সীমান্তরেখা যেকোনো সময় বদলাতে পারে
গ্রেটার ইসরায়েল: আপনার পাশের দেশেই আসছে
সাত দশক ধরে ইসরায়েল স্থির সীমানার ভেতরে নয়, বরং “পরিবর্তনশীল রেখা” কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে আসছে। ১৯৪৭ সালের বিভাজন পরিকল্পনা থেকে আধুনিক সামরিক নীতিমালা পর্যন্ত, এর ভূগোল একটি চলমান লক্ষ্যবস্তু এবং একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া সীমারেখার ধারাবাহিকতা, যার উদ্দেশ্য সম্প্রসারণ সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক আইন এড়িয়ে যাওয়া। কার্যত, ইসরায়েল নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সীমানা স্বীকার করে না এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সীমারেখাকেও সম্মান করে না। ইরান থেকে মিসর পর্যন্ত—আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোকে অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা নয়, বরং মানচিত্রের খসড়া হিসেবে দেখা হয়। নিজের সীমা নির্ধারণে এই অস্বীকৃতি একটি স্থায়ী “ফ্রন্টিয়ার অবস্থা” বজায় রাখে, যেখানে সম্প্রসারণই একমাত্র ধ্রুবক, আর আন্তর্জাতিক আইন কেবল ঐচ্ছিক পরামর্শে পরিণত হয়।
আমাদের বাস্তবতাকে ভুলে গেলে চলবে না: ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূমিতে প্রতিষ্ঠার পরপরই ইসরায়েলকে জাতিসংঘের ১৮১ নম্বর প্রস্তাবের অধীন ধরা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের এই বিভাজন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি চূড়ান্ত সীমানা-নকশা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, যে সীমানায় বসবাস করার কোনো প্রকৃত ইচ্ছাই জায়নিস্ট নেতৃত্বের ছিল না।
ইতিহাস বলছে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে ইহুদি এজেন্সি প্রকাশ্যে পরিকল্পনাটি মেনে নিলেও, ব্যক্তিগতভাবে তাদের নেতারা এটিকে কেবল “প্রথম ধাপ” হিসেবে দেখেছিলেন। ডেভিড বেন-গুরিয়ন তখন জায়নিস্ট নির্বাহী কমিটিকে বলেছিলেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো “বিভাজন বাতিল করে সমগ্র ফিলিস্তিনে বিস্তার” করার একটি হাতিয়ার।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ভয়াবহ উচ্ছেদের পর ১৯৪৯ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তিগুলো “গ্রিন লাইন” নির্ধারণ করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি আইনি অর্থে কখনোই “সীমান্ত” ছিল না। উভয় পক্ষের জোরাজুরিতে এটি কেবল সামরিক বিভাজনরেখা হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়, যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু যেখানে জাতিসংঘ চেয়েছিল এই রেখা ভবিষ্যৎ দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের ভিত্তি হোক, কিন্তু ইসরায়েলি নেতৃত্ব এটিকে দেখেছিল সাময়িক বিরতি হিসেবে।
এই রেখাগুলোকে স্থায়ী, স্বীকৃত সীমান্তে পরিণত করতে অস্বীকার করে ইসরায়েল তার কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখে—যাতে রাজনৈতিক সুযোগ পেলেই শক্তির মাধ্যমে মানচিত্র নতুন করে আঁকা যায়।
আজ গ্রিন লাইন কার্যত একটি কৌশলগত মরিচীকা। জায়নিস্ট দৃষ্টিতে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য রক্ষিত একটি ভিজ্যুয়াল বিভ্রম, বাস্তবে ধারাবাহিক বসতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে যা মুছে ফেলা হয়েছে। ভূগোলের ওপর প্রয়োগ করা এই “অর্থোগ্রাফিক মিনিমালিজম” রাষ্ট্রটিকে এক স্থায়ী পরিবর্তনের অবস্থায় রাখে। এটি এমন “ক্রমাগত সংযুক্তি” সহজ করে, যা দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে শুধু অচল নয়, ধ্বংস করে ফেলে।
যখন বাস্তবিক গ্রিন লাইন গুরুত্ব হারাতে থাকে, তখন নতুন শব্দভাণ্ডার জন্ম নেয়: “ইয়েলো লাইন”। এটি আর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং একটি কৌশলগত রাজনৈতিক-সামরিক উপকরণ।
