যখন প্রেসিডেন্টরা মিথ্যা বলেন, তখন কূটনীতি মারা যায়

মিথ্যা বলা যেমন মানব স্বভাবের অংশ, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনারও একটি অংশ। ইতিহাস জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা প্রতারণা, যার কিছু কিছু স্বীকার করা হয়েছে। আর কিছু গোপন রাখা হয়েছে, যেগুলো রাজনীতিবিদরা ব্যবহার করেছেন টিকে থাকা থেকে শুরু করে দখলদারিত্ব পর্যন্ত নানা উদ্দেশ্যে। যুদ্ধ ও শান্তির নাজুক ভারসাম্যে, সময়মতো বলা একটি মিথ্যাকে অনেক সময় ‘প্রয়োজনীয় মন্দ’ হিসেবে দেখা হয়েছে, যা উত্তেজনা কমাতে বা সংঘাতের কিনারা থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসতে সাহায্য করে। আমাদের এই অতিমাত্রায় যোগাযোগ সংযুক্তির যুগে রাজনৈতিক মিথ্যার স্থায়িত্ব অনেক কমে গেছে। বাস্তব তথ্য এখন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহৃত হয়, ফলে নেতাদের জন্য মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘস্থায়ী নীতি তৈরি করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
কিন্তু ট্রাম্প যেন এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি বারবার এমন আচরণ করেছেন যেন নিজের বানানো গল্পগুলোকেই সত্যি মনে করেন এবং সেই ‘বিকল্প সত্যে’র ওপর ভিত্তি করেই নীতি তৈরি করেন, যদিও সেগুলো মুহূর্তেই ভুল প্রমাণিত হয়। এতে কূটনীতিতে এক ধরনের কাঠামোগত অচলাবস্থা তৈরি হয়। যখন পররাষ্ট্রনীতির নির্মাতা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তখন কূটনীতি তার সংঘাত কমানোর মূল কাজটি হারিয়ে ফেলে। ইরানকে ঘিরে বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, কারণ সাধারণ মানুষ এখনো জানে না এই সংঘাতের আসল কারণ কী। আর পেশাদার কূটনীতিকরা এমন এক পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছেন, যেখানে তারা প্রেসিডেন্টের বক্তব্য সংশোধন বা প্রত্যাহার করতে পারেন না, ফলে তাদেরকে মিথ্যার ভিত্তিতে তৈরি মানচিত্র ধরে এক জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
এই ‘পোস্ট-ট্রুথ’ অর্থাৎ সত্য পরবর্তী কূটনীতির মূল্য সবচেয়ে স্পষ্ট ইরান যুদ্ধের ব্যাখ্যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ‘আসন্ন হুমকি’ ও দ্রুত অগ্রসরমান পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই দাবিকে সমর্থন করেনি। কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড এই ‘আসন্ন হুমকি’র বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং বলেন, এমন সিদ্ধান্ত একমাত্র প্রেসিডেন্টের বিষয়। একই সময়ে প্রশাসন ‘বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ঠেকানো’র কথা বললেও, ওমানে পরোক্ষ আলোচনা চলাকালীনই যুদ্ধ শুরু করা হয়। এই অসামঞ্জস্য আরও স্পষ্ট হয় যখন ট্রাম্প ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির’ দাবি করেন, যা তেহরান সঙ্গে সঙ্গে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেয়।
যখন একটি যুদ্ধ ‘বিকল্প সত্য’ ও অস্তিত্বহীন আলোচনার ভিত্তিতে শুরু হয়, তখন কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়। মিত্ররা বিভ্রান্ত হয়, আর জনগণকে এমন এক যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া হয় যার কারণই অনিশ্চিত।
এই প্রবণতা শুধু বৈদেশিক নীতিতে নয়, অভ্যন্তরীণ নীতিতেও দেখা যায়। পরিবেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে গিয়ে ট্রাম্প ‘এনার্জি ডমিন্যান্স’ নামে একটি ধারণা প্রচার করেছেন, যেখানে তিনি দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদন শিগগিরই তিনগুণ হতে পারে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে ২০২৫ সালে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘সবচেয়ে বড় প্রতারণা’ বলে আখ্যা দেন, যা বৈজ্ঞানিক ঐকমত্যকে উপেক্ষা করে জীবাশ্ম জ্বালানির সম্প্রসারণের পথ তৈরি করে। যখন ‘বিকল্প সত্য’ অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন কূটনীতি দেশীয় পর্যায়েও ভেঙে পড়ে। এই ‘পোস্ট-ট্রুথ’ কৌশল নতুন কিছু নয়। এটি বহু পুরনো এক প্রথার উন্নত রূপ। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় ‘বৃহৎ মিথ্যা’ অর্থাৎ অস্তিত্বহীন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের গল্পের ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এটি ছিল এক ধরনের তিক্ত ব্যঙ্গ, একটি দেশকে ‘মুক্ত’ করার নামে ধ্বংস করে দেওয়া। যার ফলে লাখো মানুষ প্রাণ হারায়, আর দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
২০১১ সালে লিবিয়ায় হস্তক্ষেপের সময়ও একই কৌশল দেখা যায়। ‘হাজার হাজার মানুষ হত্যা’ ও ‘অত্যাচার’-এর মতো অপ্রমাণিত তথ্য ছড়িয়ে যুদ্ধকে বৈধতা দেওয়া হয়, যা পরে তদন্তে অতিরঞ্জিত প্রমাণিত হয়। দুই ক্ষেত্রেই ‘বিকল্প সত্য’ যুদ্ধের পথ সহজ করে দেয়।
আজ ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। যখন ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা সত্যকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, তখন কূটনীতি শুধু ব্যর্থ হয় না, ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়।
এই ধারাবাহিক মিথ্যার ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখন এক সংকটময় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন সত্য আর কূটনীতির ভিত্তি নয়। যখন একটি পরাশক্তি সত্যকে ‘বিকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করে, তখন আলোচনা ও সমঝোতার ভাষাই ভেঙে পড়ে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে পশ্চিমা বিশ্বের ‘মানবাধিকার’ বা ‘গণতন্ত্র’ এখন আর নৈতিক আহ্বান নয় বরং নতুন ‘রেজিম পরিবর্তনে’র ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
শেষ পর্যন্ত, এই ‘পোস্ট-ট্রুথ’ যুগের সবচেয়ে বড় মূল্য শুধু বিশ্বাস হারানো নয় বরং বিশ্বাসের বাস্তব ধ্বংস। যখন প্রেসিডেন্টরা মিথ্যা বলেন, তখন কূটনীতি শুধু মারা যায় না, তার জায়গা নেয় স্থায়ী সংঘাত ও সহিংসতা।
মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের জন্য, ত্রিপোলির ধ্বংসাবশেষ থেকে তেহরানের রাস্তায়, গাজার ধ্বংসস্তূপে, সত্য কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
যতদিন না আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সত্য আবার ভিত্তি হয়ে ওঠে, ততদিন একমাত্র ভাষা হবে সংঘাতের ভাষা। আর ভবিষ্যৎ হবে নতুন নতুন ‘বানানো যুদ্ধে’র। -মুস্তাফা ফেতৌরি, একজন লিবিয়ান শিক্ষাবিদ ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ফ্রিডম অব দ্য প্রেস’ পুরস্কারের প্রাপক।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button