গাজায় আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যু, গ্রীনল্যান্ডে শোক কেনো?
গত কয়েক মাস ধরে বহু মানুষ সতর্ক করে আসছিলেন যে, গাজায় ইসরায়েলের লাগামহীন হামলা শুধু ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ নয় বরং আন্তর্জাতিক আইনের ধারণার ওপর এক মারাত্মক আঘাত।
এখানে শুধু ইসরায়েলি সহিংসতার মাত্রাই শুধু পরীক্ষা হচ্ছিল না, পরীক্ষা হচ্ছিল আদৌ কোনো নিয়ম কার্যকর আছে কি না। ক্ষমতা কি এখনও আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, নাকি আইন পুরোপুরি সরে গিয়ে নগ্ন বলপ্রয়োগই শেষ কথা হয়ে উঠেছে। এই সতর্কবার্তাগুলোকে বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো বাড়াবাড়ি ছিল না। এই ঝুঁকির বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, বিশ্বের সামনে থাকা সিদ্ধান্তটি ছিল নির্দয় ও অনিবার্য। হয় যুদ্ধ ঠেকাতে তৈরি আইনি নীতিগুলো রক্ষা করতে হবে, নতুবা লাগামহীন ক্ষমতার রাজনীতির ভারে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ধসে পড়তে দেখা যাবে।
গ্লোবাল সাউথের কোটি কোটি মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক আইন কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি একটি ঢাল। সেই ঢাল সরিয়ে দিলে কেবল শিকারিই টিকে থাকবে, পেত্রো সতর্ক করেছিলেন। তিনি ঠিকই বলেছিলেন : গাজা ছিল সূচনা। কোনো বিচ্যুতি বা সাময়িক ব্যর্থতা নয় বরং বহুদিন ধরে বেড়ে ওঠা এক মতাদর্শের সেই মুহূর্ত, যখন সব সংযম ঝরে পড়ল। সেখানে যা ঘটেছে, তা শুধু হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা নয়, বরং আইনকেই হত্যা—এবং তার সঙ্গে মানবজীবনের মূল্যকেও। দুই বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক আইনকে অর্থহীন করে দেওয়া হয়েছে। শিশু, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও রোগীদের দেহের পাশে পিষে ফেলা হয়েছে, যারা নিজেদের ঘর ও হাসপাতালে বোমাবর্ষণে নিহত হয়েছেন। মানবজীবনকে নামিয়ে আনা হয়েছে এক ধরনের বিরক্তিতে, বৈধতাকে এক বাধায়, নৈতিকতাকে এক উপদ্রবে।
নৃশংসতায় সহায়তা:
এ সবকিছু গোপনে হয়নি। সবকিছু ঘটেছে বিশ্বের চোখের সামনে। জার্মানি অস্ত্র জুগিয়েছে। ব্রিটেন যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। ফ্রান্স দ্বিধায় থেকেছে। অন্যরা “জটিলতা”র মোড়কে নীরবতা দিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব অপরাধ ঠেকানোর কথা ছিল, তারা হয় পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছে, নয়তো সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে। বিশ্ব নিজেকে বোঝাতে চেয়েছে যে, আইন ভেঙে পড়া ও মানবজীবনের অবমূল্যায়ন সীমাবদ্ধ রাখা যাবে, গাজাকে একটি ব্যতিক্রম হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে, যার কোনো পরিণতি নেই। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।
ফিলিস্তিনিদের যখন নিয়মের নিচে পিষে ফেলা হচ্ছিল, তখন নিয়মগুলো ছিল অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু গ্রীনল্যান্ড বা ইউরোপ নিজেই যখন ঝুঁকিতে পড়ল, তখন সেগুলো আবার পবিত্র হয়ে উঠল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন গ্রীনল্যান্ড দখলের কথা বলেন, তখন জার্মানি ও ইউরোপ হঠাৎ আন্তর্জাতিক আইন আবিষ্কার করছে, এই দৃশ্যটি সত্যিই বিকৃত। যে সরকারগুলো গাজা ধ্বংস হওয়ার সময় মাসের পর মাস আইন ছিঁড়ে ফেলেছে, অস্ত্র সরবরাহ করেছে, জবাবদিহি নিষ্ক্রিয় করেছে, তারাই এখন সার্বভৌমত্ব, শৃঙ্খলা ও লাগামহীন ক্ষমতার বিপদের কথা বলছে। কারণ এসব এখন ইউরোপীয় সীমান্তে ঘটছে।
