ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর “গৌরব” শেষের পথে

যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন যে ইসরায়েলের “ইমেজ উন্নয়নে” ঢালা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তাকে ও বসতি-উপনিবেশবাদী শাসনব্যবস্থাকে নেতিবাচক প্রচার থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু তার হতাশার বিষয় হলো, একটি নতুন “ক্ষেপণাস্ত্র” সেই কল্পকাহিনি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসে সাম্প্রতিক সফর শেষে ফিরে এসে দেখা গেল, পলাতক নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক নিন্দা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার বৃথা চেষ্টা বাস্তবায়িত হয়নি, যেখানে তিনি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বকে আরও অস্থিতিশীল করার নতুন ষড়যন্ত্র এঁটেছিলেন।
লুণ্ঠন, মৃত্যু ও ধ্বংসের নকশাকারী হিসেবে উভয় নেতার ভয়াবহ রেকর্ড রয়েছে জনসমক্ষে, যা অর্থ কিংবা ভুয়া খবর দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলজুড়ে দুর্নীতি ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তাদের অশুভ পরিকল্পনা এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক জনগণ এর পরিণতি বুঝবে না, এই ধারণা যেমন নির্বোধ, তেমনি আত্মঘাতী।
তাদের বোকামি স্পষ্ট হয়েছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মিথ্যা অভিযোগে অবৈধভাবে অপহরণ, তার সরকার উৎখাতের চেষ্টা এবং দেশটির খনিজ সম্পদ ও তেল প্রকাশ্যভাবে লুট করার ঘটনায়। ট্রাম্পের লোভের কোনো সীমা নেই। ডেনমার্কের সতর্কবার্তা হচ্ছে, এতে ন্যাটো জোট ভেঙে পড়তে পারে। এই বার্তা উপেক্ষা করে সামরিক শক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড দখলের লক্ষ্য তার কাছে বাস্তবায়নের পথেই আছে বলে মনে হচ্ছে।
তার ও তার ‘মাগা’ ঘরানার গুণ্ডা অনুসারীদের কাছে আর্কটিক অঞ্চলের খনিজসমৃদ্ধ, স্বশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ডটি সম্পদ ও মর্যাদার প্রতীক। এটিকে “জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার” বলে উপস্থাপন করা নিছকই একটি ছলচাতুরি।
জায়নিস্ট হাসবারা শুধু ফিলিস্তিন দখলদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প ও তার প্রচারযন্ত্রও এটি গ্রহণ করেছে মিথ ও কল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে বয়ান তৈরির জন্য।
গাজা গণহত্যা নিয়ে তথাকথিত “অস্ত্রবিরতির” পর যে হাসবারা চালানো হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য বিশ্বকে অন্যদিকে তাকাতে বাধ্য করা—এমন ভান করা যে গণহত্যা শেষ হয়ে গেছে, অথচ বাস্তবে গণমৃত্যু চলছেই। এ প্রসঙ্গে গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি লেখক ইমান আবু জায়েদ মন্তব্য করেন: “আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে অস্ত্রবিরতির প্রকৃত লক্ষ্য সহিংসতা বা মৃত্যু থামানো নয়, মানুষকে রক্ষা করা নয় কিংবা রক্তপাত ও গণহত্যা সীমিত করাও নয়। প্রকৃত লক্ষ্য ছিল বিশ্বকে গাজার কথা বলা থেকে বিরত রাখা, সেখানে সংঘটিত অপরাধ ও মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া।”
নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর মরিয়া হয়ে প্রচেষ্টা বাস্তব। কিন্তু ট্রাম্পের ওপর তার নির্ভরতা ভুল, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই অভিশংসনের সম্ভাবনার মুখে।
নেতানিয়াহুর দুর্দশা আরও বাড়িয়েছে জাতিসংঘের সর্বশেষ মানবাধিকার প্রতিবেদন, যেখানে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের দশকের পর দশক ধরে চলা বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এই বর্ণবাদী ব্যবস্থার অবসান দাবি করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ক বলেন: “পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের একটি পদ্ধতিগত শ্বাসরোধ চলছে।”
তিনি আরও বলেন: “পানি পাওয়া, স্কুলে যাওয়া, হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা বা জলপাই সংগ্রহ অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বৈষম্যমূলক আইন, নীতি ও চর্চার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত সীমাবদ্ধ। এটি বর্ণবাদী বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতার একটি অত্যন্ত গুরুতর রূপ, যা আমাদের আগে দেখা বর্ণবৈষম্যমূলক অ্যাপারথাইড ব্যবস্থার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।”
যদিও বহু বিশ্বাসযোগ্য মানবাধিকার সংস্থা—এমনকি উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের ভেতরের প্রতিষ্ঠানগুলিও—আগেই ইসরায়েলকে অ্যাপারথাইড রাষ্ট্র বলে চিহ্নিত করেছে, এটি প্রথমবার কোনো জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান সরাসরি এই শব্দটি ব্যবহার করলেন।
ভলকার টুর্কের প্রতিবেদন প্রমাণভিত্তিক ও দ্ব্যর্থহীন। এতে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর শাসনব্যবস্থা পশ্চিম তীরে বসবাসরত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের জন্য “দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইন ও নীতির কাঠামো” প্রয়োগ করছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ বহু ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রতিবেদন আরও যোগ করেছে: “ফিলিস্তিনিরা এখনো ব্যাপক ভূমি দখল ও সম্পদের ওপর প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শিকার।” অ্যাপারথাইড এমন একটি ব্যবস্থা, যা বর্ণবাদ, নিষ্ঠুরতা ও অবিচারের ওপর টিকে থাকে।
ইসরায়েলে এর প্রয়োগ: ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে। পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য করে সামরিক (বেসামরিক নয়) আদালতে ফৌজদারি মামলা চালানো হচ্ছে, যেখানে ন্যায়বিচার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে লঙ্ঘিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে ডানপন্থীরা যখন ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্পের আগ্রাসনকে সমর্থন করেছে এবং কিউবা, মেক্সিকো, সোমালিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে তার শত্রুতামূলক অবস্থানকে প্রশংসা করেছে, তখন নেতানিয়াহু বোকামির সঙ্গে নিজের তথাকথিত গৌরবে বিভোর ছিলেন। কিন্তু তার নিরাপত্তাহীনতা স্পষ্ট। “উগ্র ইসলাম”-এর ভীতি দেখিয়ে নিজের ইসলামবিদ্বেষী সমর্থকদের ভয় দেখালেও, বৈশ্বিক জনমতের ঢেউ তাকে তাড়া করছে। কাপুরুষদের মতো আচরণ করে তিনি এখন কার্যত ফিলিস্তিনে কাজ করা বহু আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা নিষিদ্ধ করেছেন। ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স’সহ ৩৭টি বিদেশি সাহায্য সংস্থাকে ফিলিস্তিনে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীরা গাজাকে “একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ডিস্টোপিয়ান এলাকা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা যথার্থই। ইয়ারা হাওয়ারির মতে, মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১৯৪৫ সালে হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার ছয় গুণ সমপরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ঔপনিবেশিকতার নতুন মুখ, যারা স্বাধীনতা ও মুক্তি কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে। যদিও তাদের সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ভয়াবহ ও চলমান, তা চিরস্থায়ী নয়। অবিচার চিরকাল স্থায়ী হয় না—এর চরম পরিণতি অনিবার্য। -ইকবাল জাসাত, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গভিত্তিক মিডিয়া রিভিউ নেটওয়ার্কের একজন নির্বাহী সদস্য।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button