ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ যেভাবে আমেরিকান গণতন্ত্রের মৃত্যু উন্মোচন করে
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কোনো কংগ্রেসীয় বিতর্ক নয়। কোনো জনসম্মুখে আলোচনা নয়। কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা নয়। শুধু মধ্যরাতের একটি অভিযান, যেখানে শীর্ষ আইন প্রণেতাদের মাত্র কয়েক মিনিট আগে জানানো হয়, আর তখনই ঘোষণা করা হয় যে আমেরিকান বিমান ইতোমধ্যেই তেহরানে হামলা চালাচ্ছে। একটি প্রজাতন্ত্র এভাবে যুদ্ধ করে না। এভাবে যুদ্ধ করে একজন রাজা।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কোড নাম দেয়া অভিযানের অধীনে ইরানের ওপর এই হামলা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করে, কোনো ভোট ছাড়াই আমেরিকানদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে কাঁপিয়ে দেয়।
সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়। কিন্তু ট্রাম্প তা উপেক্ষা করেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু একটি নিয়ম ভঙ্গ করেননি, তিনি আমেরিকার গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই আঘাত করেছেন।
হোয়াইট হাউসের যুক্তি ছিল জাতিসংঘ সনদের অধীনে যৌথ আত্মরক্ষা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো আক্রমণ হয়নি। ইরান আমেরিকার মাটিতে হামলা করেনি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেন—কেউ বলেন পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, কেউ বলেন শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন। এসবের কোনো কংগ্রেসীয় অনুমোদন বা গণতান্ত্রিক বিতর্ক নেই। সিনেটর অ্যান্ডি কিম যেমন বলেন, আইনপ্রণেতা ও জনগণকে এমন এক সামরিক উত্তেজনা মেনে নিতে বলা হচ্ছে যার শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না: “প্রেসিডেন্ট আমাদের এমন অবস্থায় ফেলেছেন যেখানে আমরা এমন বিষয়ের দায় নিচ্ছি যা আমরা দেশ হিসেবে আলোচনা করিনি।” যখন সিনেটররা গোপন ব্রিফিং চান, তখন তাদের প্রায় উপেক্ষা করা হয়। এরপর দেখা যায় এক ধরনের বিশৃঙ্খলা: একই দিনে একদিকে সেনা মোতায়েন বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে যুদ্ধ কমানোর কথা বলছেন। তিনি হরমুজ প্রণালী না খুললে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা মারার হুমকিও দেন। গ্যাসের দাম বাড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: “বাড়লে বাড়ুক।” এগুলো কোনো জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রপ্রধানের কথা নয়। এগুলো এমন একজনের কথা, যিনি মনে করেন তিনি কারো কাছে জবাবদিহি নন।
এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা এসেছে উভয় রাজনৈতিক পক্ষ থেকেই, যা বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তোলে। সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন বলেন, “ট্রাম্প আমেরিকান জনগণকে মিথ্যা বলছেন এবং শাসন পরিবর্তনের একটি অবৈধ যুদ্ধ শুরু করেছেন, যা আমেরিকানদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং ইতোমধ্যেই বহু বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে।” রিপাবলিকান থমাস ম্যাসি বলেন, “এটা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নয়। সংবিধান যুদ্ধের ক্ষমতা কংগ্রেসকে দিয়েছে একটি কারণেই, যাতে যুদ্ধ কম হয়।” আর্মি ভেটেরান ও রিপাবলিকান ওয়ারেন ডেভিডসন বলেন, “যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।” এরা দলীয় রাজনীতি করছেন না, তারা তাদের শপথ রক্ষা করছেন। তবুও, প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করতে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব ব্যর্থ হয়, কারণ অধিকাংশ রিপাবলিকান তার পাশে দাঁড়ান। সিনেটর টিম কেইনের সতর্কবার্তা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ: “আপনি যদি শুধু চুপ করে থাকেন এবং প্রেসিডেন্টকে একাই সিদ্ধান্ত নিতে দেন, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো যুদ্ধ শুরু করতে পারবে।”
মানবিক ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়েছে ভয়াবহ রকম, ১,৪০০-এর বেশি ইরানি নিহত, ১৩ জন আমেরিকান সেনা নিহত এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বহন করছে পুরো বিশ্ব। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছায়। হরমুজ প্রণালী, যার মাধ্যমে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়, তা কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং ‘কাতারএনার্জি’ তাদের সব রপ্তানি স্থগিত ঘোষণা করে। বৈশ্বিক শেয়ারবাজার যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে ৫.৫ শতাংশ পড়ে যায়। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ায় একসাথে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বেড়ে যায়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ—এদিকে যুদ্ধ শুরু করা প্রেসিডেন্টই আবার সুদের হার কমানোর দাবি করছেন। শিকাগো থেকে চেন্নাই, লাগোস থেকে লন্ডন, সাধারণ মানুষ সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিচ্ছে, যা একজন মানুষ একাই নিয়েছে, কারো অনুমতি ছাড়াই।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর ওপরই বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। মিত্রদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। গণতান্ত্রিক বিশ্বকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবুও তারা সবাই এর মূল্য দিচ্ছে। এটি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র একসময় এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল যেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশও নিয়ম মেনে চলবে এবং শক্তি প্রয়োগের আগে বৈধতা খুঁজবে। যখন এই ধারণা ভেঙে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যায়। তখন পৃথিবী আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে—যেখানে মস্কো, বেইজিং বা ওয়াশিংটন সবখানেই “রাজা”রা শাসন করে।
“নো কিংস” কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি আমেরিকার প্রতিষ্ঠার মূলনীতি, যা ক্ষমতার বিভাজন ও সংবিধানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই যুদ্ধ সেই নীতির সবচেয়ে বড় লঙ্ঘন, তবে তা প্রথম নয়। এর আগেও ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ধরার নির্দেশও দিয়েছেন কোনো অনুমতি ছাড়াই। প্রতিটি অপ্রতিরোধকৃত একতরফা ক্ষমতার ব্যবহার পরবর্তীটিকে আরও সহজ করে তোলে। এভাবেই একটি প্রজাতন্ত্র ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়, একটি নাটকীয় মুহূর্তে নয়, বরং ছোট ছোট দৃষ্টান্তের সঞ্চয়ে, যেগুলো সময়মতো কেউ থামায়নি। ২৮ মার্চ সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি “নো কিংস” প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এতে যোগ দিন। আপনার প্রতিবেশীদের নিয়ে আসুন। আপনার সন্তানদের নিয়ে আসুন, যাতে তারা দেখতে পারে গণতন্ত্র কেমন হয়, যখন নাগরিকরা সেটিকে রক্ষা করে। এটি কোনো দলীয় আহ্বান নয়, এটি একটি সাংবিধানিক আহ্বান এবং এটি তাদের সবার জন্য যারা বিশ্বাস করেন যে, আমেরিকায় সিদ্ধান্ত নেয় জনগণ, কোনো একজন মানুষ নয়, কোনো রাজা নয়। আমরা আগে রাজতন্ত্র দেখেছি। আমরা জানি এর পরিণতি কী শেষ পর্যন্ত। -গ্রেগ পেন্স, আন্তর্জাতিক স্টাডিজে ইউনিভার্সিটি অব সান ফ্রান্সিসকো থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি Geopolitical Monitor, Eurasia Review এবং Modern Diplomacyসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্ল্যাটফর্মে প্রবন্ধ লিখেছেন।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



