গাজা বিলুপ্তির পথে: ‘বোর্ড অব পিস’ কি ট্রাম্পের দাবার বোর্ড!

গাজা পুনর্গঠনের তত্ত্বাবধানের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ শুরু থেকেই নানা অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিল। শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দেন যে, কার্যত এটি হবে তাঁর নেতৃত্বাধীন একটি কাঠামো, যা নির্বাচিত কর্পোরেট তত্ত্বাবধায়কদের একটি দল, যারা ‘দ্য ডোনাল্ড’-এর ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার তহবিলের জন্য জমি প্রস্তুত করবে। এই মনোনীত ব্যক্তিদের ওপর আপাতদৃষ্টিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত, ধুলা ও ধ্বংসে ভরা ভূখণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করার—যে ভূখণ্ডে অসংখ্য নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীসের জন্য?
গাজা নিয়ন্ত্রণের যে কাঠামো কল্পনা করা হয়েছে, তা ট্রাম্পের গাজা বিষয়ক ২০ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তথাকথিত শান্তি প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপের সূচনা। ইতোমধ্যেই স্পষ্ট যে এই বোর্ডটি মূলত ধনকুবের ও ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভকে ‘হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। একটি গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড কাজ করবে হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের দপ্তর এবং একটি কার্যত গুরুত্বহীন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক সংস্থা—’ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’র (এনসিএজি) সঙ্গে।
হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এনসিএজিএ’র নেতৃত্ব দেবেন টেকনোক্র্যাট আলি শা’আথ, যিনি আগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব হবে মৌলিক জনসেবা পুনরুদ্ধার, বেসামরিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং “গাজায় দৈনন্দিন জীবনের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি, স্বনির্ভর শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন।”
এই নাটক কীভাবে চলবে, তা আগেই অনুমান করা যায়। সেখানে থাকবেন ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যশীল ব্যক্তিরা—যেমন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থবিত্তশালী ব্যক্তিত্ব ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ; পারিবারিক সংযোগ হিসেবে জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে ভণ্ডামি ও ভুল বিচারের প্রতীক, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
বোর্ড অব পিস-এর সনদপত্র, যার কপি বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণসহ পাঠানো হয়েছে। এত বলা হয়েছে, বোর্ডের স্থায়ী আসনের জন্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ফি দিতে হবে। যারা এই অর্থ দিতে আগ্রহী নয়, তারা তিন বছরের জন্য সদস্য হতে পারবে। নথিটি আরও উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে, এতে কী নেই, তা বিকৃত হয়েছে। এতে ‘গাজা’ শব্দটিই নেই, জাতিসংঘের কথাও নেই। বরং এতে বলা হয়েছে, “আরও চটপটে ও কার্যকর একটি আন্তর্জাতিক শান্তি-নির্মাণ সংস্থা”-র প্রয়োজন, যা স্পষ্টতই জাতিসংঘের প্রতি এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক আঘাত। যে সংস্থার কথিত অকার্যকারিতা বাড়িয়ে তুলতে ট্রাম্প নিজেই বড় ভূমিকা রেখেছেন।
শান্তিকে স্থায়ী করতে হলে “যেসব প্রতিষ্ঠান বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সেখান থেকে সরে আসার সাহস” প্রয়োজন, এমন মন্তব্যও রয়েছে। কিন্তু কেন এসব প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়, সে প্রশ্ন তোলা হয়নি। বিষয়টি অনেকটা সেই অগ্নিসংযোগকারীর মতো, যে নিজেই আগুন লাগিয়ে পরে তা নেভাতে আসে।
এই কাঠামোগুলো পুরোপুরি গড়ে ওঠার আগেই সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলকে সন্তুষ্ট রাখার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত এই উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের অবদমিত অবস্থায় আটকে রাখা। তা সত্ত্বেও, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু খুশি হননি যখন জানতে পারেন যে তুরস্ক ও কাতারও গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে ভূমিকা পাবে। তাঁর আশঙ্কা, তারা এই ‘থালায়’ গোলমাল পাকাতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, “বোর্ড অব পিস-এর অধীন গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডের গঠনসংক্রান্ত ঘোষণা ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই দেওয়া হয়েছে এবং এটি ইসরায়েলের নীতির পরিপন্থী।”
১৯ জানুয়ারি নেসেটের উত্তপ্ত অধিবেশনে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, আঙ্কারা বা দোহা কোনো সামরিক ভূমিকা পালন করবে না: “তুর্কি বা কাতারি সেনারা গাজায় থাকবে না।” বাস্তবে এই বক্তব্য কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক, কারণ কাতারের এমন কোনো সামরিক সক্ষমতাই নেই। তিনি আরও দাবি করেন, এই দুই দেশকে কোনো কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হবে না, যদিও ট্রাম্প তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ বিষয়ে মতবিরোধ সত্ত্বেও নেতানিয়াহু দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি পারদর্শী। তাঁর ভাষায়, “ইসরায়েলের মৌলিক স্বার্থের প্রশ্নে আমরা তর্ক করতে পারি, অবস্থান স্পষ্ট করতে পারি এবং প্রয়োজনে সমঝোতাতেও পৌঁছাতে পারি।”
তবে এতে বিরোধীদলীয় নেতা ও ইয়েশ আতিদ দলের প্রধান ইয়াইর লাপিদ সন্তুষ্ট হননি। অধিকাংশ ইসরায়েলি রাজনীতিকের মতো তাঁর কাছেও গাজায় ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌম আচরণের ধারণা অগ্রহণযোগ্য। তাঁর অভিযোগ, হামাসের মিত্রদের “গাজা পরিচালনার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে”, আর ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির মূল শক্তি হলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
এর অর্থ দুটি হতে পারে, যেমন-নেতানিয়াহু গোপনে তুরস্ক, কাতার ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের গাজায় ভূমিকার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন, অথবা তিনি বিষয়টি জানতেনই না। সেক্ষেত্রে “ট্রাম্প আপনার ব্যাপারে একেবারেই তোয়াক্কা করেন না।” তাঁর মতে, ইসরায়েল “গাজায় ফিরছে, তবে শুরুর জায়গায় নয়—বরং আরও খারাপ অবস্থানে।”
যাঁরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ জাতিসংঘকে সরিয়ে দেওয়ার বা প্রান্তিক করার চেষ্টা, তাঁদের আবারো ভাবা উচিত। এক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য বলেই মনে হচ্ছে। এই বোর্ডটি যেন অপেশাদার শিল্পীদের তৈরি মোমের মূর্তি, যা তাপ লাগলেই গলে যাবে। এখানে থাকবে অন্তর্দ্বন্দ্ব কিন্তু কোনো স্থায়িত্ব নয়। এটি এমন একটি প্রকল্প, যা প্রতিষ্ঠানের কথা বলে না বরং একজন ব্যক্তির খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই ব্যক্তি বিদায় নিলে প্রকল্পটিও মরে যাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, এর কেন্দ্রে রয়েছে আত্মমুগ্ধতা, যা শেষ পর্যন্ত নিজেই ধ্বংস হবে। বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষাও কি একই পরিণতির শিকার হবে? -ড. বিনয় ক্যাম্পমার্ক, সেলউইন কলেজ, কেমব্রিজে কমনওয়েলথ স্কলার ছিলেন। বর্তমানে তিনি RMIT বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button