গাজায় ঈদ: অসীম ক্ষতির মধ্যেও আমরা উৎসব উদযাপন করার অধিকার রাখি

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যে গাজায় ঈদুল ফিতর এসেছে, যা এক ধরনের প্রবল কিন্তু অসম্পূর্ণ আনন্দ ও অনিশ্চিত শান্তি নিয়ে এসেছে, যার মাঝে এখনও ক্ষয় ক্ষতির স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে।
ইসলামের দুইটি প্রধান উৎসবের একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর, যা পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তি চিহ্নিত করে। আমার মতো যারা গাজায় জন্মেছি ও বড় হয়েছি এবং বহুবার ইসরায়েলি হামলা ও প্রায় দুই দশকের অবরোধের মধ্যে টিকে আছি, তাদের জন্য এটি এমন একটি সময়, যখন আমরা বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আমরাও মানুষ, আমরাও অন্যদের মতো আনন্দ উদযাপন করতে পারি।
গাজায় ঈদের প্রস্তুতি সাধারণত রমজানের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয়। রাস্তাঘাট ভরে যায় নতুন কাপড়, মিষ্টি ও বাদাম কেনার জন্য ক্রেতাদের ভিড়ে। আর ব্যবসায়ীরা উৎসবের আগে যতটা সম্ভব বিক্রি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মাসের শেষের দিকে বাতাসে ভেসে আসে সুমাগিয়ার গন্ধ, যা টক স্বাদের সুমাক দিয়ে তৈরি একটি ফিলিস্তিনি স্ট্যু, যার উৎপত্তি গাজায়। দাদিরা অনেক বেশি পরিমাণে এটি রান্না করেন, ঈদের প্রথম দিনে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার জন্য। এর সঙ্গে মিশে যায় সদ্য সেঁকা কা’আকের ঘ্রাণ, যা সাধারণত অতিথিদের কফির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
আসলে ঈদের আগের দিনগুলোর আনন্দ অনেক সময় ঈদের দিনের আনন্দকেও ছাড়িয়ে যায়, কারণ মানুষ একে অপরকে সাহায্য করে এবং উষ্ণতা ও একতার মুহূর্ত তৈরি করে। গাজার শিশুদের জন্য ঈদ শুধু পারিবারিক সাক্ষাৎ নয়, বরং এটি নতুন কাপড়, মিষ্টি আর উপহারের টাকারও উৎসব।
আমি এখনও মনে করতে পারি, আমাদের চার ভাইবোনের জন্য নতুন কাপড় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমার বোন লিনা জোর করেই একাধিক পোশাক নিত, যেন ঈদের তিন দিনেই নতুন কিছু পরতে পারে।
স্বস্তির মুহূর্ত:
আমার বাবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সীমিত বেতন এবং পরিবারের ঋণের চাপ থাকা সত্ত্বেও, আমাদের জন্য ঈদের কাপড় কেনা ছিল সবসময়ই অগ্রাধিকার, যে ব্যাপারে কখনোই আপস করা হয়নি।
আমরা কাপড় কিনে আলমারিতে ঝুলিয়ে রাখতাম, আর দিন গুনতাম ঈদের জন্য। কখনো কখনো ঈদের আগের রাতে আমি আমার পোশাক বিছানায় সাজিয়ে রাখতাম, আর নিজে মেঝেতে ঘুমাতাম।
কিশোর বয়সেও আমি বন্ধুদের সঙ্গে বাজারে যেতাম ঈদের কাপড় কিনতে। কখনো মজা করে আমরা একই রঙের, যেমন উজ্জ্বল লাল বা ফিরোজা কাপড় পরার পরিকল্পনা করতাম। আর ঈদের আগের দিন আমি ও আমার বন্ধু আহমেদ নাপিতের দোকানে যেতাম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতাম, কারণ সকলেই ঈদের আগে চুল কাটাতে চাইত। আমরা গল্প করে, হাসতে হাসতে সময় কাটাতাম।
ঈদের সকালে হাজার হাজার মানুষ—পুরুষ, নারী ও শিশু গাজা শহরের আল-সারায়া এলাকার মতো খোলা জায়গায় একত্র হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করত। এক মাস রোজার পর, আমরা পরিবারের সবাই মিলে প্রথম নাস্তা করতাম, যার মধ্যে থাকত ফেসিখ (লবণযুক্ত মাছ)। এরপর আলিঙ্গন ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হতো।
“আমি যতটা পারি উদযাপন করতে চাই, কারণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করা আমার অধিকার।”
কফি পান করতে করতে, ছবি তুলে বিদেশে থাকা আত্মীয়-বন্ধুদের পাঠাতে পাঠাতে, ঈদ ছিল সবসময়ই এক বিরল স্বস্তির মুহূর্ত, দৈনন্দিন চাপ থেকে একটি বিরতি। তবুও, গাজায় ঈদের আনন্দ কখনোই পূর্ণ মনে হয় না। যেকোনো সময় ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে, আর বোমা না পড়লেও মানসিক আঘাত (পিটিএসডি) আমাদের আনন্দে বিঘ্ন ঘটায়।
