হরমুজ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মৃত্যুঘণ্টা
সাম্রাজ্যগুলো পতনের পথে যায় তখনই, যখন তাদের সামরিক বিস্তার তাদের রাজনৈতিক কৌশলকে ছাড়িয়ে যায়। আর তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং যাদের তারা দমিয়ে রাখতে চায়, তারা দীর্ঘ সময় টিকে থেকে সেই শক্তিকে অতিক্রম করে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালের জাতীয়করণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য এমনই এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত ছিল। এই সংকট ব্রিটেনের আর্থিক দুর্বলতা উন্মোচিত করে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের চাপ স্টার্লিংয়ের ওপর আঘাত হানে, যা এর বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে পতন ত্বরান্বিত করে এবং সাম্রাজ্যিক পশ্চাদপসরণে বাধ্য করে। সত্তর বছর পর, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান শক্তির জন্য অনুরূপ এক মুহূর্তের ইঙ্গিত দিতে পারে। এই তুলনাগুলো কেবল বাহ্যিক বা অলঙ্কারমূলক নয়। দুই ক্ষেত্রেই, একটি প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থা এমন এক আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি হয়, যা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃত। সাম্রাজ্যিক কেন্দ্র সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেছিল তাদের অবস্থান বজায় রাখতে, কিন্তু ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের গতিশীলতা দ্বারা নয়, বরং গভীর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের দ্বারা।
সুয়েজ ১৯৫৬:
যখন মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন তিনি শুধু মিশরের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক শক্তির ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। খালটি শুধু একটি বাণিজ্যিক পথ ছিল না, এটি ছিল ব্রিটেনের বাকি উপনিবেশগুলোর সঙ্গে সংযোগের একটি কৌশলগত ধমনী এবং সাম্রাজ্যিক মর্যাদার প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে মিশরে আক্রমণ চালায়। এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিরাগত শক্তি হিসেবে ব্রিটেনের যুগের অবসান ঘটায়।
ত্রিপক্ষীয় এই আগ্রাসনের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়করণ উল্টে দেওয়া, নাসেরকে উৎখাত করা এবং সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সামরিকভাবে অভিযানটি প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করেছিল। অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয় এবং ইসরায়েলি বাহিনী সিনাই দখল করে। কিন্তু এই সাফল্য রাজনৈতিক জয়ে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়। নির্ধারক উপাদান শুধু মিশরের সামরিক ও জনসাধারণের প্রতিরোধ ছিলো না, যদিও তা ভূমিকা রেখেছিল। বরং এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ, যারা একটি দ্বিমেরু বিশ্ব ব্যবস্থার প্রধান শক্তি ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার উভয়ই উত্তেজনার ঝুঁকি এবং ব্রিটেনকে পাশ কাটানোর সুযোগ বুঝতে পেরেছিলেন এবং একটি স্পষ্ট আল্টিমেটাম জারি করেন।
ওয়াশিংটন আর্থিক প্রতিশোধের হুমকি দেয়, ব্রিটিশ পাউন্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা সীমিত করে। এমন এক সময়ে, যখন ব্রিটেন তার আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং মুদ্রার মান ধরে রাখতে সংগ্রাম করছিল, সেই চাপ ছিল নির্ণায়ক। ব্রিটেন অপমানজনকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়, আক্রমণ ভেঙে পড়ে এবং নাসের রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিরাগত শক্তি হিসেবে ব্রিটেনের অবসান চিহ্নিত করে। এর জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক আধিপত্যকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। লন্ডন বুঝতে পারে যে, তারা আর আমেরিকার সম্মতি ছাড়া তাদের কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারবে না, এবং মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ই ব্রিটিশ শক্তিকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করে।
সুয়েজ সংকট দেখায় যে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে একটি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা যায় না। স্পষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং কৌশলগত অতিরিক্ত বিস্তার রাজনৈতিক পরাজয়ে পরিণত হতে পারে।
তখন ব্রিটেন, এখন আমেরিকা:
১৯৫৬ সালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং আজকের যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর সামরিকভাবে বিপুল শ্রেষ্ঠত্ব ছিল। কিন্তু উভয়ই গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার দ্বারা সীমাবদ্ধ ছিল।
অর্থনৈতিকভাবে, যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেন ঋণের বোঝায় জর্জরিত ছিল যা ১৯৫৬ সালে ২৭ বিলিয়ন পাউন্ড (আজকের প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার)। শিল্প প্রতিযোগিতা হ্রাস পেয়েছিলো এবং দেশটি বহিরাগত আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্র এখন অনুরূপ সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং স্থায়ী ঘাটতির কারণে, ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্রমশ দুর্বল অর্থনীতি এবং ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার আস্থার ক্ষয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
ব্রিটেনের মতোই, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা অতুলনীয় হলেও, এটি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে—পূর্ব ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত। মধ্যপ্রাচ্য, যা একসময় আমেরিকার কৌশলের কেন্দ্র ছিল, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল এবং অনির্ধারিত সম্পৃক্ততার পর এখন বহু ক্ষেত্রের একটি অংশ মাত্র। এই মনোযোগ ও সম্পদের বিচ্ছুরণ ওয়াশিংটনকে শক্তিশালী রাখলেও, সিদ্ধান্তমূলক ফল আরোপ করার ক্ষমতা সীমিত করে।
