ইরানের বিক্ষোভ কোনো আকস্মিক পতনের ইঙ্গিত নয়, কাঠামোগত সংকটের প্রকাশ

দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্লেষণে ইরানের বিক্ষোভকে শাসনব্যবস্থার পতনের কাউন্টডাউন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি অস্থিরতার ঢেউকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, আর প্রতিটি বিক্ষোভকে ধরা হয় এই প্রমাণ হিসেবে যে, ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর এই বয়ান আবারও ফিরে এসেছে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণগতভাবে অলস এবং রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। আজ ইরান যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তা কোনো আকস্মিক বিপ্লবী ভাঙন নয় বরং এটি তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত শক্তির ফলে সৃষ্ট একটি কাঠামোগত সংকট। সেগুলো হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামাজিক পুনর্বিন্যাস এবং ক্রমশ জোরালো হলেও ক্লান্ত রাষ্ট্রযন্ত্র।
দ্য ফ্রি প্রেস-এ মাইকেল ডোরান এই বলে যুক্তি দেন যে, শাসনব্যবস্থা রাতারাতি ধসে পড়ছে না বরং গভীর অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে শাসন করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে হারাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি “পতন-কেন্দ্রিক” বয়ানগুলো নিয়মিত উপেক্ষা করে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: অস্তিত্বের রাজনীতি:
প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ণায়ক উপাদান হলো অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এটি কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার অবমূল্যায়ন নয় বরং দৈনন্দিন বেঁচে থাকাকে একটি রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপান্তরিত হওয়া। যখন খাদ্য, বাসস্থান এবং মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা ভেঙে পড়ে, তখন ভিন্নমত আর আদর্শগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে অস্তিত্বগত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট এখন মধ্যবিত্ত এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও গ্রাস করেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থার নীরব স্থিতিশীলতাকারী হিসেবে বিবেচিত ছিল।
ইরানি অর্থনীতিবিদ জাভাদ সালেহি-ইসফাহানি বহু আগে সতর্ক করেছিলেন যে, অর্থনৈতিক সংকট তখনই রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যখন তা শাসনব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বণ্টনমূলক সমঝোতাকে ক্ষয় করে। ঐতিহাসিকভাবে বাস্তববাদী ও ঝুঁকি-এড়ানো তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের অংশগ্রহণ এই ভাঙনের স্পষ্ট প্রমাণ। যে রাষ্ট্র বস্তুগত স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে জোর প্রয়োগের ক্ষমতা হারানোর অনেক আগেই বৈধতা হারায়।
সামাজিক পুনর্বিন্যাস: আদর্শিক মোহহীনতা:
দ্বিতীয় উপাদানটি হলো আদর্শিক মোহহীন সামাজিক পুনর্বিন্যাস। বিক্ষোভগুলো বিস্তৃত, বিকেন্দ্রীভূত এবং নেতৃত্বহীন, এটি কোনো রাজনৈতিক অপরিপক্বতার লক্ষণ নয় বরং আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক মধ্যস্থতার ওপর আস্থাহীনতার প্রতিফলন। এটি এমন কোনো আন্দোলন নয় যা ব্যবস্থার ভেতরে সংস্কার চায়; বরং এটি এমন এক সমাজ, যা আর বিশ্বাসযোগ্য মনে না হওয়া একটি ব্যবস্থার ওপর থেকে সম্মতি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
ভালি নাসর যেমনটি পর্যবেক্ষণ করেছেন, সমসাময়িক ইরানি গণআন্দোলন উল্লম্ব নয় বরং অনুভূমিক, যা দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সহনশীল, কিন্তু দ্রুত রাজনৈতিক সংহতির প্রতি অনাগ্রহী। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা প্রায়ই একে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। বাস্তবে, এটি আরও গভীর কিছুর ইঙ্গিত দেয়। তা হচ্ছে বিপ্লবী রোমান্টিসিজম নয়, বরং কাঠামোগত সংশয়।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া: সহনশীলতার সীমা:
তৃতীয় উপাদান হচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। এটা কর্তৃত্ববাদী স্থিতিস্থাপকতার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করে। ইন্টারনেট বন্ধ, ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং সামরিকীকরণকৃত পুলিশিং আত্মবিশ্বাস নয়, বরং ভয়কে প্রকাশ করে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে দমন-পীড়ন, পুনর্বণ্টন এবং আদর্শিক প্রেরণার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। আজ অর্থনৈতিক ক্লান্তি এই তিনটির মধ্যে দুটিকে ফাঁপা করে দিয়েছে, ফলে জোর প্রয়োগই শাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
কিন্তু দমন-পীড়ন বৈধতা ফিরিয়ে আনে না, এটি কেবল হিসাবের দিন পিছিয়ে দেয়। স্টিভেন হেইডেম্যান দেখিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি চাপে থাকা শাসনগুলো প্রায়ই কাঠামোগত সংকট সমাধানের বদলে বিরোধীদের বিভক্ত করে এবং দায় বাইরে ঠেলে দিয়ে টিকে থাকে। তবে টিকে থাকাকে স্থিতিশীলতা বলে ভুল করা উচিত নয়।
আঞ্চলিক প্রভাব: সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল বোঝাবুঝি:
এখানেই আঞ্চলিক প্রভাবগুলো অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং এখানেই প্রচলিত বয়ান সবচেয়ে বেপরোয়া। যদি ইরান না ধসে পড়ে, পুনরুদ্ধার না হয়ে বরং দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ ক্লান্তিতে আটকে থাকে—তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব কী হবে? দুর্বল ইরান কি আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা থেকে সরে যাবে, নাকি অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা ঢাকতে সীমিত কিন্তু তীব্র বহির্মুখী তৎপরতায় যাবে? আর যদি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে কৌশলগত দুর্বলতা ভেবে ভুল ব্যাখ্যা করে, তবে কী হবে?