সীমান্তের বিপরীতে, ইয়েলো লাইন হলো তথাকথিত “অনুমোদিত উপস্থিতি”-র এক নমনীয় পরিসীমা—একটি পরিবর্তনশীল ধূসর অঞ্চল, যাকে ইসরায়েল তার প্রয়োজন অনুযায়ী সম্প্রসারিত বা সংকুচিত করে। যা সে করে অনুপ্রবেশ, নজরদারি এবং নিরাপত্তার অজুহাতে পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ড ধীরে ধীরে আত্মসাৎ করার জন্য। গাজা ও লেবাননে এই পরিবর্তনশীল সীমার কৌশল এখন সহিংস ভৌগোলিক পুনর্নির্মাণে রূপ নিয়েছে। গাজায়, “নিরাপত্তা”র চিরাচরিত অজুহাতে ইসরায়েল ধ্বংসপ্রাপ্ত ভূখণ্ডের বড় অংশ দখল করেছে, গভীর বাফার জোন তৈরি করে কার্যত ভূখণ্ড সংকুচিত করছে। এদিকে কাগজে-কলমে বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রস্তাব—যেমন ট্রাম্পের “ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি” বা বিভিন্ন যুদ্ধবিরতি কাঠামো—সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের কথা বললেও বাস্তবতা সেগুলোকে ব্যঙ্গ করে। গাজার “সীমা” এখন চুক্তির কালি নয়, ট্যাংকের চাকার দাগে নির্ধারিত। লেবাননে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। প্রযুক্তিগতভাবে যুদ্ধবিরতি থাকলেও, ইয়েলো লাইন—যা এখন এক আক্রমণাত্মক “নিরাপত্তা রেখা”—জাতিসংঘ স্বীকৃত ব্লু লাইনের অনেক বাইরে চলে গেছে। এটি উত্তর দিকে লিতানি নদী পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে মনে হয়, যা কার্যত দক্ষিণ লেবাননের পুরো অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে। লেবাননের জন্য এটি এক গভীর ঐতিহাসিক পশ্চাদপসরণ; এই অঞ্চল ২০০০ সালে দীর্ঘ প্রতিরোধের মাধ্যমে ইসরায়েলি দখল থেকে মুক্ত হয়েছিল।
লিতানি পর্যন্ত এই একতরফা সীমা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে ইসরায়েল লেবাননের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করছে, দক্ষিণ অঞ্চলকে আবারও সম্মানযোগ্য সীমান্ত নয়, বরং শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত “ফ্রন্টিয়ার” হিসেবে বিবেচনা করছে। ইরানের ক্ষেত্রে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে “রেড লাইন” ধারণা এই নীতির চূড়ান্ত রূপ। এখানে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে এবং ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করতে। এসব সীমারেখা আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা নির্ধারিত নয়, কিংবা নিরপেক্ষ নিরাপত্তা প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ অনুযায়ী একতরফাভাবে নির্ধারিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনে শক্তিশালীকৃত।
চূড়ান্ত লক্ষ্য রয়ে গেছে “গ্রেটার ইসরায়েল” প্রকল্প বাস্তবায়ন। আগে এটি প্রচলিত যুদ্ধ ও ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে এগোনো হতো, কিন্তু এখন আমরা এক নতুন পর্যায় দেখছি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে।
এখন এই প্রকল্প কেবল যুদ্ধ দিয়ে নয়, বরং কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফিলিস্তিন প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়েই তার দখলকৃত ভূখণ্ডকে বৈধতা দিতে চায় ইসরাইল। এই কৌশল তাকে প্রকাশ্য ও গোপন মিত্রদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে—এমনকি কিছু আরব রাষ্ট্রের মধ্যেও—যা তার “ফ্রন্টিয়ার” নীতিকে শক্তিশালী করে। এটি ভৌত দখল থেকে পদ্ধতিগত আধিপত্যে রূপান্তরের ইঙ্গিত।
প্রতীকী ও ধর্মীয় উপাদানগুলোও এখানে ব্যবহৃত হয়। ঐতিহাসিক বর্ণনা ও ধর্মীয় উল্লেখের মাধ্যমে এই কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোকে “ আধুনিক আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের পরিবর্তে ঐশ্বরিক অধিকার” হিসেবে তুলে ধরা হয়।
স্থির সীমান্তে আবদ্ধ হতে অস্বীকার করে ইসরায়েল একটি স্থায়ী “ফ্রন্টিয়ার মানসিকতা” বজায় রাখে, যা সংঘাতকে অব্যাহত রাখে এবং ক্রমাগত প্রভাব বিস্তারের দিকে ধাবিত হয়।
আজ “গ্রেটার ইসরায়েল” কেবল ধারণা নয়—এটি মাটিতে প্রতিষ্ঠিত এক বাস্তবতা, যার প্রভাব ইরানের সীমানা থেকে মিসরের দুয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যা ভূগোল দিয়ে নয়, বরং অন্যদের ওপর আরোপিত “রেড লাইন” এবং নিজের জন্য মুছে ফেলা “ইয়েলো লাইন” দিয়ে সংজ্ঞায়িত।
এই কৌশলের অন্তর্নিহিত বিপদ হলো—এ ধরনের সীমারেখা স্বভাবগতভাবেই অস্থির। যখন একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তার রাজনৈতিক ও ভৌত সীমার ক্রমাগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন শান্তি গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়। -ড. মুস্তাফা ফেতৌরি, একজন লিবিয়ান একাডেমিক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফ্রিডম অব দ্য প্রেস পুরস্কারের প্রাপক।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



