ব্রিটিশ রাজনীতিতে টালমাটাল অবস্থায় লেবার

গত সপ্তাহের ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের নির্বাচনের পর এখন আর এটা বলা অতিরঞ্জিত হবে না যে, যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। ইংল্যান্ডে দলটি প্রায় ১,৫০০ কাউন্সিলর হারিয়েছে, পাশাপাশি কার্ডিফের সেনেডের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে, যা তারা ১৯৯৯ সাল থেকে ধরে রেখেছিল। বিশেষ করে ওয়েলসে লেবারের ঐতিহাসিক আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে এই ফলাফল ছিল ভয়াবহ ধাক্কা।
স্কটল্যান্ডেও লেবার আরও পিছিয়েছে, যেখানে দলটির দীর্ঘমেয়াদি পতন অব্যাহত রয়েছে, যদিও মাঝেমধ্যে পুনরুত্থানের দাবি শোনা যায়।
এই ফলাফলকে কেবল মধ্যবর্তী সময়ের প্রতিবাদমূলক ভোট বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা টিকবে না। আবার, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রতি ন্যায্যতা দেখিয়ে বলতে হয়, এটি শুধু ব্যক্তিগতভাবে তার প্রত্যাখ্যানও নয় – যদিও সেটিও এর অংশ।
এটি আরও একটি প্রমাণ যে লেবারের ভেতরে একটি মৌলিক কাঠামোগত সংকট তৈরি হয়েছে, যা দলটির জোটকে বাম ও ডান উভয় দিক থেকেই ভেঙে দিচ্ছে। লেবার অতীতেও বড় পরাজয়ের মুখ দেখেছে, কিন্তু তখন দলটির শ্রমজীবী মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক গভীর ছিল, যা এখন আর নেই।
তবুও আলোচনা দ্রুত নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে স্টারমারের টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। লেবার এমপি ও দলীয় অভ্যন্তরের লোকজন প্রকাশ্যেই সম্ভাব্য নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করছেন, যা সরকার গঠনের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই স্টারমারের অবস্থানের ভঙ্গুরতা প্রকাশ করে। এখন বহু লেবার এমপি তার পদত্যাগ দাবি করলেও স্টারমার বলছেন, তার সরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। কিন্তু তার সমস্যা হলো, যদি নেতৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ আসে, তাহলে দলের ভেতরে বা বাইরে তার হাতে খুব সামান্য রাজনৈতিক পুঁজি কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্য থাকবে।
অবস্থান নেওয়ার প্রতিযোগিতা:
স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরিরা যেন ইতোমধ্যেই নিজেদের অবস্থান গুছিয়ে নিতে শুরু করেছেন, এবং সম্ভবত অনেক আগে থেকেই। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম লেবারের সফট-লেফট অংশের কাছে অনেকটা “প্রিন্স ওভার দ্য ওয়াটার”, যদিও তাকে হাউস অব কমন্সে ফেরার পথ খুঁজতে হবে।
অন্যদিকে এমপি অ্যাঞ্জেলা রেইনার এখনো লেবারের কিছু সদস্য ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সমর্থন ধরে রেখেছেন। এড মিলিব্যান্ডের নামও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার হিসেবে ঘুরছে, যদিও অতীতে লেবার নেতা হিসেবে তার ব্যর্থতা নতুন করে নেতৃত্বের দৌড়ে নামার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে। স্পষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষী এমপি ওয়েস স্ট্রিটিং প্রায় নিশ্চিতভাবেই লেবারের ডানপন্থী অংশের প্রধান মুখ হতেন। তবে তার জয়ের পথ খুব সংকীর্ণ।
যদিও স্ট্রিটিং পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির কিছু অংশ, গণমাধ্যম এবং করপোরেট দাতাদের শক্ত সমর্থন পেতেন, তবুও লেবার সদস্যরা জেরেমি করবিনের অনেক সমর্থক স্বেচ্ছায় বা অন্যভাবে দল ছাড়ার পরও এতটা স্পষ্ট ব্লেয়ারপন্থী একজনকে সহজে মেনে নেবেন বলে মনে হয় না।
১৯৮০-এর দশক থেকে সংগঠিত শ্রম আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পতনের ফলে ভোটারদের জন্য এখন লেবার পার্টি ত্যাগ করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়ে গেছে। যদি সিদ্ধান্ত শুধু লেবার এমপিদের হাতে থাকত, তাহলে স্ট্রিটিংয়ের জয়ের সম্ভাবনা শক্তিশালী হতো। কিন্তু সাধারণ সদস্যদের ভোট একেবারেই ভিন্ন বিষয়। এখনো পার্লামেন্টারি দল ও তৃণমূল লেবার সদস্যদের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