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম হানিয়েহ সতর্ক করেছেন যে, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ক্লান্তিতে থাকা রাষ্ট্রগুলো সচরাচর আঞ্চলিক ক্ষেত্র থেকে গুছিয়ে সরে যায় না। বরং সীমিত ক্ষমতা অনেক সময় আরও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ জন্ম দেয়, কারণ রাষ্ট্রগুলো কম সম্পদ দিয়ে প্রতিরোধ ও প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে চায়। এ কারণেই ইরানের কাঠামোগত সংকট শূন্যতা নয়, বরং অস্থিরতা তৈরি করার সম্ভাবনাই বেশি। অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি শক্তি প্রক্ষেপণ সীমিত করে, কিন্তু অনিরাপত্তা স্বল্পমেয়াদি উত্তেজনা বাড়াতে প্রণোদিত করে। অঞ্চলের জন্য প্রকৃত বিপদ ইরানের পতনে নয়, বরং ক্লান্তি থেকে জন্ম নেওয়া ভুল হিসাব-নিকাশে।
অস্বস্তিকর বাস্তবতা:
এতে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে: মধ্যপ্রাচ্য কি এমন একটি ইরানের জন্য প্রস্তুত, যা দুর্বল কিন্তু অক্ষত? যে রাষ্ট্র জোর প্রয়োগের ক্ষমতা ধরে রেখেছে, কিন্তু শাসন করার বৈধতা হারিয়েছে। সে শৃঙ্খলা তৈরি করে না বরং সংঘাত সৃষ্টি করে। উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির জন্য ইরানি বিক্ষোভকে চাপ প্রয়োগ বা শাসন পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখা সেই অস্থিরতাকেই বাড়িয়ে দিতে পারে, যাকে তারা প্রকাশ্যে ভয় বলে দাবি করে।
ইরানের বাইরে: আঞ্চলিক সংকটের প্রতিচ্ছবি:
ইরানের বাইরেও, এই বিক্ষোভগুলো একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সত্য উন্মোচন করে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দমন-পীড়ন, পৃষ্ঠপোষকতা ও বাহ্যিক ভাড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শাসন মডেলগুলো তাদের অর্থনৈতিক সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। লেবানন থেকে মিসর, ইরাক থেকে তিউনিসিয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আদর্শগত বিরোধিতার চেয়েও বেশি ক্ষয়কারী প্রমাণিত হয়েছে। ইরান কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটি একটি অগ্রসর উদাহরণ।
যখন টিকে থাকার প্রশ্নটি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, তখন কর্তৃত্ববাদী স্থায়িত্ব কোনো সুশৃঙ্খল রূপান্তরে নয় বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় রূপ নেয়।
উপসংহার:
অতএব, ইরানের বিক্ষোভ কোনো পতনের ঘোষণা নয়‌ বরং এটি ক্লান্তির ঘোষণা। এটি এমন একটি শাসন-ক্ষমতার ধীর ক্ষয়কে চিহ্নিত করে, যা আর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক অর্থ দিতে পারছে না। এই অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি ইরানের কবে পতন হবে তা নয় বরং মধ্যপ্রাচ্য কতদিন এমন রাষ্ট্রগুলোর তৈরি অস্থিরতা সহ্য করতে পারবে, যারা আর কার্যকরভাবে শাসন করতে পারে না, তবুও ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকার করে।
ইরানের বিক্ষোভ মুক্তি বা পতনের বার্তা নয় বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য আরও অস্বস্তিকর এক বাস্তবতা উন্মোচন করে। তা হচ্ছে, একটি অঞ্চল, যেখানে রাষ্ট্রগুলো এখনো জোর প্রয়োগ করতে পারে। যদিও শাসন করতে পারে না, তবু ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নয়। ফলে অস্থিরতা হয়ে ওঠে কোনো রূপান্তর নয় বরং স্থায়ী অবস্থা। -একো এর্নাদা, ইন্দোনেশিয়ার ইউনিভার্সিটাস জেম্বার (ইউএনইজে)–এ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে একজন প্রভাষক। তিনি নাহদলাতুল উলামা ইন্দোনেশিয়ার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সংস্থার বোর্ড সদস্য।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button