যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ ইরানের হাতে সব তাস তুলে দিলো
দিন যতো যাচ্ছে, ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া পোস্টগুলো ততই অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভেতরে যেন আতঙ্ক বাড়ছে। ইরানের ওপর তার উসকানিহীন হামলা এখন তার জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।
যে ব্যক্তি ইরানিদের “তোমাদের সরকার তোমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে” বলে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনিই এখন সেই মানুষদের “প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া”র হুমকি দিচ্ছেন। যুদ্ধ আরও বাড়লে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
যে প্রেসিডেন্ট হরমুজ প্রণালী দখলে নিতে হাজার হাজার মেরিন মোতায়েন করেছিলেন, এখন তাকেই অসহায়ভাবে দেখতে হচ্ছে, ইরান ঠিক করছে কোন ট্যাঙ্কার চলবে আর কোনটি আক্রমণের শিকার হবে, আর মার্কিন নৌবহর দূরে নিরাপদে অবস্থান করছে। বর্তমানে হরমুজ দিয়ে চলাচলের টোল প্রায় ২০ লাখ ডলার, যা চীনা ইউয়ানে পরিশোধ করা হচ্ছে। চার সপ্তাহ আগে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির দাবি করেছিলেন, তারা ইরানের ৮০% বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস করেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, মার্কিন যুদ্ধবিমান নিয়মিত আঘাত পাচ্ছে। বরং যুদ্ধের ষষ্ঠ সপ্তাহে ইরানের প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ১৩ হাজার বিমান হামলার পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো টিকে আছে।
অবিশ্বাস্য স্থিতিশীলতা:
ইরান প্রত্যাশিতভাবে ভেঙে পড়েনি। ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো দ্রুত পতন হয়নি। সেসব দেশে নেতাদের পতনের সঙ্গে সিস্টেমও ধসে পড়ে। কিন্তু ইরানের কাঠামো ব্যক্তি নির্ভর নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী। মোসাদ ও সিআই’র অনুপ্রবেশ ও হত্যাকাণ্ডের পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা অটুট রয়েছে। এমনকি ইরানের ভেতরে কোনো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিও উঠে আসেনি। বরং ট্রাম্পের হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জনগণকে একত্র করেছে। আরব বিশ্বে নতুন বাস্তবতা ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান আরব দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করছে। যারা আগে ইরানের বিরোধী ছিল, তারাও এখন ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কে বেশি সমর্থন দেবে।
সিরিয়ায় বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে হাজারো মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান দিয়েছে। জর্ডানেও জনগণের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী ক্ষোভ বাড়ছে, যদিও সরকার দমন করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন ইসরায়েলকে অনেক আরব দেশই আবার প্রধান শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালী: ইরানের নতুন অস্ত্র:
যুদ্ধের আগে ধারণা ছিল, হরমুজ প্রণালী ইরানের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও ততটাই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এটি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
হরমুজ বন্ধ করে দিয়ে ইরান বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপে ডিজেলের দাম ৩০% বেড়েছে।
এটি এমন এক “অস্ত্র” যা পারমাণবিক কর্মসূচির থেকেও বেশি কার্যকর।
যুদ্ধের পর নতুন বাস্তবতা:
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন হরমুজকে শুধু যুদ্ধের হাতিয়ার নয়, ভবিষ্যতের স্থায়ী কৌশল হিসেবে দেখছে। এর মাধ্যমে তারা নিয়মিত আয় করতে পারবে—যা তাদের তেল আয়ের থেকেও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো বিশাল ক্ষতির মুখে পড়েছে—তাদের শিল্প, পর্যটন, বাণিজ্য সব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের কৌশল ব্যর্থ?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর “গ্রেটার ইসরায়েল” পরিকল্পনা ইরানে এসে থেমে গেছে। এই পরিকল্পনা আরব বিশ্বের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধ বরং আরব ও ইরানকে একত্র করেছে, ধনী-গরিব, সুন্নি-শিয়া সব বিভাজন পেরিয়ে। এই যুদ্ধ যদি কিছু প্রমাণ করে, তা হলো, মধ্যপ্রাচ্য আগের মতো নেই। পরিস্থিতি এমন এক দিকে যাচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার যেভাবে বলেছিলেন, এই সংঘাতের পর সবকিছু বদলে যাবে। আসলেই তা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। -ডেভিড হার্স্ট, Middle East Eye-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক-প্রধান। তিনি মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক, ভাষ্যকার এবং বক্তা, বিশেষ করে সৌদি আরব নিয়ে তার বিশ্লেষণ সুপরিচিত। তিনি আগে The Guardian-এ ফরেন লিডার রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন এবং রাশিয়া, ইউরোপ ও বেলফাস্ট থেকে সংবাদদাতা ছিলেন। এর আগে তিনি The Scotsman-এ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



