরান বাশার আর আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখে।
ইরান দুর্বল হলে কী হবে?
ইরান দুর্বল হয়ে পড়লে বা ভেঙে গেলে ২০০৩ সালের ইরাকের মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। ইসরায়েল নতুন করে ভূখণ্ড দখল করতে পারে, পশ্চিম তীর ও গাজায় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে পারে এবং সিরিয়া ও লেবাননে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারে।
তুরস্কের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, নিরাপত্তা ঝুঁকি: ইরাক ও সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা সরাসরি তুরস্ককে প্রভাবিত করবে, শরণার্থী সংকট: নতুন শরণার্থী ঢল তৈরি হতে পারে, সন্ত্রাসবাদ: ক্ষমতার শূন্যতায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় হতে পারে,যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে এবং গালফ দেশগুলোর সঙ্গে মতবিরোধ: আঞ্চলিক কৌশলে পার্থক্য বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে তুরস্ক হবে সবচেয়ে সক্ষম আঞ্চলিক শক্তি, বিশেষভাবে সামরিকভাবে শক্তিশালী এবং কূটনৈতিকভাবে সক্রিয়। তবে তার লক্ষ্য হবে আধিপত্য নয়, বরং ভারসাম্য তৈরি করা: ভূখণ্ড দখল ঠেকানো,প্রক্সি যুদ্ধ কমানো এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
গত দুই দশকের শিক্ষা থেকে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, একটি বড় আঞ্চলিক শক্তিকে দুর্বল করলে স্থিতিশীলতা আসে না বরং প্রতিযোগিতা আরও বাড়ে। ইরান যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থির হবে। এই নতুন বাস্তবতায় তুরস্ক শুধু নীরব দর্শক থাকবে না, বরং একটি নির্ধারক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীল হবে নাকি আরও ভেঙে পড়বে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে তুরস্ক কীভাবে তার প্রভাব ব্যবহার করে তার ওপর। -তাহা ওঝান, তুরস্কভিত্তিক একজন শিক্ষাবিদ ও লেখক। তিনি রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে আঙ্কারা ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০১৯–২০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং একাডেমিক হিসেবে ছিলেন, ২০১৫–১৮ সালে তুর্কি পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৪–১৬ সালে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সিনিয়র উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তাঁর সর্বশেষ বই Turkey and the Crisis of Sykes-Picot Order (২০১৫)।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