গণহত্যায় অস্ত্র জুগিয়ে, হাসপাতাল বোমায় ধ্বংস হতে দেখে, শিশুদের কবর দেওয়ার পরও কোনো পরিণতি না দেখে এখন তারা সীমান্ত উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত।
এটি আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দাঁড়ানো নয়। এটি এমন এক আইনের প্রতি নস্টালজিয়া, যা কেবল তাদেরই রক্ষা করত।
গাজাই সেই মুহূর্ত, যখন মার্কিন-সমর্থিত ক্ষমতা আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি আনুগত্যের ভানটুকুও ছেড়ে দিয়ে প্রকাশ্যে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আধিপত্য কায়েম করতে শুরু করল। আইন যখন বেছে বেছে প্রয়োগ হয়, তখন তা আর আইন থাকে না—তা হয়ে যায় অনুমতি। এবং সেই অনুমতি অন্যত্র প্রয়োগ হওয়া ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা।
আজ ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, তা কোনো উত্তেজনার বৃদ্ধি নয়; বরং তার বাস্তবায়ন। একটি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ ও একটি সার্বভৌম রাজধানীতে বোমাবর্ষণ হলো নগ্ন, নির্লজ্জ, এবং আইনের ভানহীন নতুন বৈশ্বিক রাজনীতির ঘোষণা।
নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ:
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকা ও গ্লোবাল সাউথে সহিংস হস্তক্ষেপ করেছে—অভ্যুত্থান, আগ্রাসন, নিষেধাজ্ঞা, প্রক্সি যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। ট্রাম্প যুগকে আলাদা করে যা চিহ্নিত করে, তা হস্তক্ষেপের সংখ্যা নয়, তার রূপ।
হস্তক্ষেপ আর ইউফেমিজমে ঢাকা নয়, প্রতিষ্ঠান দিয়ে ছাঁকা নয়। এটি ঘোষিত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নাটকীয় ও নির্লজ্জ।
আগের প্রশাসনগুলো ধ্বংসকে গণতন্ত্র বা মানবিকতার ভাষায় মোড়াত; ট্রাম্প সেই মুখোশ পুরোপুরি খুলে ফেলেছেন। নিয়ন্ত্রণ আর যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় না—তা জোর করে আরোপ করা হয়।
এটাই ট্রাম্পের বিকৃত মনরো নীতির ব্যবহারিক রূপ। যা একসময় অসৎভাবে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের বিরোধিতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল, তা এখন মার্কিন আধিপত্যের লাইসেন্সে পরিণত হয়েছে।
সমালোচকদের ভাষায় তথাকথিত “মনরো নীতি” এখন বোঝায় আরও নগ্ন কিছু: সহিংসভাবে হস্তক্ষেপ করার, সম্পদ দখল করার, কৌশলগত পথ নিয়ন্ত্রণ করার এবং শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাদ দেওয়ার অধিকার।
ভেনেজুয়েলা এই নীতির শেষ গন্তব্য নয়—এটি তার প্রদর্শনী। ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, এটি এখানেই থামবে না। কিউবা ও মেক্সিকো ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত।
কারাকাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া পরিকল্পনায় এটি সবচেয়ে স্পষ্ট। এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকালের জন্য ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করবে, রাজস্ব পরিচালনা করবে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত হিসাবে, এবং দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তা ব্যবহার করবে।
ভেনেজুয়েলা নিজ ইচ্ছায় বাণিজ্য করতেও পারবে না—যে দামেই হোক, অন্য কোথাও সস্তা বা ভালো বিকল্প থাকলেও, শুধু মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হবে। এটি সহায়তা নয়। এটি দখল।
