ইরানের জন্য আরেকটি হামলা হবে ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’
ইরান এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে তেহরান এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে—যার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চারপাশে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। অতিরিক্ত নৌবহর, যুদ্ধবিমান এবং সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। এটি সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সামরিক উপস্থিতি, যা সম্ভাব্য সংঘর্ষের প্রস্তুতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তেহরান এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’-ভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করেছে।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল “উপর থেকে সরকার ভেঙে ফেলা, নিচ থেকে গণ-অভ্যুত্থান”—এই কৌশলের ভিত্তিতে একটি নাটকীয় সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাকারীরা ধারণা করেছিলেন, ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও পারমাণবিক কর্মকর্তাদের হত্যা করলে জনগণ সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমে আসবে।
তারা আরও মনে করেছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করলে পাল্টা হামলা ঠেকানো যাবে এবং দ্রুত পতনের পথ খুলবে। জুনের ওই হামলায় ইরানের বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হলেও জনগণ মূলত সরকারের পাশেই দাঁড়ায়।
এর জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানে। বিশ্লেষকরা এখন একমত যে, এই দুই কারণেই ২০২৫ সালের সেই অভিযান ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে ট্রাম্প ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন, যা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারে। এরপর একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করা।
তবে ২০২৫ সালের শেষদিকে অর্থনৈতিক সংকট নতুন করে বিক্ষোভের জন্ম দেয়। তেহরানের ব্যবসায়ীরা রিয়ালের অবমূল্যায়ন ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। অল্প সময়েই এই আন্দোলন অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলন ছিনতাইয়ের চেষ্টা
এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘প্ল্যান বি’ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে—যার সারকথা, “নিচ থেকে গণ-অভ্যুত্থান, ওপর থেকে সামরিক আক্রমণ”।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল-সম্পৃক্ত নেটওয়ার্কগুলো বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতা, নাশকতা ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালায়, যাতে সংঘর্ষ ও প্রাণহানি বাড়ে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রাণহানি আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত এই কৌশল ব্যর্থ হয়। সহিংস অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হলে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে লক্ষাধিক মানুষ সরকার আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেয়, যা বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করে। নিরাপত্তা বাহিনী অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়, বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ থেকে পিছু হটে।
পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের লক্ষ্য হতে পারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দেওয়া—যা ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরানোর সময় এসেছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইরানের শাসনব্যবস্থাকে নাৎসিদের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, “এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, “আমাদের মহান নেতার ওপর হামলা মানে পুরো ইরানি জাতির সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধ।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসরায়েলপন্থীরা পরামর্শ দিচ্ছে, পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের বদলে ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল টার্মিনাল দখল করা হোক—যেখান থেকে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়—যাতে অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে পঙ্গু করা যায়।
অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি:
ভবিষ্যতে ইরানের গতিপথ নির্ধারণ করবে কয়েকটি বিষয়। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক সংহতি। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সামাজিক বিভাজনই জনঅসন্তোষের মূল কারণ।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের শাসন পরিবর্তনের চাপ। ট্রাম্পের প্রকাশ্য আহ্বান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক ভয়াবহ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা। সৌদি আরব, মিসর, ওমান ও কাতার ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে—আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কায়।
চতুর্থত, ইরানের রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসে যোগ দিয়ে তেহরান পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় নতুন ভূরাজনৈতিক জোট গড়ে তুলছে—যা ইরানের ‘পূর্বমুখী নীতি’র বড় পরীক্ষা।
সবশেষে, ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর মিত্ররা হুঁশিয়ারি দিয়েছে—ইরানে হামলা হলে তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে। হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের কাতায়েব হিজবুল্লাহ প্রকাশ্যে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে।
এটি ইঙ্গিত দেয়, ইরানে হামলা হলে তা আর সীমিত থাকবে না; পুরো অঞ্চল জুড়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। কিছু মার্কিন ও ইউরোপীয় বিশ্লেষক আমাকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
এ মুহূর্তটি এক ধরনের “রক্তাক্ত বিরতি”—যার পর ঘটতে পারে আঞ্চলিক বিস্ফোরণ। ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আরেকটি হামলা হবে একটি ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’, যা সব ধরনের সংযমের অবসান ঘটাবে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে সংঘর্ষ ডেকে আনবে।
এই বিপর্যয় এড়াতে হলে ট্রাম্পকে ‘আত্মসমর্পণ-নির্ভর কৌশল’ পরিত্যাগ করে একটি সম্মানরক্ষাকারী, বিস্তৃত চুক্তির পথে এগোতে হবে—যাতে ৪৭ বছরের সংঘাতের অবসান ঘটে এবং অঞ্চলটি অনিবার্য যুদ্ধের দিকে ধাবিত না হয়। -সাইয়্যেদ হোসেইন মুসাভিয়ান, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং রিসার্চ কোলাবরেটর এবং ইরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ও ফরেন রিলেশনস কমিটির সাবেক প্রধান। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে Iran and the United States: An Insider’s View on the Failed Past and the Road to Peace, যা ২০১৪ সালের মে মাসে ব্লুমসবারি থেকে প্রকাশিত হয়; A Middle East Free of Weapons of Mass Destruction, যা ২০২০ সালের মে মাসে রাউটলেজ থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বশেষ বই A New Structure for Security, Peace, and Cooperation in the Persian Gulf ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে রোম্যান অ্যান্ড লিটলফিল্ড পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



