চ্যালেঞ্জের মুখে লেবার

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে পূর্ব লন্ডনে রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত

সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যামকে লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দেখা হয়। বারাটি ১৯৬৫ সালে গঠিত হয় এবং সেই থেকে নিউহ্যাম কাউন্সিল লেবারের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৭ মে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় নির্বাচনে সবকিছু বদলে যেতে পারে। পূর্ব লন্ডনের আরও কয়েকটি এলাকায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে: লেবার বামপন্থী শক্তির কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
আংশিকভাবে এই চ্যালেঞ্জ এসেছে স্থানীয় স্বতন্ত্র দলগুলো থেকে, যেমন রেডব্রিজ ইন্ডিপেনডেন্টস। তবে গ্রিন পার্টির উত্থানের প্রত্যাশাও বাড়ছে।
জ্যাক পোলানস্কির বামপন্থী দলটি সারা দেশে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের আশা করছে, এবং পূর্ব লন্ডনে গ্রিনরা কয়েকটি স্থানে লেবারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেড়ে নিতে পারে। জরিপ বলছে, হ্যাকনি ও লুইশামে গ্রিনরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে।
কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের অনেক প্রতিবেদনে নিউহ্যামকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে ইউগভের এক জরিপে দেখা যায়, নিউহ্যামে গ্রিনরা লেবারের চেয়ে পাঁচ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে, আর নিউহ্যাম ইন্ডিপেনডেন্টস গ্রিনদের চেয়ে চার পয়েন্ট পিছিয়ে। তবে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের কমিশনে পরিচালিত এবং সোমবার প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, গ্রিনদের সমর্থন ৩৪ শতাংশ, যা লেবারের চেয়ে এক পয়েন্ট বেশি।
৩৩ বছর বয়সী আরিক চৌধুরী নিউহ্যামের মেয়র পদে গ্রিন প্রার্থী। সোমবার স্থানীয় প্লাইস্টো পার্কে চকচকে কালো স্যুট, নীল টাই এবং গ্রিন ব্যাজ পরে তিনি বলেন যে, তিনি জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “স্থানীয়ভাবে লেবার পার্টি নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচুর অসন্তোষ রয়েছে, আমাদের এখানে গৃহহীনতার হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১৮ জনে একজন গৃহহীন। আমাদেরকে ইংল্যান্ডের আবর্জনার রাজধানী বলা হয়।”
তবে স্থানীয় সমস্যার পাশাপাশি, চৌধুরী বলেন, “মানুষ কিয়ার স্টারমারের লেবার সরকার নিয়েও “হতাশ”! তারা গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্ত অবস্থান নেয়নি। আবার তারা তাদের অনেক নীতিতেও ইউ-টার্ন নিয়েছে। তারা প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণ ভাতা কমিয়েছে। মানুষ এখন পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত।”
চৌধুরী নিজেও ছাত্রজীবন থেকে লেবার সদস্য ছিলেন এবং ২০২২ সালে স্থানীয় লেবার কাউন্সিলর হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমি লেবারে যোগ দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল মানবাধিকার ও শ্রমিকদের পক্ষে দাঁড়ানো”
২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে লেবারের “অস্বীকৃতি”, চৌধুরীর ভাষায়, তাকে গ্রিন পার্টিতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। গ্রিনরা শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতির পক্ষে ছিল।
“গ্রিন পার্টিকে যত বেশি জানতে পেরেছি, ততই বুঝেছি তারা আসলে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো—পরিবেশ ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছে।” তিনি মনে করেন, নিউহ্যামের অনেক ভোটারের জন্য গাজা ইস্যুতে লেবারের দুর্বল অবস্থান ছিল “মানুষকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানোর একটি পন্থা।”
স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু:
নিউহ্যামের বড় একটি এলাকা স্ট্র্যাটফোর্ডে কেনাকাটা ও খাবার খেতে আসা কিছু মানুষ জানান, তারা এখনো ঠিক করেননি কাকে ভোট দেবেন। অনেকেই জানতেন না যে নির্বাচন সামনে। এক তরুণ ব্রিটিশ এশীয় যুবককে তিনি কাকে ভোট দেবেন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “না না, আমি এসবের মধ্যে নেই,” এরপর দ্রুত সরে যান।
গোলাপি পশমি কোট পরা এক নারী জানান, তিনি রিফর্ম পার্টিকে ভোট দেবেন, কারণ “তাদের সব… কী যেন বলে…” নীতিমালা। তিনি বলেন, তিনি তাদের অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে একমত।
অন্যদিকে, এক মধ্যবয়সী নারী বলেন তিনি গ্রিনদের ভোট দেবেন। তিনি বলেন, “কারণ আমার নাতি-নাতনিরা এখনো পৃথিবীতে আসেনি, আর আমি চাই তারা সুন্দর পৃথিবী পাক।”
তিনি বলেন: “কারণ কিছু মানুষ আছে যারা ধ্বংস করছে এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসের পেছনে ছুটছে। আমরা যদি আমাদের যা আছে তার যত্ন না নিই, তাহলে অন্য কিছুর খোঁজ কেন করছি?
