ইরান যুদ্ধ গালফ অঞ্চলের জন্য এক অগ্নি পরীক্ষা

মধ্যপ্রাচ্য যখন একটি বৃহত্তর সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন প্রতিদিনের শিরোনাম ও আলোচনা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে হয়, যা তাৎক্ষণিক ভয়াবহতা তুলে ধরে কিন্তু তা একটি গভীর বাস্তবতাকে আড়াল করে। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা কেবল কয়েক দশকের পুরোনো আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের আরেকটি অধ্যায় নয়। এটি পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা, এমনকি জাতিসংঘ সনদের জন্যও। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও বেশি অস্তিত্বগত গুরুত্ব বহন করে।
এই সংঘাতের মূল সমস্যা শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নয়, বরং একটি কৌশলগত সুযোগ হারানো, যেখানে অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক অবকাঠামো, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির স্থায়ী কেন্দ্রে রূপান্তরের ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও ব্যবস্থার সংকট:
ইরান যখন পাল্টা হামলা চালায়, তখন জাতিসংঘে তাদের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বলেন, এটি আসলে জাতিসংঘ সনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া।
তার বক্তব্যে যুক্তি ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত জাতিসংঘ সনদের মূল ভিত্তি হলো, কোনো দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ।
যখন একটি দেশ অন্য দেশের কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা করে তখন তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল কাঠামোকেই ভেঙে দেয়।যেমন ২০২৪ সালে সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলের হামলা।
নিয়মহীন বিশ্বের আশঙ্কা:
আজ আমরা শুধু নিয়ম ভাঙার ঘটনা দেখছি না, বরং প্রশ্ন উঠছে—এই নিয়মগুলো আদৌ কার্যকর আছে কি না।
একটি নিয়মহীন বিশ্বে শক্তিশালীরা যা খুশি করতে পারে, আর দুর্বলদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। গালফ দেশগুলো দুর্বল নয়, কিন্তু তারা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
গালফ অঞ্চলের পরিবর্তন ও ঝুঁকি:
গত এক দশকে গালফ অঞ্চলে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। দুবাই, রিয়াদ এবং দোহা নিজেদের শুধু তেলনির্ভর অর্থনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলেছে।
মাইক্রোসফট, অ্যামাজনসহ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে—কারণ তারা স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এই বিনিয়োগকে হুমকির মুখে ফেলছে। ডাটা সেন্টার, সরবরাহ চেইন এবং বিনিয়োগ, সবই নির্ভর করে স্থিতিশীলতার ওপর। যুদ্ধ চললে বিনিয়োগকারীরা অন্যত্র চলে যাবে।
সংঘাতের নতুন কৌশল:
এই সংঘাত এখন শুধু সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং “ধীরে ধীরে ক্ষয় করার কৌশল”। ইরান দেখিয়েছে—ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইবার হামলার মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষের খরচ বাড়াতে পারে। প্রতিটি হামলা বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি বার্তা দেয়, এই অঞ্চল আর নিরাপদ নয়।
মার্কিন জোট,নিরাপত্তা না ঝুঁকি?
দশকের পর দশক গালফ দেশগুলোর নিরাপত্তা নির্ভর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।
কিন্তু এখন সেই জোটই ঝুঁকির কারণহয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের বার্তা পরিষ্কার: আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্রয় দেন, তবে তাদের ঝুঁকিও আপনাকে নিতে হবে।
সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে:
গালফ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং নিজেদের অর্থনীতি রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন তারা এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের তৈরি নয়। এখনই সময় এই সংঘাত বন্ধ করার, কারণ এই সুযোগ চিরকাল থাকবে না।
এই সংঘাত বন্ধ করা শুধু শান্তির বিষয় নয়, এটি অর্থনীতির প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ এবং উন্নয়নের প্রশ্ন। গালফ দেশগুলো তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে তা সম্ভব নয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ, যেখানে কেউ জেতে না, কিন্তু গালফ হারায় তার ভবিষ্যৎ। সময় এখনই, সংঘাত কমানোর। কারণ একবার সুযোগের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে, আর তা খোলা সম্ভব হবে না। -নেলসন ওয়ং, সাংহাইভিত্তিক অলাভজনক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Shanghai Centre for RimPac Strategic and International Studies-এর প্রেসিডেন্ট এবং মস্কোভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক Valdai Discussion Club-এর একজন সক্রিয় সদস্য। তিনি ACN Worldwide নামে একটি বৈশ্বিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরামর্শ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং নাসডাকে তালিকাভুক্ত দুটি পাবলিক কোম্পানির স্বাধীন পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button