মানব কল্যাণে করজে হাসানা

সাইফুল ইসলাম আল-আযহারি: ‘করজে হাসানা’ মানব জীবন ব্যবস্থার এক বিশেষ অর্থনৈতিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থা। করজে হাসানার অর্থ হচ্ছে ঋণ বা করজ দেয়া যা সময়মতো পরিশোধ করা হবে, কিন্তু দাতা কোনো অতিরিক্ত অর্থ বেনিফিট নিতে পারবেন না। এর উদ্দেশ্য হল, সমাজের ঋণগ্রস্ত মানুষের একটি প্রয়োজন পূর্ণ করা। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের নানা সময়ে নানা কারণে সাময়িক ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সবসময় ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ থাকে না। কিন্তু সম্ভাবনা থাকে যে, পরে করজ পরিশোধ করতে পারবে।

এজন্য আল্লাহতায়ালা করজে হাসানা ইসলামী নীতির বিধান রেখেছেন যেন মানুষ সাময়িকভাবে করজে হাসানা নিতে পারে সুদ ছাড়া এবং পরে তা দিতে পারে। কেননা সুদকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। ফলে কোনো ব্যক্তির পক্ষে সুদের ভিত্তিতে অর্থ নেয়া উচিত নয়।

আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমের কয়েকটি সূরার একাধিক স্থানে ‘করজে হাসানার’ আলোচনা করেছেন। কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে উত্তম করজে হাসানা দেবে, এরপর তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার (আল-হাদিদ-১১)। নিশ্চয় দানশীল ব্যক্তি ও দানশীল নারী, যারা আল্লাহকে উত্তমরূপে করজে হাসানা দেয়, তাদের দেয়া হবে বহুগুণ এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার (আল-হাদিদ-১৮)।

যদি তোমরা আল্লাহকে করজে হাসানা দান কর, তিনি তোমাদের জন্য তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, সহনশীল (আত-তাগাবুন-১৭) তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, আল্লাহকে ‘করজে হাসানা’ দিতে প্রস্তুত, অতঃপর আল্লাহ তাকে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। হ্রাস-বৃদ্ধি দুটোই আল্লাহর হাতে রয়েছে। আর তারই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে (আল-বাকারা-২৪৫)।

আল্লাহতায়ালা বনি ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্য থেকে বারোজন সর্দার নিযুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। যদি তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠিত কর, জাকাত দিতে থাক, আমার পয়গম্বরদের প্রতি বিশ্বাস রাখ, তাদের সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তম পন্থায় করজে হাসানা দিতে থাক, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের গোনাহ দূর করে দেব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করব, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নির্ঝরণীসমূহ প্রবাহিত হয়। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি এরপরও কাফের হয়, সে নিশ্চিতভাবেই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে (আল মায়িদাহ-১২)।

কোরআনের এই আয়াতগুলো থেকে আমরা করজে হাসানার ব্যাপারে জানতে পারলাম। প্রত্যেকটি করজে হাসানা বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা এই আয়াতগুলোতে আমাদের করজে হাসানার বিষয়ে উৎসাহিত করেছেন, এটা আমাদের চিন্তা করা দরকার। আল্লাহতায়ালাকে ঋণ দেয়ার অর্থ হচ্ছে গরিব-দুঃখী, অভাবী, ঋণী ব্যক্তিদের ঋণ দেয়া। তাদের সাহায্য করা, মোটকথা মানবকল্যাণের যত বিষয় আছে সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

এটা ইসলামী অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য যা আজ কমে গেছে বা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ থেকে। করজে হাসানা চালু না থাকায় আমাদের দেশে সুদের প্রচলন বেড়েছে। এখানে মহাজনী সুদ ব্যবসা বা ব্যক্তি পর্যায়ে সুদের ব্যবসা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দুঃখের বিষয় এ ব্যবসা বাংলাদেশের বহু মুসলিম নামধারী লোক করছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, সুদ হল সত্তর প্রকার পাপের সমষ্টি। তার মাঝে সবচেয়ে নিুতম হল- আপন মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করা [ইবনে মাজাহ]। তাই করজে হাসানার ব্যাপক প্রচলন করতে হবে ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে। এটা মুসলিমদের প্রতি ইসলামের অন্যতম নীতিগুলোর একটি।

আমরা জানি, ইসলামী ব্যাংকিং ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি বিশেষ অংশ। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যায় যে, ‘মানবতার কল্যাণ ও আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা’। তাই যদি হয়, তবে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে এভাবে একটি প্রস্তাব বা পরামর্শ দেয়া যেতে পারে যে, তারা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতিক্রমে ‘করজে হাসানা’ নামে একটি ফান্ড বা তহবিল গঠন করতে পারে।

প্রতি বছর ব্যাংকের লাভের একটি অংশ এবং ব্যাংকের মালিক বা শেয়ার হোল্ডার এবং ব্যাংকের বড় বড় গ্রাহকদের এ ফান্ডে আর্থিক সাহায্য করার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া যেতে পারে। কেননা, করজে হাসানা মূলত সমাজের ধনী লোকদের ওপরই বর্তায়। তা ছাড়া জাকাতের টাকাও এর উৎস হতে পারে। কারণ জাকাতের আটটি খাতের মধ্যে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণভার মুক্ত করার একটি খাত রয়েছে। -লেখক: প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button