আল-আকসা মসজিদ বন্ধ: ফিলিস্তিনিদের জন্য অন্ধকার নতুন অধ্যায়ের সূচনা

রমজানের শেষ জুমা। অথচ জেরুজালেমের পুরোনো শহর যেনো এক ভূতুড়ে নগরী। আল-ওয়াদ — আল-আকসা মসজিদের দিকে যাওয়ার প্রধান সড়ক সম্পূর্ণ ফাঁকা। মিষ্টি, মসলা ও পোশাকের দোকান সব বন্ধ। এমনকি ফার্মেসি ও বিখ্যাত আবু খাদিজার কফি শপও জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিশুদের জন্য কোনো মিষ্টি নেই। রমজানের পণ্য কেনার আহ্বান নেই। পবিত্র মাসে অলিগলি সাজানোর যে চিরচেনা সাজসজ্জা, তারও দেখা নেই। একসময় প্রাণচঞ্চল পুরনো শহর এখন নিস্তব্ধ।
সবুজ দরজার সামনে দুইজন ইসরায়েলি পুলিশ দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, কেউ যেন এগোতে না পারে তা নিশ্চিত করছে। যারা সারাজীবন এই শহরে বসবাস করেছি, তাদের কাছে ফাঁকা রাস্তা আর বন্ধ দরজাগুলো ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ভয় ও অনিশ্চয়তার বার্তা দেয়।
ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানে হামলায় যোগ দেওয়ার পর এই অবরোধ কার্যকর করে। প্রথমে হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদ বন্ধ করা হয়, পরে নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে আল-আকসাতেও আরোপ করা হয়। দুই মসজিদই দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত।
ফিলিস্তিনিরা তাদের জীবনে ইচ্ছাকৃত ও দমনমূলক নিষেধাজ্ঞায় অভ্যস্ত। কিন্তু রমজান মাসে ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা বন্ধ করে দেওয়া নজিরবিহীন।
যুদ্ধের অজুহাত:
১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজানে ফিলিস্তিনিরা আল-আকসা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে পারছে না।
দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি বিশেষভাবে কষ্টদায়ক, কারণ রমজানই বছরের একমাত্র সময় যখন সীমিত সংখ্যায় হলেও ইসরায়েল তাদের আল-আকসায় যেতে দেয়। এমনকি কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও রাস্তা এতটা ফাঁকা ছিল না। তখন নামাজের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল ইসলামিক ওয়াকফ, যারা আল-আকসার প্রশাসন পরিচালনা করে।
কিন্তু এবার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের অজুহাতে জননিরাপত্তার কথা বলে মসজিদে জমায়েত হওয়া নিষিদ্ধ করেছে। অদ্ভুতভাবে, শহরের অন্য অংশে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়, সেখানে রেস্তোরাঁ ও কফি শপে ভিড়, উপাসনালয়গুলো খোলা।
স্পষ্ট বোঝা যায়, ফাঁকা রাস্তা শহরের ইতিহাসে নতুন এক অন্ধকার অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসরায়েল যুদ্ধকে অজুহাত বানিয়ে আল-আকসাকে মুসল্লিশূন্য করছে এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য আল-আকসা ফিলিস্তিনের ভিত্তি। এটি হারানো মানে আমাদের অস্তিত্বের এক অপরিহার্য অংশ হারানো, এমনকি যারা খুব বেশি ধর্মীয় নন তাদের কাছেও।
ইসরায়েলের উত্তরে বসবাসকারী এক ফিলিস্তিনি নারী বলেন:
“আল-আকসা মসজিদ শুধু ফিলিস্তিনী পরিচয়ের পবিত্র হৃদয় নয়, এটি ‘সুমুদ’ — অটলতা, প্রতিরোধ এবং মুক্তির দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক। এটি আমাদের বিশ্বাস ও প্রার্থনাকে ভূমির মুক্তি, প্রত্যাবর্তনের অধিকার এবং স্বাধীন জাতি হিসেবে মর্যাদা পুনরুদ্ধারের দিকে বহন করে।”
নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া:
২০২১ সালের মে মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি আল-আকসায় সমবেত হয়েছিল—ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ, মুসলিম ও খ্রিস্টান সবাই।