এটি শূন্য থেকে আসেনি। ২০০৫ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চলছে, যা ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভয়াবহভাবে তীব্র হয় এবং কার্যত অবরোধে রূপ নেয়।
এর ফল ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং প্রায় ৮০ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি, যে দেশটির বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে। এই ধ্বংস দুর্ঘটনাজনিত ছিলো না। এটি ছিলো পরিকল্পিত। বর্তমান পরিকল্পনা সেই কৌশলের বিচ্যুতি নয়, বরং তার চূড়ান্ত রূপ।
আন্তর্জাতিক আইনের কবরস্থান:
ইরাকের সঙ্গে তুলনা এড়ানো অসম্ভব। সেখানেও নিষেধাজ্ঞাকে অস্ত্র বানানো হয়েছিল, মানবিক বিপর্যয়কে নীতিতে রূপ দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের “অয়েল-ফর-ফুড” কর্মসূচি নিজেই ছিল এমন নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া, যা অপুষ্টি ও রোগে পাঁচ লক্ষের বেশি শিশুকে হত্যা করেছিল।
ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত পরিকল্পনা আরও চরম। যাতে কোনো জাতিসংঘ নজরদারি নেই, কোনো বহুপাক্ষিক কাঠামো নেই, কোনো বাণিজ্য স্বাধীনতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র একাই তেল, রাজস্ব এবং বেঁচে থাকার শর্ত নিয়ন্ত্রণ করবে।
এমনকি উনবিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদীরাও দখলকে সভ্যতা ও অগ্রগতির ভাষায় ঢাকতো। ট্রাম্প সে বৈধতাও চান না। শক্তিই একমাত্র যুক্তি।
ইতিহাস আরও শেখায় যে বিদেশে রপ্তানি করা সাম্রাজ্যবাদী সহিংসতা অবশেষে ঘরে ফেরে। মিনিয়াপোলিসে আইস ‘আইস’ কর্মকর্তার গুলিতে রেনে নিকোল গুডের মৃত্যু এবং চিকিৎসা না দেওয়ার ঘটনা সেই মিথ ভেঙে দেয় যে এই ব্যবস্থা কেবল দূরের জনগণকেই লক্ষ্য করে।
অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি সামরিক চর্চার সঙ্গে এর মিল স্পষ্ট—যা বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগ, সম্পূর্ণ দায়মুক্তি, এবং ভয়ের মাধ্যমে আনুগত্য চাপিয়ে দেওয়া। মার্কিন ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী নজরদারি প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও দমন-পদ্ধতি ভাগ করে নেয়, যা দখল ও ঘরোয়া প্রয়োগের সীমা মুছে দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর যা পরীক্ষা করা হয়েছিল, তা এখন অন্যত্র স্বাভাবিক করা হচ্ছে। গাজা আন্তর্জাতিক আইনের কবরস্থান হয়ে উঠেছে। আর তা হয়েছে আইন দুর্বল ছিল বলে নয় বরং এটিকে পরিকল্পিতভাবে, প্রকাশ্যে ও কোনো পরিণতি ছাড়াই কবর দেওয়া হয়েছে বলে।
আন্তর্জাতিক আইন একেকটি তক্তা, একেকটি দেহের ওপর ভেঙে ফেলা হয়েছে। যারা আজ তাদের মৃত্যু নিয়ে বিলাপ করছে, তারাই এই ধ্বংসের স্থপতি। তারা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো, যে নিজের তৈরি দানবকে দেখে আতঙ্কিত হচ্ছে। -সৌমায়া ঘান্নুশি, একজন ব্রিটিশ–তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তার সাংবাদিকতামূলক লেখা দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, কোরিয়েরে দেলা সেরা, আলজাজিরা ডটনেট এবং আল কুদস–এ প্রকাশিত হয়েছে। তার নির্বাচিত লেখার একটি সংকলন পাওয়া যাবে soumayaghannoushi.com–এ এবং তিনি টুইট করেন @SMGhannoushi নামে।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