সবুজই সবকিছু, প্রিয়। আমাদের অক্সিজেন দরকার। আমাদের গাছপালা দরকার, যা আমাদের গ্রহের জীববৈচিত্র্যের অংশ।”
৩৫ বছর বয়সী ইভা তাব্বাসাম ওয়ালথাম ফরেস্টের ক্যান হল ওয়ার্ডে গ্রিন কাউন্সিলর প্রার্থী। গত গ্রীষ্মে তিনি দলে যোগ দেন।
তিনি বলেন, বাড়ি বাড়ি প্রচারণায় মানুষ স্থানীয় ও জাতীয়, দুই ধরনের বিষয়ই তোলে। “দুটো একসঙ্গে জড়িত।”
তিনি বলেন: “আমরা বড় বিষয় নিয়ে কথা শুনি, যেমন ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধ। আবার ফিলিস্তিন ও এ ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা নিয়েও কথা শুনি।”
তাব্বাসাম বলেন, “অনেক সময় অমুসলিমরাই গাজা নিয়ে কথা তোলেন। আর মানুষ স্টারমারের “সব ইউ-টার্ন”, দুই-সন্তান ভাতা সীমা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও উচ্চ ভাড়ার বিষয়েও কথা বলে, কারণ এগুলোর প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে পড়ে।”
‘আমার মেয়েরা গ্রিনকে ভোট দিচ্ছে’:
গত সপ্তাহের ইউগভ জরিপে ওয়ালথাম ফরেস্টে গ্রিন ও লেবার উভয়ের সমর্থন ৩০ শতাংশ দেখানো হয়েছে, তাই প্রতিযোগিতা হবে কঠিন।
২৬ বছর বয়সী পিটার ইব্রাহিম কানইকে উইলিয়াম মরিস ওয়ার্ডে গ্রিন কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আশা করছেন।
তিনি বলেন, তিনি স্থানীয় বিষয় যেমন “রাস্তা কতটা পরিষ্কার, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে নিরাপদ রাস্তা ও সহজ পার্কিং” নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, “তবে আমি মনে করি সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে এবং বর্তমান সরকার, বিশেষ করে লেবার, সমাজকে যেভাবে পরিচালনা করেছে তা নিয়ে মানুষের গভীর উদ্বেগ আছে।”
তিনি আরও বলেন, “গ্রিনরা এমন একটি কাউন্সিল ও বারা গড়তে চায় যা প্রতিবেশীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করবে।
এটা নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলে। আর আমি মনে করি, সমাজ গঠন এবং একসঙ্গে কাজ করা অন্যতম বড় উদ্বেগ।”
এক বয়স্ক মরক্কান ব্যক্তি বলেন, তিনি লেবারকে ভোট দেবেন এবং বহু বছর ধরেই লেবারকে ভোট দিয়ে আসছেন। তার স্ত্রী বলেন, তিনিও লেবারকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন, তবে নির্বাচনের দিন মত বদলাতে পারেন। তিনি আরো বলেন,“আমার মেয়েরা গ্রিনকে ভোট দিচ্ছে, আর তারা আমাকেও গ্রিনকে ভোট দিতে বলছে। গাজার ব্যাপারে কে ভালো? গ্রিনরা। আমিও হয়তো তাদের ভোট দেব।”
‘মুসলমানরাও পরিবেশ নিয়ে ভাবতে পারে’:
নিউহ্যামের মেয়র প্রার্থী চৌধুরী বলেন, গাজা ইস্যুতে প্রচারণা চালানোর কারণে নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকের পক্ষ থেকে গ্রিনদের বিরুদ্ধে “সাম্প্রদায়িক রাজনীতি” করার অভিযোগ “সম্পূর্ণ বর্ণবাদী”।
গ্রিন পার্টি একই সঙ্গে নাকি ইসলামপন্থী দল আবার অতিরিক্ত এলজিবিটি দল? বাস্তবতা হলো, আমরা প্রগতিশীল কণ্ঠগুলোর একটি জোট, যারা একটি ভালো সমাজ গড়তে চায়। তাই আমাদের দলে বৈচিত্র্য রয়েছে। অনেক মুসলিম আমাদের দলে যোগ দিচ্ছেন। অনেক এলজিবিটি মানুষও যোগ দিচ্ছেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যোগ দিচ্ছেন।”
তিনি বলেন, পুরো প্রচারণাজুড়ে প্রতিদিনই তাকে বর্ণবাদের শিকার হতে হয়েছে, এমনকি তাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার দাবিও উঠেছে।
