বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ

১৬শ’ কোটি ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স এক হাজার ৬০০ কোটি ডলার (১৬ বিলিয়ন) ছাড়িয়েছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের এক সপ্তাহ বাকি থাকতেই রেমিটেন্স এই অংক অতিক্রম করল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক অর্থবছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স আসেনি। ২০১৪-১৫ অর্বছরে ১৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। যা ছিল এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে রেমিটেন্স বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নও (রিজার্ভ) সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। গত রোববার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে ব্যাংকিং চ্যানেল বহির্ভূত অবৈধভাবে মোবাইল ব্যাংকিং হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে নেতিবাচক প্রভাব পরে প্রবাসী আয়ে। তাই মোবাইলে হুন্ডি বন্ধ ও ব্যাংকিং চ্যানেল রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১ জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা ১ হাজার ৬০৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। প্রবাসী আয়ের এ পরিমাণ অতীতের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। চলতি অর্থবছর শেষ হতে আরও কয়েকদিন বাকি রয়েছে। রেমিট্যান্স আহরণের প্রবাহ ধারাবহিক থাকলে ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স সাড়ে ১৬শ’ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য থেকে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালে ব্যাংকিং চ্যানেলে এক হাজার ৫৫৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে এসেছিল এক হাজার ৩৫৩ কোটি ডলার। এর আগের বছর ২০১৬ সালে ছিল এক হাজার ৩৬১ কোটি ডলার। ২০১৫ সালে এসেছে এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। আর ২০১৪ সালে রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৯২ কোটি ডলার।

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে গত মে মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। গত মে মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৭৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পঠিয়েছিলেন। যা একক মাস হিসেবে এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ।
রেমিটেন্সের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত চার বছরের মধ্যে দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স এসেছে। এ সময় রেমিটেন্স এসেছিল এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ মার্কিন ডলার। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবাসীদের রেমিটেন্স পাঠানোর পরিমাণ ছিল এক হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়া সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এক হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছিল প্রবাসীরা। যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর প্রবাসী বাংলাদেশিদের ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এক হাজার টাকা রেমিট্যান্স পাঠালে প্রবাসীরা প্রণোদনা হিসেবে ২০ টাকা পাবেন।
প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, রেমিট্যান্স প্রেরণে বর্ধিত ব্যয় লাঘব এবং বৈধ পথে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত করার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রণোদনা হিসেবে চলতি অর্থবছর ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, রেমিটেন্স প্রবাহ এমনিতেই ভালো ছিল। রোজা এবং ঈদকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে পরিবার-পরিজনের কাছে বেশি বেশি টাকা পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ঈদের পরেও রেমিটেন্স প্রবাহ মন্দ নয়। সবমিলিয়ে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক রেমিটেন্সে একটি ভালো বছর পার হতে চলেছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) রেমিটেন্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থবছর শেষেও প্রবৃদ্ধি এমনটাই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৭ লাখ (১৪.৯৮ বিলিয়ন) ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি ছিল।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হল বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিটেন্স। বর্তমানে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। জিডিপিতে তাদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মত।
রিজার্ভ ৩২.০২ বিলিয়ন ডলার: রেমিটেন্স বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নও (রিজার্ভ) সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। রোববার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। গত ৭ মে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মার্চ-এপ্রিল মেয়াদের ১২৪ কোটি ১০ লাখ ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের নীচে মে আসে। রেমিটেন্স বাড়ায় তা ফের ৩২ বিলিয়ন ডলারের উপরে অবস্থান করেছে মূলত রেমিটেন্স বাড়ার কারণে। জুলাই মাসের আকুর দেনা পরিশোধ করতে হবে। তার আগ পর‌্যন্ত রিজার্ভ আরও বাড়বে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ- এই নয়টি দেশ বর্তমানে আকুর সদস্য। এই দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যে সব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পর পর আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।
স্থানীয় বাজারে ডলারের তেজিভাব এবং হুন্ডি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সোমবার প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। এর বছর আগে ১৯ জুন ডলার-টাকার বিনিময় হার ছিল ৮৩ টাকা ৭০ পয়সা।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...

Close
Close