ফিলিস্তিন থেকে ইরান: আরব ও মুসলিম নীরবতা আসলে কী প্রকাশ করে

পশ্চিমা বিশ্বে অভিজ্ঞ অ্যাক্টিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবীরা, যারা নিজেদের ফিলিস্তিনের প্রতি গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে করেন, প্রায়ই একটি পরিচিত প্রশ্ন তোলেন: কেন আরব সরকারগুলো ফিলিস্তিনের পক্ষে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে না?
প্রশ্নটি সাধারণত এক ধরনের বিস্ময়ের সুরে আসে: কেন আরব ও মুসলিমরা ফিলিস্তিনের জন্য কিছু করছে না?
এই প্রশ্নটি আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে যখন এটি করেন এমন ব্যক্তিরা যারা ইতিহাস ও রাজনীতির গভীর বোঝাপড়া রাখেন। কারণ বিষয়টি আবেগের চেয়ে অনেক বেশি কাঠামোগত।
প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্নটি অস্বাভাবিক মনে নাও হতে পারে। কারণ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের প্রতিবেশীদের রয়েছে ইতিহাস, ভূগোল, জনসংখ্যা, ধর্ম, ভাষা ও যৌথ স্মৃতির বন্ধন। এছাড়া রয়েছে পশ্চিমা আধিপত্য ও ইসরায়েলি উপনিবেশিক সহিংসতার অভিন্ন অভিজ্ঞতা।
ইসরায়েলি নেতারা খোলাখুলিভাবে সম্প্রসারণবাদী ভাষায় কথা বলেন এবং সেই অনুযায়ী কাজও করেন, ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া কিংবা অন্যত্র। এই সহিংসতার শিকার হয় একই অঞ্চলের মানুষ—আরব, মুসলিম এবং খ্রিস্টান সবাই। এছাড়া আরব ও মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনকে একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে। ২০২৪-২৫ সালের আরব মতামত জরিপে দেখা গেছে, ১৫টি দেশের ৮০% মানুষ মনে করে “ফিলিস্তিন ইস্যু পুরো আরব বিশ্বের যৌথ ইস্যু।” একই জরিপে ৪৪% ইসরায়েলকে সবচেয়ে বড় হুমকি এবং ২১% যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে।
অর্থাৎ, জনমতের স্তরে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি খুবই বাস্তব ও শক্তিশালী।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত হয়। অনেক আরব সরকার নিরপেক্ষ নয়—তারা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করছে। কেউ সরাসরি নির্ভরশীল, কেউ আবার নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামরিক সহযোগিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে তাদের “সহযোগী” বলা হলেও বাস্তবে সম্পর্কটি অসম।
সমস্যা দ্বিধা নয়—সমস্যা হলো অবস্থান বা এলাইনমেন্ট।
গাজা যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে। ফিলিস্তিনিরা যখন ক্ষুধা ও বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছিল, তখন আরব সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক, বিভক্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, বাহরাইন ৭ অক্টোবরের ঘটনায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকেই দোষারোপ করেছিল। মিশরও এমন একটি বয়ান ছড়াতে দেয় যে, তারা আগে থেকেই ইসরায়েলকে সতর্ক করেছিল, যা আলোচনার দৃষ্টি ইসরায়েলের অপরাধ থেকে সরিয়ে নেয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট। যখন ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ গাজায় সংহতি জানিয়ে লোহিত সাগরে ইসরায়েলমুখী বাণিজ্য ব্যাহত করে, তখন বিকল্প স্থলপথ তৈরি হয়—গালফ থেকে জর্ডান হয়ে ইসরায়েলে পণ্য পৌঁছানোর জন্য। অর্থাৎ, প্রকাশ্যে যতই কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করা হোক, বাস্তবে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছিল যা ইসরায়েলকে সহায়তা করে।
এটি নতুন কিছু নয় বরং ধারাবাহিকতা।
দশকের পর দশক ধরে বড় আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে—যেগুলো এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অভিযানের ভিত্তি।
তাই আরব সরকারগুলোকে “আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে”—এই দাবি বিভ্রান্তিকর। তারা ইতিমধ্যেই অবস্থান নিয়েছে এবং তা ফিলিস্তিনের পক্ষে নয়।
তবুও মানুষ এখনো বিশ্বাস করে আরব ও মুসলিম সংহতি যৌক্তিক ও সম্ভব। আর ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু ফিলিস্তিনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পুরো অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার মধ্যে নিহিত।
এখানে আছে পশ্চিমা বিশ্বের ব্যর্থতা। যখন ওয়াশিংটন, লন্ডন, বার্লিন বা প্যারিস থেকে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না, তখন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আশা করে আরব ও মুসলিম বিশ্ব থেকে তা আসবে। কিন্তু এখানে জনগণ ও সরকারকে এক করে দেখা হয়।
এই ভুল ধারণা ইরান যুদ্ধকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একটি জাগরণ তৈরি করতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট ব্যর্থ হয়, তাহলে আরব দেশগুলো বুঝতে পারবে যে, ওয়াশিংটন বা ইসরায়েল তাদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না।
সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রতিরোধের প্রতি নতুন এক গর্ব তৈরি হয়েছে, যেমনটি গাজা ও লেবাননের সময় দেখা গিয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আরব সরকারগুলোর অগ্রাধিকার ভিন্ন। তারা আবেগগতভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি “বেইমানি” করছে না, কারণ ফিলিস্তিনের মুক্তি তাদের মূল লক্ষ্য কখনোই ছিল না।
তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো বিদ্যমান আঞ্চলিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, তা যে কোন মূল্যেই হোক না কেন। আর যদি সেই স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ফিলিস্তিনের ধীরে ধীরে ধ্বংস প্রয়োজন হয়, তাহলেও অনেক সরকার সেটি মেনে নিতে প্রস্তুত। -রামজি বারুদ, একজন সাংবাদিক এবং Palestine Chronicle-এর সম্পাদক। তিনি পাঁচটি বইয়ের লেখক। তাঁর সর্বশেষ বই ‘These Chains Will Be Broken: Palestinian Stories of Struggle and Defiance in Israeli Prisons’ (Clarity Press)। বারুদ Center for Islam and Global Affairs (CIGA) এবং Afro-Middle East Center (AMEC)-এর নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবেও যুক্ত আছেন। তাঁর ওয়েবসাইট: www.ramzybaroud.net

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button