যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থা

সীমান্ত দেয়ালের বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুঁয়েমির জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থায় সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। গত ২১ ডিসেম্বর মধ্যরাতের পর থেকে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থা গতকাল শনিবার টানা ২২তম দিনে পড়ে। এর আগে ১৯৯৫-৯৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে সর্বোচ্চ ২১ দিন অচল ছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য দাবিকৃত ৫৭০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ ছাড়া কোনো অর্থবাজেটে সাক্ষর করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে বিরোধী ডেমোক্রেটিক নিয়ন্ত্রিত যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের নেতারা ‘জনগণের করের টাকায়’ ট্রাম্পকে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না দেওয়ার ‘প্রতিজ্ঞা’ করেছে। যদিও ডিসেম্বরের শেষ দিকে যখন এই অবচলাবস্থার শুরু হয় তখন প্রতিনিধি পরিষদ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন নিম্নকক্ষে ট্রাম্পের দাবি মেনে নিয়ে একটি অর্থবাজেট অনুমোদন পেয়েছিল, যা উচ্চকক্ষ সিনেটে গিয়ে আটকে যায়। এখন প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে যাওয়ায় আর বিপাকে পড়েছেন ট্রাম্প।

দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের এক-চতুর্থাংশ বিভাগ ও সংস্থার আট লাখের বেশি কর্মী গত ২২ দিন ধরে বেতন পাচ্ছেন না। কারারক্ষী, বিমানবন্দরকর্মী এবং এফবিআই এজেন্টসহ আরও অনেকগুলো সরকারি সংস্থার কর্মীরা শুক্রবার তাদের নতুন বছরের প্রথম বেতন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা সড়কে নেমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। এদিন অনেক সরকারি কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের খালি ‘পে স্লিপ’র ছবি পোস্ট করেছেন।

এমন একজন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র মহাকাশ প্রকৌশলী অস্কার মুরিলো। তিনি টুইটারে তার শূন্য মার্কিন ডলারের চেক পোস্ট করেন লেখেন, “আসলে বাধ্যতামূলক কর্তনের কারণে আমি অর্থ হারিয়েছি।” বেতন না পাওয়া সরকারি কর্মীদের জন্য গতকাল শনিবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি ফুড ব্যাংকের পক্ষ থেকে পাঁচটি পপ-আপ মার্কেট চালু করা হয়েছে। বেতন দিতে না পারায় নিরাপত্তারক্ষীরা কাজে আসছেন না। যে কারণে ব্যস্ততম মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি পুরো টার্মিনাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য দুই দিন আগে ট্রাম্প শীর্ষ ডেমোক্রেট নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। কিন্তু প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ও সিনেটের সংখ্যালঘু অংশের নেতা চাক শুমার দেয়াল নির্মাণের অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পরপরই ট্রাম্প বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরে তিনি শীর্ষ দুই ডেমোক্রেট নেতার সঙ্গে বৈঠককে ‘সময় নষ্ট’ হিসেবেও অভিহিত করে বলেন, প্রয়োজনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি জরুরি অবস্থা জারি করবেন।

তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা জরি বরং এর থেকে বের হওয়ার ‘সহজ রাস্তা’। তবে তিনি চান ‘কংগ্রেসেরই এই সমস্যার সামাধান হোক’। “তবে যদি তারা সেটা না করে..আমি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবো। আমার এটা করার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।” ট্রাম্প জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে ডেমোক্রেটিক নেতারা তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। শাটডাউনে এবার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিমানবন্দরের কর্মী, এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রক, এফবিআই কর্মীরাও। এই শাটডাউন চলমান থাকলে জননিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর পর সয়াবিনের দাম পড়ে যাওয়ার পর আমেরিকার বহু কৃষক ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে ক্ষতিপুরণ পাওয়ার আশা করেছিলেন। তবে শাটডাউনের কারণে বন্ধ হয়ে আছে সেই ক্ষতিপুরণও। মার্কিন অর্থনীতিবিদেরা বলছেন চলমান শাটডাউনের কারণে গত শুক্রবার পর্যন্তই ক্ষতি হয়েছে ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার। আরও দুই সপ্তাহ ধরে এই শাটডাউন অব্যাহত থাকলে এই ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে এর চেয়েও কম পরিমাণ অর্থ চেয়েছিলেন ট্রাম্প।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই শাটডাউনকে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আরও একটি পরিহাস হিসেবে দেখে আসলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই শাটডাউন অব্যাহত থাকলে বাকি বিশ্বের ওপরেও প্রভাব ফেলতে শুরু করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীরা কাজে যোগ না দিলে বন্দরে কন্টেইনারগুলো অসহায় পড়ে থাকলে রফতানিকারক বা ব্যবসায়ীরা এই শাটডাউনের প্রভাব টের পেতে শুরু করবেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, তারা ভিসা ও পাসপোর্ট ইস্যু অব্যাহত রাখবে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত তহবিলের সমর্থন অব্যাহত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এসব কার্যক্রম চালাতে পারবে তারা। এই প্রভাব শুরু হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত লাখ লাখ কর্মীও শাটডাউনের কবলে পড়তে পারেন।

ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টে বলা হয়েছে, শাটডাউনের কারণে মার্কিন জিওলোজিক্যাল সার্ভের আট হাজার কর্মীর মধ্যে মাত্র ৭৫ জন এখন কাজ করতে পারছেন। ফলে বিশ্বের ভূতাত্ত্বিক ঘটনাগুলোর অন্যতম তথ্যদাতা এই প্রতিষ্ঠানটি ইন্দোনেশিয়ার সুনামির কোনও তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি। এছাড়া আশঙ্কা করা হচ্ছে এই শাটডাউন মানবিক সহায়তা এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হলো এটি চলা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব হবে ভয়াবহ।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...

Close
Close