জার্মানির বিরুদ্ধে গাজা নিয়ে ইহুদী গবেষণা সংস্থার গুরুতর অভিযোগ

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর দ্য প্রিভেনশন অব জেনোসাইড’ সম্প্রতি জার্মানির তীব্র সমালোচনা করেছে। ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা “জার্মানির বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী সিভিল সোসাইটি সংগঠনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টাকে নিন্দা জানাচ্ছে, যারা গাজায় চলমান গণহত্যাকে অস্বীকার করছে এবং জার্মান রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তিকর ও গণহত্যা-অস্বীকারমূলক বয়ান ছড়িয়ে দিচ্ছে।”
একই সঙ্গে ইনস্টিটিউটটি জার্মানির প্রধান গণমাধ্যম করপোরেশনগুলোকেও এই মর্মে অভিযুক্ত করেছে যে, তারা যেনো “ইসরায়েলি সরকারের সবচেয়ে অনুগত মুখপাত্রে” পরিণত হয়েছে। জার্মান নীতিনির্ধারকদেরও সমালোচনা করা হয়েছে এই অভিযোগে যে তারা “আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থার” দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যে ব্যবস্থা “মূলত সেই ভয়াবহতার ফলেই গড়ে উঠেছিল এবং জার্মানিই একসময় যা সৃষ্টি করেছিল।”
এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে নাৎসি অপরাধগুলোর দিকে, ইউরোপীয় ইহুদিদের বিরুদ্ধে হলোকাস্ট, সিনতি ও রোমা জনগোষ্ঠীর গণহত্যা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পরিচালিত ধ্বংসযুদ্ধের প্রতি।
গাজা গণহত্যার প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকার:
লেমকিন ইনস্টিটিউট অভিযোগ করেছে, ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে অন্তত দুই বছর ধরে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল একটি গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, জার্মানিতে এখনো এই বাস্তবতা অস্বীকার করা হচ্ছে। এই সমালোচনা শুধু ক্ষমতাসীন দল ও শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং জার্মানির প্রধান গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধেও।
বিবৃতিতে বলা হয়: “জার্মানির সবচেয়ে বড় গণমাধ্যমগুলো তাদের সাংবাদিকতার দায়িত্ব পরিত্যাগ করেছে, সমালোচনামূলক কণ্ঠকে হুমকি দিচ্ছে এবং কার্যত ইসরায়েলি সরকারের সবচেয়ে অনুগত মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যা-অস্বীকারের পেছনে রয়েছে ওপর থেকে আসা রাজনৈতিক চাপ, পাশাপাশি ইসরায়েলি লবিং ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা।
এসব প্রচারণার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইউরোপিয়ান লিডারশিপ নেটওয়ার্ক (ইএলএনইটি)-এর অন্তর্ভুক্ত ফোরাম অব স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ (এফএসডি)-সহ মিডল ইস্ট পিস ফোরাম (এনএএফএফও), ইউরোপ ইসরায়েল প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (ইআইপিএ), জার্মান–ইসরায়েল সোসাইটির (ডিআইজি) বিষয়টি।
প্রতিবেদনটি বলছে: “এই সহাবস্থানে এই সংগঠনগুলো এমন ছদ্ম-যুক্তি সরবরাহ করে, যার ওপর ভর করে জার্মান রাজনীতিকরা এক অগ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক অবস্থানকে বৈধতা দেন। বিনিময়ে এসব সংগঠন পায় সরকারি অর্থায়ন কিংবা সংসদে বিশেষ প্রবেশাধিকার। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে হেয় করা, প্রতিষ্ঠিত আইনি মানদণ্ড উপেক্ষা করা এবং গণহত্যা অস্বীকারে লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে জার্মানি এমন এক আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, যা গড়ে উঠেছিল মূলত তার নিজের সৃষ্ট ভয়াবহতার প্রতিক্রিয়ায়।”
“আর কখনো নয়”—কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য ব্যতিক্রম: নৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন:
রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনের আহ্বান প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, বর্তমানে ইসরায়েল ও জার্মানি উভয় দেশই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সামনে রয়েছে: ইসরায়েল অভিযুক্ত গণহত্যার দায়ে, আর জার্মানি অভিযুক্ত সম্ভাব্য সহযোগিতার কারণে। বিশেষ করে জার্মানির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ দেশটির অভ্যন্তরীণ জনআলোচনায় প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। এই প্রেক্ষাপটে লেমকিন ইনস্টিটিউট জার্মান রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়ে বলেছে: “গণহত্যা-অস্বীকারমূলক প্রচারণাকে তথাকথিত ‘বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ’ হিসেবে উপস্থাপন করে যে অর্থায়ন, প্রচার ও বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়: “আমরা জার্মান সরকারকে আহ্বান জানাই—যেসব সংগঠন ও উদ্যোগ গণহত্যা অস্বীকার এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে হেয় করার সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রতি সব ধরনের সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করতে এবং সংসদে তাদের বিশেষ প্রবেশাধিকার বাতিল করতে। আমরা জার্মানি ও তার সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি গণহত্যা কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, এবং যেকোনো ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করার দায়িত্ব সম্পর্কে।” সবশেষে বলা হয়: “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, আমরা জার্মান রাষ্ট্রকে আহ্বান জানাই—ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যায় তার সহযোগিতা বন্ধ করতে, যার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র রপ্তানি এবং গণহত্যাকারী রাষ্ট্রকে দেওয়া নিঃশর্ত কূটনৈতিক সমর্থন।”
লেমকিন ইনস্টিটিউট যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)। প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে রাফায়েল লেমকিনের নামে। তিনি একজন পোলিশ-ইহুদি আইনবিদ ও হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, যিনি প্রথম ‘জেনোসাইড’ বা ‘গণহত্যা’ শব্দটি প্রবর্তন করেন।
ইনস্টিটিউটটির লক্ষ্য হলো—“গণহত্যা প্রতিরোধের উপকরণগুলোর সঙ্গে বৈশ্বিক তৃণমূল আন্দোলনকে যুক্ত করা।” ২০২৪ সালের এপ্রিলেই লেমকিন ইনস্টিটিউট ঘোষণা করেছিল যে, ইসরায়েলের বর্তমান গণহত্যা এটি পুরো ফিলিস্তিনজুড়ে, শুধু গাজা উপত্যকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। -লিওন উইস্ট্রিখোস্কি, জার্মানির একজন সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ, মধ্যপ্রাচ্য–বিশেষজ্ঞ ও ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button