ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন
দুই সিলেটির দখলে টাওয়ার হেমলেট্স ও নিউহাম কাউন্সিলের মেয়রের চেয়ার
এনাম চৌধুরী: দুই সিলেটির দখলে ব্রিটেনের বাংলাদেশ অধ্যুষিত টাওয়ার হেমলেট্স ও নিউহাম কাউন্সিলের মেয়রের চেয়ার! শিরোনাম পড়ে নিশ্চয় বিস্মিত হয়েছেন। মেয়রের চেয়ার দখল মানে জোর করে বুঝি বসে গেছেন কিংবা ক্ষমতাসীন কোন পক্ষ তাদের ইচ্ছেমতো চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে! না ঘটনাটি এমন কিছুই নয়। ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজধানী লন্ডনের আলোচিত দুটি বারা কাউন্সিল ‘লন্ডন বারা অব টাওয়ার হেমলেট্স এবং নিউহাম কাউন্সিলের নির্বাচনে দুজন সিলেটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এর একজন ব্রিটেনের বহুল আলোচিত এবং প্রথম নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান এবং অপরজন ফরহাদ হোসেন। মেয়র হিসেবে লুৎফুর রহমান চতুর্থ বার এবং ফরহাদ হোসেন প্রথমবার মেয়রের চেয়ারে বসলেন।মেয়র লুৎফুর রহমান ষোলো হাজার দুইশত পঁচিশ (১৬২২৫)ভোটে নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি লেবার পার্টির প্রার্থী এবং কাউন্সিলের বিরোধী দলীয় নেতা সিরাজুল ইসলামকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। মেয়র লুৎফুরের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা পঁয়ত্রিশ হাজার ছয়শত ঊনআশী (৩৫৬৭৯) এবং সিরাজুল ইসলামের উনিশ হাজার চারশত চুয়ান্ন (১৯৪৫৪) টি।
অপরদিকে নিউহাম কাউন্সিলে নির্বাচিত লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত মেয়র ফরহাদ হোসেন তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি নিউহাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রার্থী মাহমুদ মির্জা কে পাঁচ হাজার তিনশত চার ভোটে (৫৩০৪) পরাজিত করে প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশী মেয়র হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতা গ্রহণ করছেন। ফরহাদ হোসেনের প্রাপ্ত ভোট পঁচিশ হাজার পাঁচশত আটত্রিশ (২৫৫৩৮) এবং মাহমুদ মির্জার বিশ হাজার দুইশত চৌত্রিশ (২০২৩৪) টি। ১৯৬৩সালে কাউন্সিল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর কখনো লেবার পার্টির হাত ছাড়া হয়নি এ কাউন্সিলটি।
টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিল ও লন্ডন বারা অব নিউহাম দুটি পাশাপাশি কাউন্সিলের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই ব্রিটিশ বাংলাদেশী নাগরিক অধ্যুষিত। এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যেও নানা ভাবে তাদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। ব্রিটেনের জাতীয়(পার্লামেন্টারী) ও স্থানীয় সরকার (কাউন্সিল) নির্বাচনে ব্রিটিশ বাংলাদেশী ভোটাররা এখানকার মূল শক্তি হিসেবে বিবেচিত।২০১০ সালে টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিলের প্রথম নির্বাহী মেয়র হিসেবে লুৎফুর রহমান প্রতিদ্বন্দিতা করলে তখন তাঁর বিপরীতে লেবার পার্টির প্রার্থী করা হয় অপর এক বাংলাদেশীকে। কারণ বাংলাদেশী ভোটারদের আলাদা না করলে এখানকার ভোটের শক্তিকে প্রতিহত করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।
লন্ডনের টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিলের ভেতরে বর্তমানে দুটি সংসদীয় আসন রয়েছে এবং এর দুটিতেই দু’জন নির্বাচিত ব্রিটিশ বাংলাদেশী রোশনারা আলী এবং আফসানা বেগম পার্লামেন্টে এর প্রতিনিধিত্ব করছেন।
মেয়র লুৎফুর রহমান সিলেট জেলার অবিভক্ত বালাগঞ্জ বর্তমান ওসমানী নগর উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের সিকন্দরপুর গ্রামে এবং ফরহাদ হোসেন এর বাড়ি বালাগঞ্জ উপজেলার বোয়ালজুড়ে।
টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিল নির্বাচন: চতুর্থ বারের মতো টাওয়ার হেমলেট্স এর মেয়র হলেন লুৎফুর রহমান
ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশী অধ্যুষিত টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিলের মেয়র হিসেবে চতুর্থবারের মতো আবারো নির্বাচিত হলেন লুৎফুর রহমান। তিনি টাওয়ার হেমলেট্স এসপায়ার পার্টি থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার ছয়শত ঊনআশী (৩৫৬৭৯) ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি লেবার পার্টির প্রার্থী এবং কাউন্সিলের বিরোধী দলীয় নেতা সিরাজুল ইসলামকে পরাজিত করেন। লেবার পার্টি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা উনিশ হাজার চারশত চুয়ান্ন (১৯৪৫৪) টি। এ ছাড়াও গ্রিন পার্টি’র হীরা খান অডিগুন ১৯২২৩টি, রিফর্ম ইউকে জন বোলার্ড ৭১৫৩ টি, কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী ডমিনিক নোলান ৩৮১৮ টি, টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টস পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার জামি আলী ৩১৫৬ টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টি (লিবডেম) এর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান পেয়েছেন ২৪২১ টি, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড স্যোশালিস্ট কোয়ালিশন হুগো পিয়েরে ৬৩৮টি, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্যারেন্স ম্যাকগ্রেনেরা ৫২৪ টি ভোট।
টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিলের এবারের নির্বাচনে দুই লক্ষ উনিশ হাজার ত্রিশ জন (২১৯০৩০) রেজিস্টার্ড ভোটারের মধ্যে মেয়র পদে মোট ভোট পড়েছে বিরানব্বই হাজার ৬৬ ভোট যা মোট ভোটের ৪২.১% এবং ৭৮২ টি ভোট নষ্ট হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এ তথ্য অনুযায়ী অর্ধেকের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি। বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমানসহ মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই জন প্রার্থীর ৪ জনই বাংলাদেশী।
বৃহস্পতিবার (৭ মে ) সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মোট ৭৫টি কেন্দ্র বা ভোট কেন্দ্রে নিবন্ধটি নাগরিকরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী এ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ও গণনাকেন্দ্রে ৮০০ জন কর্মী, টাওয়ার হ্যামলেটস পুলিশ এবং ইলেক্টোরাল কমিশনের কর্মকর্তা নির্বাচন সুষ্ঠু অংশান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করতে কাজ করেন।
বিজয়ী প্রার্থী লুৎফুর রহমান
২০১০ সালে ২১ অক্টোবর প্রথম নির্বাহী মেয়র পদ্ধতির নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লুৎফুর রহমান লেবার পার্টিরপ্রার্থী হেলাল উদ্দিন আব্বাসকে বিপুল ভোট পরাজিত করেন। ঐ নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের প্রাপ্ত ভোট ছিল ২৩২৮৩ যা মোট ভোটের ৫১.৮% এবং লেবার পার্টির প্রার্থী হেলাল আব্বাস ১১,২৫৪ যা মোট ভোটের ২৫.০%। ঐ নির্বাচনে লুৎফুর রহমান যে হেলাল আব্বাসকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন সেই হেলাল আব্বাসের হাত ধরেই এক সময় লেবার রাজনীতিতে তাঁর অভিষেক হয়েছিল।
টাওয়ার হেমলেটস কাউন্সিলের প্রথম নির্বাহী মেয়র পদ্ধতির ঐ নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের বিজয়কে গুরুর বিরুদ্ধে শিষ্যের বিজয় হিসেবে উল্ল্যেখ করেছিলেন বোদ্ধা মহল।
২০১৪ সালের নির্বাচনে লেবারপার্টি প্রার্থী জনবিগসকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হলেও স্বল্প দিনের মধ্যেই ক্ষমতা ছাড়তে হয়। একটি ট্রাইবুনালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তিনি নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহারসহ এমন কিছু কাজ করেছেন যা অনৈতিক এবং আচরণবিধি লঙ্গন। ট্রাইবুনাল তাকে পাঁচ বছরের জন্য যে কোনো নির্বাচনের জন্য নিষিদ্ধ হিসেবে রায় দেয়।
২০২২ সালে নির্বাচনী আদালতের রায়ের পর ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ করে তিনি এই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তৃতীয় বারের মতো বিপুল ভোট বিজয়ী হয়ে ফিরে আসেন মেয়রের দ্বায়ীত্বে।