এদিকে বার্নহ্যাম গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে তুলনামূলকভাবে সফল ছিলেন, যা তাকে জনসমক্ষে দৃশ্যমান রেখেছে। কোভিড মহামারির সময় বরিস জনসনের কনজারভেটিভ সরকারের সঙ্গে তার সংঘাত তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দেয়, একইসঙ্গে ২০২৩ সালের অক্টোবরেই গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বানও তাকে আলাদা পরিচিতি দেয়। তবে বার্নহ্যামের সময়ের বাতাস বুঝে অবস্থান বদলানোর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। গর্ডন ব্রাউনের অধীনে মন্ত্রী থাকাকালে তিনি ব্লেয়ারপন্থী ডানঘেঁষা ছিলেন, পরে মিলিব্যান্ডের সময় বিরোধী দলে গিয়ে সফট-লেফটের দিকে ঝুঁকেন। এখন বহু লেবার সদস্য তার ওপর আশা প্রক্ষেপণ করছেন, এটি হয়তো তার মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বিকল্প থাকার চেয়ে হতাশারই প্রতিফলন। স্টারমার-পরবর্তী সফট-লেফট নেতৃত্বের সামনে আরেকটি বড় কাঠামোগত বাধাও রয়েছে, তা হচ্ছে পার্লামেন্টারি লেবার পার্টি। স্টারমার ও মরগান ম্যাকসুইনি দলটিকে এমনভাবে পুনর্গঠন করেছেন যেখানে প্রার্থী বাছাই কঠোরভাবে কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে (যদিও স্টারমার আগে স্থানীয় দলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছিলেন), এবং অবশিষ্ট বামপন্থীদের প্রান্তিক করে দেওয়া হয়েছে। বার্নহ্যাম বা রেইনার যদি সত্যিই প্রগতিশীল সরকার গঠনের ইচ্ছা রাখেন, তাহলেও তারা এমন একটি পার্লামেন্টারি দল হয়তো উত্তরাধিকার হিসেবে পাবেন, যারা অর্থবহ পরিবর্তনের প্রতি গভীরভাবে বিরূপ। মিলিব্যান্ড এবং আরও বড় পরিসরে করবিন – উভয়েই তাদের নেতৃত্বের সময় দলীয় ডানপন্থীদের লাগাতার অন্তর্ঘাত, কটাক্ষ ও অপপ্রচারের শিকার হয়েছিলেন।
ম্লান হয়ে যাওয়া আনুগত্য:
দশকের পর দশক ধরে লেবারের সঙ্গে তার নিজ সামাজিক ভিত্তির সম্পর্ক ক্রমশ আরও লেনদেনভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। একসময় সমাজবিজ্ঞানী রালফ মিলিব্যান্ড যাকে “শ্রমের জগৎ” বলেছিলেন, শ্রমজীবী সম্প্রদায়- ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্থানীয় শ্রম আন্দোলনের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কাঠামো আজ তা প্রায় ভেঙে গেছে।
করবিন যুগে প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার সদস্যে পৌঁছানো লেবারের সদস্যসংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। দলটির প্রতি সাংস্কৃতিক ও আবেগগত আনুগত্যও ভেঙে পড়েছে। এখন আমরা সেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ের নির্বাচনী ফলাফল দেখতে পাচ্ছি। লেবার দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছে। ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল ও মিডল্যান্ডসের পুরনো শিল্পাঞ্চলগুলোতে – যেখানে একসময় ট্রেড ইউনিয়নের আনুগত্য ও যৌথ সংগ্রামের স্মৃতি জীবন্ত ছিল – এখন তা প্রায় বিলীন, আর সেই শূন্যতা ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে রিফর্ম ইউকে শক্তি বাড়াচ্ছে।
স্কটল্যান্ডে ইতোমধ্যেই স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির কাছে জায়গা হারানোর পর এখন ওয়েলসেও প্লেইড কামরির কাছে পিছিয়ে পড়ছে। একই সময়ে ইংল্যান্ডের বড় শহরগুলোতে গ্রিন পার্টির কাছেও সমর্থন হারাচ্ছে।
গাজায় সংঘটিত গণহত্যা এবং তাতে লেবারের সম্পৃক্ততা দলটির সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। স্টারমারের ইসরায়েলপন্থী অবস্থান – যার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের গণহারে হত্যার সময় ব্রিটিশ অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া অন্তর্ভুক্ত। এটা বহু পুরোনো লেবার সমর্থকের মধ্যেও গভীর নৈতিক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে, বিশেষত ব্রিটিশ মুসলিম ও তরুণ বামঘেঁষা ভোটারদের মধ্যে। এই বিচ্ছেদ হয়তো স্থায়ী রূপ নিতে পারে।
কিন্তু স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরিরা এই ক্ষোভের গভীরতা ও তীব্রতা কতটা উপলব্ধি করছেন, তা স্পষ্ট নয়। বার্নহ্যামের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান তাকে স্টারমারের থেকে আলাদা করেছিল, কিন্তু এরপর তার তুলনামূলক নীরবতা লেবারের উচ্চপর্যায়ের ভেতরে ভিন্নমতের সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে। রেইনার ও এড মিলিব্যান্ড এ বিষয়েও তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলেননি।
সম্ভবত লেবারের সমস্যাগুলো এখন আর শুধু নেতা বদলিয়ে সমাধানযোগ্য নয়। ১৯৮০-এর দশক থেকে সংগঠিত শ্রম আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পতনের ফলে ভোটারদের জন্য লেবার পার্টি ত্যাগ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
দলটির আর সেই গভীর সামাজিক আনুগত্যের ওপর ভর করে কঠিন সময় পার করার সুযোগ নেই। ফলে নতুন কোনো নেতা স্টারমারকে সরিয়ে দিলেও পরে হয়তো তিনি আবিষ্কার করবেন যে, যে সামাজিক ভিত্তির ওপর এক শতাব্দী ধরে লেবারের সংগঠন দাঁড়িয়ে ছিল, তা স্থায়ীভাবেই ভেঙে পড়েছে। -টম ব্ল্যাকবার্ন, ম্যানচেস্টারের একজন লেখক। তিনি নিউ সোশ্যালিস্টের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সম্পাদক এবং দ্য গার্ডিয়ান, ট্রিবিউন ও জ্যাকোবিনসহ বিভিন্ন প্রকাশনায় লিখেছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button