২০২১ সালের ঈদুল ফিতরে, আমার চাচা মনসুর বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রে নিহত হন। পরের বছর আমরা অবরোধ ও উত্তেজনার মধ্যে ঈদ পালন করি, যা পরে আবার সংঘর্ষে রূপ নেয়। ২০২৩ সালে ঈদ আসে যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে।
২০২৪ সালে আমি আশা করেছিলাম গণহত্যা ঈদের আগে শেষ হবে, কিন্তু তা হয়নি। গত বছর রমজান শুরু হয়েছিল যুদ্ধবিরতির মধ্যে, আমরা আশা করেছিলাম, কিন্তু ১৮ মার্চ ইসরায়েল তা ভেঙে দেয়। এভাবে আরেকটি ঈদকে যুদ্ধকালীন উৎসবে পরিণত করে।
জীবিকা হারিয়ে গেছে:
এবারও ঈদ এসেছে এক নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মধ্যে, দুঃখ ও অনিশ্চয়তা নিয়ে, যখন ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ৬শ’য়ের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
গাজার অধিকাংশ মানুষ তাদের বাড়িঘর হারিয়েছে, সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে। অনেকে এখন অস্থায়ী তাঁবু বা আশ্রয় কেন্দ্রে বাস করছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারই তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে, যারা একসময় ঈদের আনন্দের অংশ ছিল। কেউ কেউ এখন পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে।
দুই বছরের যুদ্ধ মানুষের জীবিকা ও সঞ্চয় ধ্বংস করে দিয়েছে, ফলে গাজার দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ এখন দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে।
আজ অনেক পরিবারের জন্য খাবার কেনাই কঠিন, নতুন কাপড় তো দূরের কথা। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে বাজারে দাম আকাশচুম্বী। তবুও, সবকিছুর মাঝেও মানুষ আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে।
আমি সম্প্রতি গাজা শহরের আল-রিমাল স্ট্রিটে গিয়েছিলাম—যা এখন প্রধান বাজার, কারণ উত্তর ও পূর্বের অনেক এলাকা ধ্বংস বা দখল করা হয়েছে। আমি একা হেঁটেছিলাম মানুষের ভিড়ের মধ্যে, যারা আমার মতোই ঈদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়। আমাদের সবার মুখে ছিল ক্লান্তি ও দূরের দৃষ্টি, যা আমাদের শোকের নীরব সাক্ষী।
একটি জুতার দোকানে আমি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম আগের বছরের তুলনায় বিক্রি কেমন। তিনি বললেন, “গাজায় আর কোনো ঈদ নেই। ১০ শতাংশেরও কম মানুষ কেনাকাটা করছে। আগে ঈদের সময় আমরা এত বিক্রি করতাম যে পুরো বছরের ভাড়া ও ঋণ শোধ হয়ে যেত। এখন আমরা খাবার জোগাড় করতেও কষ্ট পাই।”
আমি অবাক হইনি। বেশিরভাগ মানুষ কিছু না কিনেই বাজারে ঘুরছিল। মনে হচ্ছিলো, তারা শুধু ঈদের পরিবেশটা অনুভব করতে এসেছে।
নতুন জুতার একটি বাক্স নিয়ে বাড়ি ফেরার সময়, জীবনে প্রথমবার আমি নতুন কিছু কেনার জন্য লজ্জা অনুভব করেছিলাম। আমি চাইছিলাম কেউ যেন না দেখে, বিশেষ করে সেই শিশুরা, যারা কিনতে পারছে না।
রাস্তার দুই পাশে থাকা তাঁবুগুলোর মানুষের কথা ভাবছিলাম, যাদের অনেকেই একসময় নিজেদের ঘরে ভালোভাবে বাস করত, আনন্দে ঈদ কাটাত।
আমি ভাবছিলাম, এত ক্ষতি বয়ে নিয়ে কেউ কীভাবে উৎসব উদযাপন করে? গত তিন বছরে আমি আমার মা, আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু আহমেদ এবং আরও ৬০ জন প্রিয়জনকে হারিয়েছি, যারা একসময় আমার ঈদের অংশ ছিল।
আমার বোনের বাড়িসহ অনেক আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও আমি যতটা পারি উদযাপন করতে চাই, কারণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করা আমার অধিকার। -আহমেদ ড্রেমলি, গাজাভিত্তিক একজন সাংবাদিক, যার লেখা Mondoweiss, Palestine Chronicle, The Electronic Intifada এবং Al-Monitor-এ প্রকাশিত হয়েছে।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button