যেভাবে মার্কিন আইন ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করে

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ব্যাপক সমর্থন দেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করে।
মার্কিন শীতল যুদ্ধকালীন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৭ সালে বলেছিলেন: “ইসরায়েলের নিরাপত্তা সকল স্বাধীন মানুষের জন্য একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা।” ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের প্রশাসন প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ”কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এডজ্’ বা কিউএমই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে।
১৯৮১ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার হেইগ কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন: “১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন নীতির একটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল এটা নিশ্চিত করা যে, ইসরায়েল তার গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখবে।”
১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে এফ-১৫এস স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছিল, তবে ইসরায়েলের কিউএমই বজায় রাখতে সেগুলোর রাডার প্রযুক্তি সীমিত করে দেওয়া হয়।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ইসরায়েলের নিকটবর্তী তাবুক বিমানঘাঁটিতে ওই যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতেও নিষেধ করেছিল। কিউএমই কখন মার্কিন আইনে পরিণত হয়?
২০০৮ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ-এর আমলে কিউএমই আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়।
ন্যাভাল ভেসেল ট্রান্সফার অ্যাক্ট অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো রাষ্ট্রে অস্ত্র রপ্তানি করলে তা যেন ইসরায়েলের কিউএমই-কে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আইনে কিউএমই-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে: “কোনো একক রাষ্ট্র, সম্ভাব্য রাষ্ট্রজোট বা অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রচলিত সামরিক হুমকি মোকাবিলা ও পরাজিত করার সক্ষমতা, যেখানে সর্বনিম্ন ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের মাধ্যমে উন্নত অস্ত্র, কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, গোয়েন্দা, নজরদারি ও পুনরুদ্ধার সক্ষমতা ব্যবহার করা হবে, যা প্রতিপক্ষের তুলনায় প্রযুক্তিগতভাবে শ্রেষ্ঠ।”
এই আইনে আরও বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতি চার বছর অন্তর মূল্যায়ন করতে হবে ইসরায়েল এখনও তার প্রতিবেশীদের তুলনায় সামরিকভাবে কতটা এগিয়ে আছে। ২০১৩ সালে ইসরায়েল কিউএমই এনহ্যান্সমেন্ট অ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে এই মূল্যায়নের সময়সীমা কমিয়ে প্রতি দুই বছর করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে কত সামরিক সহায়তা দেয়?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে (মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করে) ২৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ফলে ইসরায়েল মার্কিন আর্থিক সহায়তার সর্ববৃহৎ গ্রহীতা।
বর্তমান সহায়তার ভিত্তি হলো ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওই। এই চুক্তি অনুযায়ী ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর কমপক্ষে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা ইসরায়েলকে দেওয়া হবে। এটি মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক সামরিক সহায়তা প্রতিশ্রুতি।
ওবামা তখন বলেছিলেন: “ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি আমেরিকার অঙ্গীকার অটুট। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র প্রযুক্তির ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করবে যে ইসরায়েল সব ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে।”
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এবং গাজা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সামরিক সহায়তাও দিয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের জন্য মার্কিন সামরিক সহায়তা ১২.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল।
কোন মার্কিন অস্ত্র ইসরায়েলকে সামরিক সুবিধা দেয়?
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি হলো এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। এটি লকহীড মার্টিন তৈরি করে এবং এতে যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ আরও আটটি দেশের যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয়। এফ-৩৫ হলো বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত স্টেলথ যুদ্ধবিমান। এর বৈশিষ্ট্য: দীর্ঘ পাল্লা ৩৬০ ডিগ্রি সেন্সর রাডারে ধরা না পড়ার ক্ষমতা এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমানও। একটি এফ-৩৫এ-এর দাম গড়ে ৮২.৫ মিলিয়ন ডলার। পুরো এফ-৩৫ প্রকল্পের ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বর্তমানে মাত্র ২০টি দেশ এফ-৩৫ ব্যবহার করে।
২০১০ সালে ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে এই বিমান কেনে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (এমইএনএ) আর কোনো দেশের কাছে এফ-৩৫ নেই। ইসরায়েলের নিজস্ব সংস্করণ এফ-৩৫১ আডিরে ইসরায়েলি সফটওয়্যার ও ইলেকট্রনিকস সংযোজিত রয়েছে।
২০১৮ সালে লেবাননে বিমান হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল প্রথম এফ-৩৫ যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করে। পরবর্তীতে এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে:ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, কাতার ও গাজার অভিযানগুলোতে।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মার্কিন ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতেও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। যেমন: আয়রন ডোম, অ্যারো ও ডেভিডস স্লিঙ্গ। এর মধ্যে ডেভিডস স্লিঙ্গ মার্কিন কোম্পানি রেইথিয়নের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি।
ইসরায়েলের পারমাণবিক শক্তি
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই একমাত্র অঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে এ বিষয়ে কার্যত চোখ বন্ধ রেখেছে। ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি ১৯৮৬ সালে এক ইসরায়েলি হুইসেলব্লোয়ারের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে কি কেউ ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করেছে? গাজা যুদ্ধ চলাকালে সমালোচনা বেড়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত সদস্য রাশিদা তলাইব বলেন: “গাজায় মার্কিন-সমর্থিত ও মার্কিন অর্থায়িত গণহত্যা প্রতিদিন আরও ভয়াবহ হচ্ছে।”
২০২৫ সালের জুলাইয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিন ইসরায়েলের আয়রন ডোমের জন্য বরাদ্দ ৫০০ মিলিয়ন ডলার কমানোর প্রস্তাব দেন।
রাশিদা তলাইব ও ইলহান ওমর তাকে সমর্থন করলেও প্রস্তাবটি মাত্র ৬ ভোট পায়, বিপক্ষে ছিল ৪২২ ভোট। সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক টাকার কার্লসনও ইসরায়েলকে সহায়তা কমানোর পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বলেন: “আমি মনে করি না যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছে কিছু ঋণী। আমি মনে করি না যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে কিছু দেওয়া উচিত। আগামীকাল থেকেই সব সহায়তা বন্ধ করা উচিত।”
ট্রাম্পের আমলে কিউএমই কীভাবে বদলেছে?
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করবে।
তিনি বলেন: “আমি জানি ইসরায়েল চাইবে আপনাদের কম ক্ষমতাসম্পন্ন বিমান দেওয়া হোক। আমি তা মনে করি না। সৌদি আরব ও ইসরায়েল—উভয়েরই সর্বোচ্চ মানের প্রযুক্তি পাওয়া উচিত।”
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পরে বলেন যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কিউএমই বজায় রাখবে। এই বিক্রয় এখনও কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করলেও ইসরায়েলের কিউএমই রক্ষার নীতি পরিবর্তন করবে না। কিউএমই বা ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এডজ্’ হলো এমন একটি মার্কিন নীতি ও আইন, যার উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশ বা জোটের তুলনায় ইসরায়েলকে প্রযুক্তিগত ও সামরিকভাবে এগিয়ে রাখা। এই নীতির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি, সামরিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। -ড্যানিয়েল টেস্টার

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button