রাজনৈতিকভাবে, ব্রিটেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল এবং ফল নির্ধারণে নিজের ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করেছিল। আজকের যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি অঞ্চলের মুখোমুখি, যা দশকের সংঘাতে পরিবর্তিত হয়েছে, যেখানে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি, আঞ্চলিক ক্ষমতা এবং আন্তঃজাতীয় নেটওয়ার্ক ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে দুর্বল করেছে।
যেমন সুয়েজ সংকট ব্রিটিশ পতনকে চিহ্নিত করেছিল, তেমনি এটি আমেরিকার উত্থানকে সহজতর করেছিল। ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরোধিতা নয়, বরং আইজেনহাওয়ারের হস্তক্ষেপ ছিল একটি হিসাবকৃত কৌশল, যাতে ইউরোপীয় মিত্ররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অঞ্চলের অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। ওয়াশিংটন ব্রিটেনের পূর্ববর্তী প্রভাব কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করে। সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণ, জোট সুসংহত করা, এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ গভীর করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিরাগত শক্তিতে পরিণত হয়। এটি সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র বিক্রি, তেল চুক্তি, পেট্রোডলার ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, বিশেষ করে ধনী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে। মিশর, জর্ডান এবং মরক্কোর মতো দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা, ঋণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে টেনে আনে যুক্তরাষ্ট্র। যেসব দেশ একসময় আরব জাতীয়তাবাদী ব্লকের অংশ ছিল—যেমন ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান এবং লিবিয়া। এসব দেশে মার্কিন নীতি বিভাজন ও অস্থিরতা তৈরি করে, যার ফলে দুর্বল রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, যা আমেরিকান আধিপত্য বা ইসরায়েলি নীতির জন্য কোনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠেনি।
সাম্রাজ্যের পতন সাধারণত একা ঘটে না। এটি প্রায়শই নতুন একটি আধিপত্য কাঠামোর উত্থানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বর্তমান মুহূর্তটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দিয়ে ভিন্ন: যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করার মতো কোনো একক শক্তি সামনে আসছে না। বরং একটি খণ্ডিত, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে।
হরমুজ কেন্দ্রবিন্দু :
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করে। যেকোনো বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক এবং ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
ইরানের এই পথ হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা নির্ভর করে ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা, অসম যুদ্ধ কৌশল এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার ওপর।
১৯৫৬ সালের মিশরের মতো নয়, যা প্রধানত রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করেছিল, ইরানের হাতে রয়েছে আরও বিস্তৃত সরঞ্জাম—উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ ব্যাহত করার ক্ষমতা।
ইরান বর্তমান সংঘাতের জন্য একটি স্পষ্ট কাঠামো তুলে ধরেছে। তাদের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ, যুদ্ধের দায় স্বীকার, ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা, অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ, ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন কাঠামো, আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস, এবং গাজা, লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ার যুদ্ধের অবসান দাবি করে। যা এখনও অমীমাংসিত, তা হলো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের পারমাণবিক একচেটিয়া আধিপত্য।
আমেরিকার সীমাবদ্ধতা:
যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দ্বিধার মুখোমুখি, যা ১৯৫৬ সালের ব্রিটেনের মতো, তবে আরও জটিল প্রেক্ষাপটে। উত্তেজনা বাড়ানো বড় ঝুঁকি বহন করে। হরমুজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বা জ্বালানি প্রবাহ ব্যাহত হলে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে, লক্ষ্য অর্জন ছাড়া উত্তেজনা কমানো আমেরিকার শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করবে। এই টানাপোড়েন সাম্রাজ্যিক অতিরিক্ত বিস্তারের সমস্যাকে প্রতিফলিত করে।
শেষ অধ্যায়:
আমেরিকান আধিপত্য দুর্বল হলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো আরও স্বাধীনতা অর্জন করবে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তির সম্পৃক্ততা বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আবারও কেন্দ্রীয় হয়ে উঠবে। ইতিহাস দেখায়, সাম্রাজ্যিক সমর্থন ছাড়া বসতি-ঔপনিবেশিক প্রকল্প টিকে থাকে না।
যদি সুয়েজ একটি সাম্রাজ্যের পতন এবং অন্যটির উত্থান চিহ্নিত করে, তবে হরমুজ হয়তো ভিন্ন কিছু নির্দেশ করছে, যা প্রতিস্থাপন নয়, বরং সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের ধীরে ধীরে ক্ষয়।
এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায়, ইতিহাসের শিক্ষা অপরিবর্তিত: সাম্রাজ্য পতন হয় তখনই, যখন তারা শক্তিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়। -সামি আল-আরিয়ান, ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স (CIGA)-এর পরিচালক। ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করা তিনি ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চার দশক যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন, যেখানে তিনি একজন স্থায়ী অধ্যাপক, সুপরিচিত বক্তা এবং মানবাধিকার কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে তিনি তুরস্কে স্থানান্তরিত হন। তিনি বেশ কয়েকটি গবেষণা ও বইয়ের লেখক।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



