ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিলো কেনো ইউরোপ আর প্রাসঙ্গিক নয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরেকটি স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ও বিপজ্জনক আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করেছে, যা শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই ক্ষতিকর ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং তেহরানের মিত্রদের,বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দেওয়াতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে।
যদি তারা মনে করে যে এসব সক্ষমতা এতটাই ধ্বংস হয়েছে যে অন্তত কয়েক বছরের জন্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি থাকবে না, তাহলে আমেরিকা হয়তো “আয়াতুল্লাহ-লাইট” ধরনের একটি নতুন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে সমঝোতায় যেতে পারে।
কিন্তু ইসরায়েল ও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ অনেক বড় কিছু। এই যুদ্ধে একমাত্র সম্ভাব্য লাভবান ইসরায়েলই। ইরানের বিরোধী শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা তাদের লক্ষ্য, যাতে ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য নিশ্চিত হয়।
চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু একটি শত্রুভাবাপন্ন শাসনের অবসান নয়, বরং এর চেয়েও বড় কিছু, তা হচ্ছে, ইসরায়েলের ধর্মীয় আধিপত্যবাদী প্রকল্পের পথে যে বাধা আছে, তা সরিয়ে দেওয়া। শুধু নিরাপত্তা বলয় তৈরি নয়, বরং “প্রমিজড ল্যান্ড” বা “গ্রেটার ইসরায়েল” নামে পরিচিত বাইবেলীয় ভূখণ্ড পুনর্গঠনই লক্ষ্য।
বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের মধ্যে ব্যাপকভাবে ধারণা রয়েছে যে সরল ও প্রভাবিত হওয়ার মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই সংঘাতে ঠেলে দিয়েছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
অন্যদিকে কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই যুদ্ধ দুটি ভিন্ন ভূরাজনৈতিক মঞ্চে চলছে—একটি আঞ্চলিক অর্থাৎ ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযান, অন্যটি বৈশ্বিক অর্থাৎ চীন-যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্যের লড়াই। এই বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য ইরান নয়, বরং চীন।
ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা:
ইউরোপের জন্য এটি আরেকটি অপমান, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে আরও দুর্বল ও প্রান্তিক করে তুলেছে।
শুরু থেকেই তারা এই যুদ্ধে বিভিন্নভাবে ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কায় ছিল—যা হচ্ছে, ইরানের পাল্টা হামলা, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ক্ষতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি, সন্ত্রাসবাদ এবং নতুন করে ব্যাপক অভিবাসনের ঢেউ।
তারা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, এমনকি হামলার আগে তাদেরকে কিছু জানানোও হয়নি।
ভীত ও অপ্রস্তুত অবস্থায় তারা “উত্তেজনা কমানো”, “বেসামরিকদের নিরাপত্তা” এবং “কূটনৈতিক সমাধান”-এর মতো সাধারণ আহ্বান জানায়। তারা আক্রমণের নিন্দাও করেনি, আবার সমর্থনও দেয়নি।
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের প্রাথমিক বিবৃতিতে ইরানকেই পুরোপুরি দায়ী করা হয়, যা বাস্তবতাকে উল্টে দেয়। আক্রমণকারী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি শব্দও বলা হয়নি।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট্টে এই হামলাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি “আমাদের সবাইকে আরও নিরাপদ করছে”। তার এই বক্তব্য বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা মন ডার লিয়েন, তার সহকারী কাজা কাল্লাস এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ আন্তর্জাতিক আইন বা এই যুদ্ধের দায় নিয়ে তেমন কিছু বলেননি। বরং ইউরোপীয় নেতারা ইরানের “বেপরোয়া হামলা”র সমালোচনা করেছেন, যদিও এগুলো ছিল আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া।
নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ:
তবে ইউরোপীয় দেশগুলো আপাতত এই যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং বলেছে এটি তাদের যুদ্ধ নয়। এটি ভবিষ্যতে ইরানের নতুন সরকারের সাথে কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে এই অবস্থান মূলত আত্মরক্ষামূলক, কঠোর বিরোধিতা নয়।বিশ্বের সামনে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের কাছে, ইউরোপের প্রভাব ও মর্যাদা কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে।
ইউরোপ আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম বা আগ্রহী নয়। তাদের দুর্বলতা, দ্বিচারিতা এবং ভণ্ডামি, বিশেষ করে মানবাধিকার নিয়ে আর লুকানো যাচ্ছে না।
গাজা যুদ্ধের পরও ইউরোপ ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে গেছে, যে রাষ্ট্রটিকে লেখক বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইউরোপীয় নেতারা যখন “নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা”র পতন নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন, তা অনেকটাই কৃত্রিম বলে মনে হয়। কারণ এই ব্যবস্থার পতনে তাদের নিজেরাও বড় ভূমিকা রেখেছে। নিজেদের সুবিধামতো তারা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করেছে।
সাম্প্রতিক বক্তব্যে ফ্রেডরিক মার্জ বলেছেন, “এখন মিত্রদের সমালোচনা করার সময় নয়”, এবং উরসুলা মন বার লিয়েন “আরও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি”র কথা বলেছেন—যা মূলত আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটানোর ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতোই ইউরোপও মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার পতনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে, যার ফলে তাদের সেই ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলার নৈতিক অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়েছে। -ড. আলাঁ গাবোঁ, একজন ফরাসি স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিচে অবস্থিত ভার্জিনিয়া ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড লিটারেচারস বিভাগের চেয়ার। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন স্থানে সমসাময়িক ফরাসি সংস্কৃতি, রাজনীতি, সাহিত্য ও শিল্পকলা নিয়ে ব্যাপকভাবে লিখেছেন ও বক্তৃতা দিয়েছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইসলাম ও মুসলিম বিষয়েও কাজ করছেন। তার গবেষণা ও লেখা বিভিন্ন দেশে একাডেমিক জার্নাল, থিংক ট্যাঙ্ক এবং মূলধারার ও বিশেষায়িত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যেমন Saphirnews, Milestones: Commentaries on the Islamic World এবং Les Cahiers de l’Islam। তার সাম্প্রতিক প্রবন্ধ “The Twin Myths of the Western ‘Jihadist Threat’ and ‘Islamic Radicalisation’” ফরাসি ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই যুক্তরাজ্যের কর্ডোবা ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button