তাব্বাসাম বলেন, “মুসলমানরাও পরিবেশ নিয়ে ভাবতে পারে। এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখার একটি অদ্ভুত প্রবণতা আছে। আমরা মুসলমান হিসেবে সবসময় শিখেছি পৃথিবী, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীবজন্তুকে রক্ষা করতে। তাই এই কৃত্রিম বিভাজন কেন, আমি বুঝি না।”
কানইকে যোগ করেন: “আমি মনে করি সমালোচকেরা ভয় পাচ্ছে কারণ মুসলমানরা এমন একটি দল খুঁজে পাচ্ছে যারা সত্যিই তাদের সমর্থন করতে চায়। আমরা বিভাজনের বদলে ঐক্যের দিকে মনোযোগ দিই।
“আমরা বিভিন্ন গোষ্ঠীকে স্বাগত জানাই মানে এই নয় যে, আমরা সাম্প্রদায়িক। আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা, আর মুসলিম সম্প্রদায় যদি মনে করে গ্রিন পার্টি তাদের জন্য উপযুক্ত, তাহলে আমরা অবশ্যই তাদের স্বাগত জানাব।” তবে অনেক মানুষ এখনো লেবারকে সমর্থন করেন এবং তারা গ্রিন ও রিফর্ম, উভয়েরই বিরোধী।
ওয়েস্টফিল্ড স্ট্র্যাটফোর্ডে কেনাকাটা করতে আসা ব্লেজার পরা ফিল নামের এক ব্যক্তি বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে লেবারকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন,
“আমি বিশ্বাস করি রাজনীতিতে তারাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত বিষয়গুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। তারা কম চরমপন্থী, তারা সাধারণ মানুষের কথা ভাবে।
তারা বড় বড় বিষয়গুলো নিয়ে সত্যিই চিন্তিত। হ্যাঁ, গত দুই বছরে তারা ভুল করেছে, কিন্তু তারপরও আমি মনে করি তারাই আমার জন্য সঠিক দল।”
গ্রিনদের তিনি ক্ষতিকর মনে করেন না, তবে শাসনে অক্ষম মনে করেন। অন্যদিকে রিফর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, “ওরা পুরোপুরি পাগলদের দল। সবকিছুই চমক তৈরির জন্য, আর অনেক দিক থেকে তা ঘৃণ্য ও খারাপ।
গ্রিন পার্টির জাতীয় নির্বাচন সমন্বয়কারী ফাইজ হাসান বলেন, এই স্থানীয় নির্বাচনগুলো “একটি সংকটময় সময়ে” অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এটাই সেই সময় যখন আমরা দেশের জন্য একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারি, যা অভিবাসী বা বর্ণের মানুষদের দোষারোপ করার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেখায় যে আসল সমস্যা জাতি নয়, তা হচ্ছে শ্রেণি, এবং সম্পদ ও ক্ষমতার একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া।”
জাতীয় জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, গ্রিনরা সারা দেশে নয়টি কাউন্সিলে জিততে পারে, যার মধ্যে পূর্ব লন্ডনের লুইশাম ও হ্যাকনিও রয়েছে।
তারা যদি শেষ পর্যন্ত তা না-ও পারে, তবুও এই নির্বাচনগুলো সম্ভবত সেই মুহূর্ত হয়ে থাকবে, যা গ্রিনদের দেশজুড়ে কাউন্সিলর ও কর্মীদের মাধ্যমে শক্তিশালী উপস্থিতিসম্পন্ন একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। লেবার অবশ্যই উদ্বিগ্ন থাকবে। -ইমরান মুল্লা, একজন যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সংবাদদাতা, যিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কাজ করেন। তিনি এর আগে বিবিসি হিন্দি, কনজারভেটিভ হোম, দ্য ক্রিটিক এবং ভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রকাশনায় লিখেছেন। তার প্রথম বই দ্য ইন্ডিয়ান খিলাফত: নির্বাসিত উসমানীয় ও বিলিয়নিয়ার প্রিন্স প্রকাশ করেছে হার্স্ট পাবলিশার্স। ২০২৫ সালে তিনি “প্রেস ৩০ আন্ডার ৩০ অ্যাওয়ার্ডস”-এ সম্মাননা লাভ করেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button