এবারের নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের জন্য নানা মুখী চ্যালেঞ্জ ছিল। একদিকে মেয়র অফিস টাউন হল পরিচালনা, অর্থ ব্যবস্থাপনাসহ কিছু অভ্যান্তরিন বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের হস্তক্ষেপ, অপরদিকে বিরোধীপক্ষের নানামুখী অপপ্রচার ভোটারদের রীতিমত বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। তবে নির্বাচনী খেলায় পাকা খেলোয়াড় কৌশলী লুৎফুরের জনবান্ধব উন্নয়ন কর্মসূচি এবং পূর্বের কাজের বাস্তব ফল তাঁর বিজয়ের পালে বাতাস দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তরুণ ভোটার:
ব্রিটেনের তরুণ ভোটারের বারা কাউন্সিল খ্যাত টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিলের তরুণ ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এখানকার তরুণ ভোটারদের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে এবারের কাউন্সিল নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় ব্যাপক তরুণ ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেছে এবং উল্যেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ লুৎফুর রহমানের পক্ষে মাঠে কাজ করেছেন।
বিজয়ী বক্তৃতায় মেয়র লুৎফুর:
বিজয় বক্তব্যে চতুর্থবারের মতো নির্বাচত নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, আমি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মানুষের সার্ভেন্ট। তারা যতদিন চাইবে ততদিন পর্যন্ত কাজ করে যাবো। ২০২২ সালের বিজয়ী হওয়ার পর থেকে আমি আবারো চেষ্টা শুরু করি বারা’র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের। ফ্রি স্কুল মিল,ভালো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া এবং ভালো চাকুরীর ব্যবস্থা, বয়স্কদের হোম কেয়ার, নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কই এবং গ্রীন পরিবেশ তৈরিতে পরিকল্পিত উন্নয়ন সাধন করেছি।
তিনি হাউজিং সমস্যা সমাধানের কথা উল্যেখ করে তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৬ হাজার বাড়ি নাগরিকদের কাছে হস্তান্তরের কথা উল্যেখ করে বলেন, আমরা এবারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি নতুন করে ৬ হাজার বাড়ি নির্মাণ করবো। তিনি ইউরোপের ফাইনান্সিয়াল ক্যাপিটাল খ্যাত ক্যানারিওয়ার্পে বিখ্যাত জেপিমরগ্যান গ্রূপের ইনভেস্টমেন্ট এর কথা উল্যেখ করে বলেন, জেপি মরগ্যান এর নতুন ব্যবসা কার্যক্রম শুরু হলে এখানে প্রায় ১২ হাজার নতুন জব তৈরী হবে। এর সুবিধাভোগী হবে আমাদের সন্তানরা। ১২ হাজার মানুষ এখানে যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের কাজের সুবিধা পাবে। লন্ডনের অন্য কোনো বারা’য় এই প্রজেক্টটি হলে আমরা জব মার্কেট থেকে যেমনি বঞ্চিত হতাম তেমনি কয়েক মিলিনের কাউন্সিল টেক্সও পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকতো না। আমরা বিখ্যাত এই বিজনেস গ্ৰুপের প্রজেক্ট টাওয়ার হেমলেট্স এ হওয়ার সুযোগ তৈরী করেছি।
তিনি বারা’য় বয়স্কদের সেবায় উন্নত হোম কেয়ারিং সেবা, শারীরিক স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্পোর্টস সেন্টারগুলোর কার্যক্রম চালু করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, আমি টাওয়ার হেমলেটসকে একটি রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, জনগণ যতদিন চাইবে কাজ করবো, যখন চাইবেন না, চলে যাবো।
রিটার্নিং অফিসারের কৃতজ্ঞতা:
শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন সম্পন্ন এবং নাগরিকরা নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোট প্রদান করায় টাওয়ার হ্যামলেটসের রিটার্নিং অফিসার স্টিফেন হ্যালসি নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “একটি শক্তিশালী ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করতে যারা এই নির্বাচনে কাজ করেছেন, তাদের সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাl দেশের অন্যতম সেরা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় টাওয়ার হেমলেট্স কাউন্সিলের নির্বাচন সম্পন্ন হয় উল্ল্যেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সকল কর্মকর্তা, সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাই বারা’র নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে সহায়তা করেছেন।”



