ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি ও এক নতুন বর্বরতার যুগ উন্মোচন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান ইরানকে “যেখানে তার স্থান, সেই প্রস্তর যুগে” ফিরিয়ে দিতে। একটি বাক্য যা শক্তি প্রদর্শন এবং ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। কিন্তু এর পরিবর্তে এটি আরও গভীর কিছু প্রকাশ করে: শক্তি নয়, বরং ইতিহাস, সভ্যতা এবং যে অঞ্চলকে তিনি ধ্বংস করতে হুমকি দিচ্ছেন, তার সম্পর্কে এক গভীর অজ্ঞতা করে এটা।
এই স্থূল রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, যিনি চুক্তি এবং সম্পত্তির সরল যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তিনিখুব কমই বোঝেন যে, ইরান যা ঐতিহাসিকভাবে পারস্য, আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের অর্থপূর্ণ অস্তিত্বের বহু আগে থেকেই সংগঠিত সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করছিল এবং তা করছিলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের বহু শতাব্দী আগে থেকেই।
এটি কোনো অলংকারিক বক্তব্য নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সাইরাস দ্য গ্রেটের অধীনে পারস্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা মধ্য এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি শাসনব্যবস্থা, করব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং যোগাযোগের এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলে যা পরবর্তীতে রোমসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যের মডেল হিসেবে কাজ করে। সাইরাস সিলিন্ডার ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সম্প্রদায়ের সুরক্ষার নীতিমালা প্রকাশ করেছিল, যা আজকের ধ্বংসের ভাষার সম্পূর্ণ বিপরীত।
সভ্যতার ইঞ্জিনসমূহ:
প্রাচীনত্বের সাথে পারস্য হারিয়ে যায়নি। এটি টিকে ছিল, আক্রমণ সহ্য করেছে, পরিবর্তন গ্রহণ করেছে এবং নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে অসাধারণ ধারাবাহিকতায়।
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অভিযান এটি মুছে দিতে পারেনি। চেঙ্গিস খানের ধ্বংসযজ্ঞও পারেনি। যা ভেঙে পড়েছিল তা পুনর্গঠিত হয়েছে। যা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তা পুনরায় সংযুক্ত হয়েছে ৭৫০–১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে। আব্বাসীয় খিলাফতের অধীনে এটি নতুন রূপ পেয়েছিল, এক উজ্জ্বল ইসলামী সভ্যতার অংশ হিসেবে। বাগদাদ ছিল রাজধানী, কিন্তু তার প্রাণশক্তি প্রবাহিত হচ্ছিল পারস্যের বহু নগরীতে, যা মানব উন্নয়নের অগ্রভাগে ছিল। নিশাপুর, রেই, মার্ভ, বালখ, তুস এবং ইসফাহান—এগুলো কোনো প্রান্তিক শহর ছিল না। এগুলো ছিল সভ্যতার ইঞ্জিন। এগুলো এমন সব পণ্ডিত, চিকিৎসক, কবি এবং গণিতবিদ সৃষ্টি করেছে যারা বিভিন্ন বিদ্যাশাখাকে গঠন করেছে। নিশাপুরের ওমর খৈয়াম, রেইয়ের আবু বকর আল-রাজি, এবং তুসের ফেরদৌসি এই বিশাল বৌদ্ধিক জগতের কেবল একটি অংশ। এই শহরগুলো শুধু বাণিজ্যপথ দিয়ে নয়, বরং ধারণা, পাণ্ডুলিপি এবং পণ্ডিতদের আদান-প্রদানের মাধ্যমে যুক্ত ছিল, যা জ্ঞানের একটি গতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছিল। এই বিশ্বের কেন্দ্রে ছিল বায়তুল হিকমা (জ্ঞানগৃহ), যেখানে গ্রিক, পারস্য এবং ভারতীয় জ্ঞান অনুবাদ, অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ এবং সম্প্রসারণ করা হতো, যা পরে ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি গঠনে সাহায্য করে। এখানেই মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি বীজগণিতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন এবং আধুনিক বিশ্বের জন্য অ্যালগরিদমের ধারণা প্রদান করেন। ইবনে সিনা এমন চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে। আল-ফারাবি এবং আল-গাজ্জালি অ্যারিস্টটলের চিন্তাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। যখন বাগদাদ, নিশাপুর এবং মার্ভ উন্নত জলব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জটিল নগরজীবন বজায় রাখছিল, তখন মধ্যযুগীয় ইউরোপের বড় অংশ ছিল তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ। এটি কোনো পক্ষপাতমূলক বক্তব্য নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য।
একটি পদ্ধতিগত ধ্বংস:
এই “প্রস্তর যুগ” কেবল রূপক নয়, এটি একটি পদ্ধতি। এটি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হচ্ছে। গবেষণা কেন্দ্র ধ্বংস করা হচ্ছে। তেহরানের শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত ল্যাবরেটরি আক্রমণের শিকার হয়েছে। লক্ষ্য কেবল বর্তমান ধ্বংস করা নয়, অতীত মুছে ফেলা। ইতিহাসকে ধ্বংস করে পুনর্লিখন করা। দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে।
চিকিৎসা অবকাঠামোও রক্ষা পায়নি। পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরান আক্রান্ত হয়েছে। এগুলো দুর্ঘটনা নয়। এগুলো লক্ষ্যবস্তু। এটি একটি কৌশল, একটি সমাজকে পিছিয়ে নেওয়ার জন্য।
একটি দানবীয় ভাষ্য:
মানুষকে অমানবিক করা হলে, তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো কিছুই ন্যায্য হয়ে ওঠে। ইরাক যুদ্ধের সময় আরবদের বিরুদ্ধে, গাজা যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে, আজ ইরানিদের বিরুদ্ধে একই ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। যুদ্ধ শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, নিজের বিরুদ্ধেও শত্রু তৈরি করে।
একটি নিয়ন্ত্রিত ধ্বংসের দৃষ্টি:
এই ধ্বংস কেবল ইরানে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস মানে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষতি। ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এটি হাজার বছর ধরে সেখানে নেই। বরং যা ঘটছে তা হলো, আমেরিকাকেই এক নতুন প্রস্তর যুগের দিকে ঠেলে দেওয়া। একটি বর্বরতার যুগে। একটি প্রস্তর যুগের যুক্তিতে। -সৌমায়া ঘান্নুশি, একজন ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তাঁর সাংবাদিকতামূলক লেখা The Guardian, The Independent, Corriere della Sera, Aljazeera.net এবং Al Quds-এ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর নির্বাচিত লেখাগুলোর একটি অংশ পাওয়া যাবে: soumayaghannoushi.com এবং তিনি টুইট করেন @SMGhannoushi।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