ইসরায়েল ও দখলকৃত অঞ্চলজুড়ে শহর ও জনপদ থেকে মানুষ প্রতীকীভাবে মসজিদ রক্ষায় ছুটে আসে। শুধু ধর্মীয় গুরুত্ব নয়, এটি ফিলিস্তিনী পরিচয়ের প্রতীক বলেই। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই বন্ধের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্থিতাবস্থা ভেঙে সম্পূর্ণ দখলের পথ তৈরি করা হচ্ছে। ইসরায়েল একতরফাভাবে নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দিচ্ছে, যাতে স্থানটি মূলত ইহুদি উপাসনাস্থলে রূপান্তরিত হয়, যেমনটি ইতোমধ্যে ইব্রাহিমী মসজিদে ঘটেছে। ১৯৯৪ সালে মার্কিন বংশোদ্ভূত ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বারুখ গোল্ডস্টেইন রমজানে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে ২৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা ও ১২৫ জনকে আহত করে। পরে বেঁচে যাওয়া মানুষ তাকে নিরস্ত্র করে হত্যা করে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রবিন হামলাটির নিন্দা করলেও ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থীদের কেউ কেউ তাকে সম্মান জানায়। কিরিয়াত আরবা বসতিতে তার কবর উগ্রপন্থী জায়নিস্টদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভির ২০২৩ সালে গোল্ডস্টেইনকে মহিমান্বিত করে ঝোলানো একটি ছবির সামনে বক্তৃতা দেন।
হামলার পর একটি ইসরায়েলি কমিশনের সুপারিশে নামাজের স্থান ভাগ করা হয়—দুই-তৃতীয়াংশ ইহুদিদের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ মুসলমানদের জন্য। এবার কি আল-আকসাতেও তাই ঘটবে?
অবরুদ্ধ শহর:
ইসলামিক ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আওনি বাজবাজ বলেন, এই বন্ধের গুরুতর পরিণতি হতে পারে। তিনি আরো বলেন, “যখন অন্যত্র স্বাভাবিক জীবন ফিরছে, তখন আল-আকসা বন্ধ রাখা এমন ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ পরিণতি ডেকে আনতে পারে যা উপেক্ষা করা যায় না।”
তিনি সতর্ক করেন, এটি “উত্তেজনা ও জনরোষ বাড়িয়ে তুলতে পারে।”
জেরুজালেমভিত্তিক কর্মী ও নগর বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফাখরি আবু দিয়াব বলেন, “জননিরাপত্তার অজুহাতটি মিথ্যা। পুলিশ ও সরকার আমাদের রক্ষার বিষয়ে ভাবে না। জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো বোমা আশ্রয়কেন্দ্র নেই।” তার মতে, লক্ষ্য হলো মসজিদ খালি করা, ফিলিস্তিনিদের দূরে সরানো এবং বিশেষ করে রমজানে তাদের ইবাদতের অধিকার কেড়ে নেওয়া। তিনি বলেন, “আমাদের আল-আকসায় যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে, অথচ মানুষ এখনো রাস্তায় ও বাজারে আছে।”
আল-আকসা বন্ধ করা পুরনো শহরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বৃহত্তর অবরোধের অংশ।
এক তরুণ বলেন, “তারা আমাদের জীবিকার উৎস ধ্বংস করেছে। রমজানে কিছু ব্যবসা হবে ভেবেছিলাম, কিন্তু খাবারের দোকান ছাড়া সবাইকে বন্ধ করতে বাধ্য করেছে।”
তার বন্ধু দোকান খোলার কারণে ৬,০০০ শেকেল জরিমানা দিয়েছে, যদিও খাবারের দোকান খোলা ছিল।
“জরিমানা আর হয়রানি বাদ দিলেও বিক্রি করব কাকে? শহর বন্ধ, কোনো ক্রেতা নেই।”
ইসরায়েল পুরনো শহরের প্রবেশপথ বন্ধ করেছে। দামেস্ক গেটে সেনারা পাহারা দিচ্ছে, পরিচয়পত্র পরীক্ষা করছে। ভেতরের ঠিকানার বাসিন্দাদেরই শুধু ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।
এক জুস বিক্রেতা বলেন,“কখনো খুলে, কখনো বন্ধ করে। কোনো কারণ নেই, কেউ জানে না কবে নিয়ম বদলায়।”
এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তি ট্রেতে গম বিক্রি করছিলেন। কাছে এসে এক ইসরায়েলী পুলিশ সদস্য তাকে হুমকি দেয়: “এটা উল্টে দেওয়ার আগে চলে যাও, আমাকে এটা করতে বাধ্য করো না। ”ভাঙা আরবিতে বলে সে। -লুবনা মাসারওয়া, একজন সাংবাদিক এবং মিডল ইস্ট আই-এর প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েল ব্যুরো প্রধান, যিনি জেরুজালেমে অবস্থান করছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button